সর্বশেষ

মতামত

প্রকৃতির প্রত্যাবর্তনে পরিবেশের সুরক্ষা

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৩০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিল্প---আধুনিক প্লাস্টিক ও মেলামাইন সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমরা হারিয়ে ফেলছি । একসময় বাংলার ঘরে ঘরে বাঁশ, বেত ও তালপাতার তৈরি যে তৈজসপত্রের রাজত্ব ছিল, আজ তা অস্তিত্ব সংকটে। অথচ এই সরঞ্জামগুলো কেবল ব্যবহারের সামগ্রী নয়, এগুলো আমাদের পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের পরতে পরতে মিশে আছে এসব হস্তশিল্পের নাম। গৃহস্থালির কাজে চালনি, কুলা, খইচালা কিংবা বাঁশের ডালি ছিল অপরিহার্য। শস্য পরিষ্কারে কুলার ব্যবহার কিংবা খৈ বা মুড়ি ঝাড়ার জন্য খইচালার শৈল্পিক বুনন আজ আর আগের মতো দেখা যায় না। শস্য মাপার জন্য কাঠা কিংবা শীতের সকালে গুড়-মুড়ি খাওয়ার জন্য ছোট টুড়ি এখন কেবল স্মৃতির পাতায় ছবি। কৃষকের রোদ-বৃষ্টির সাথী মাথাল, ধান বা খড় শুকোতে কাদল এখন সৌখিনদের শোকেসে।

মাছ ধরার সরঞ্জামের বৈচিত্র্য ছিল দেখার মতো। অগভীর পানিতে পলো, হাচা বা ঝাঁপি দিয়ে মাছ শিকারের সেই আনন্দ আজ ম্লান। জলাশয়ের স্রোতের মুখে পাতা হতো বাঁশের শৈল্পিক ফাঁদ চারো, চাঁই, বাইন কিংবা ডারকি। মাছ আটকে রাখার জন্য জেলেরা ব্যবহার করতেন কোমরে ঝোলানো খলুই। বড় মাছের জন্য ব্যবহৃত হতো বাঁশের কোচ বা টেঁটা। এসব সরঞ্জাম কেবল মাছ ধরার যন্ত্র ছিল না, ছিল নিখুঁত প্রকৌশল আর প্রকৃতির এক অপূর্ব সমন্বয়। মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ এখন প্লাস্টিকের জালের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।

বাজার-সদাইয়ের বিবর্তন বহু আগে ঘটে গেছে; আমাদের সন্তানেরা এসব অনেক জিনিসের ব্যবহার দেখেনি বা চিনতেও পারবে না। ক্ষতিকর প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর নির্ভরশীল এখন, আগে সেখানে মানুষ বাজার সদাই করতে খলই, ঝাঁকা বা চাঙারি ব্যবহার করত। মাছ কিনে জীবন্ত রাখতে খলইয়ের ব্যবহার ছিল সর্বজনীন। বড় সওদা বা শাকসবজি বহন করা হতো বাঁশের মজবুত ঝাঁকায়। এমনকি দইয়ের হাঁড়ি বা মাটির পাতিল ঝুলিয়ে আনার জন্য পাটের তৈরি শিকা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ফলমূলের জন্য ব্যবহৃত হতো বেতের টুকরি আর সবকিছুর মূলে ছিল পাটের এবং বেতের তৈরি চটের থলে।

দম ফাটানো দুপুরে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়া শীতলপাটি কিংবা তালপাতার নকশি পাখা, বসার জন্য আরামদায়ক মোড়া এবং শিশুদের ঘুমের জন্য নিরাপদ দোলনা—এসবই ছিল আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক। পাখায় সেসময় রসিকমনারা তালের পাখায় লিখে রাখতোঃ ‘‘ তালের পাখা, প্রাণের সখা---শীতকালে যায় না দেখা।’’

কাঠের দোলনা, বেতের দোলনায় কেটেছে আমাদের, আমাদের পিতা-মাতাদের শৈশব। অথচ আজ প্লাস্টিক বর্জ্য যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, তখন আমাদের এই প্রাচীন হস্তশিল্পই হতে পারে টেকসই সমাধান। বাঁশ, বেত ও তালপাতার প্রতিটি সরঞ্জামই শতভাগ পরিবেশবান্ধব এবং পচনশীল।

শুধু ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নয়; আগামীর জন্য একটি স্বাস্থ্যকর বাসযোগ্য বসুধা গড়তে এইসব তৈজসপত্রগুলোর ব্যবহার পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বিলীন হওয়ার পথে এইসকল বাঁশ, বেত, কাঠ, পাটের তৈরি শিল্পগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে পরিবেশের সুরক্ষার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রান্তিক কারিগরদের বাঁচিয়ে রাখতে পারলে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, তেমনি রক্ষা পাবে আমাদের প্রকৃতি। শেকড়ের এই নান্দনিক শিল্পকে আপন করে না নিলে আপনায় থাকা আপন কিছুই হাতছাড়া হয়ে যাবে সন্দেহ নেই।

লেখক : কবি, কথাশিল্পী ও নির্মাতা।

১৫৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন