আপনি খাইয়া যান, আপনার নাতি আসিয়া বিল দেবে!
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:৫৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মানুষের মধ্যে এক ধরনের চরিত্র প্রায়ই দেখা যায়—নিজেকে খুব চালাক ভাবেন, কিন্তু আসলে সেই চালাকিই একসময় তাকে হাসির পাত্র বানিয়ে দেয়। এমনই এক অতিচালাক লোকের গল্প এটি। লোকটির স্বভাবই ছিল একটু আলাদা। যেখানে যেতেন, কোনো না কোনোভাবে সবাইকে ঠকিয়ে আসতেন। নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করা যেন তার কাছে অপমানের মতো!
বন্ধুমহলে তাকে নিয়ে মজা-ঠাট্টাও কম হতো না, কিন্তু তিনি সেসব পাত্তা দিতেন না।
একদিন তিনি ঘুরতে গেলেন কলকাতা শহরে। ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্ষুধা পেয়ে গেল। শুরু হলো খাবারের দোকান খোঁজা। এক দোকানে ঢোকেন, মেন্যু দেখেন, দাম শুনে চুপচাপ বের হয়ে আরেক দোকানে যান। তার সঙ্গীরা তখন বুঝেই গেছে—আজও কিছু একটা “চালাকি” হবে।
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে সঙ্গীরা বলল,
— আপনি খান, আমরা যাই!
ঠিক তখনই লোকটির চোখে পড়লো একটি অদ্ভুত সাইনবোর্ড—
“আপনি খাইয়া যান, আপনার নাতি আসিয়া বিল দেবে।”
এটা দেখে তিনি যেন স্বর্গ পেয়ে গেলেন! মনে মনে ভাবলেন, এইবার আর কেউ আমাকে ঠকাতে পারবে না!
সঙ্গীদের বললেন,
— তোমরা দাঁড়াও, আমি একটু খেয়ে আসি!
দোকানে ঢুকে তিনি রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে পড়লেন। কর্মচারীরা এসে এমনভাবে খাতির করতে লাগলো যেন তিনি কোনো বিশেষ অতিথি। তিনি যা চান, তাই আসছে—কাবাব, বিরিয়ানি, মিষ্টি—কিছুই বাদ গেল না।
পেটপুরে খেয়ে আরামে কিছুক্ষণ বসেও রইলেন।
এদিকে দোকানের লোকজন তার চালচলন দেখে বুঝে গেছে—এ লোকটা একটু অন্য টাইপ!
অবশেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, বিদায় নেবেন। মুখে বড়সড় হাসি।
ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে বললেন,
— খাবার খুব ভালো হয়েছে! আবার আসবো!
দোকানদারও মুচকি হেসে বললেন,
— ধন্যবাদ! আবার আসবেন।
এরপরই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো ৪২০ টাকার বিল!
লোকটি যেন আকাশ থেকে পড়লেন!
— এইটা কি! সাইনবোর্ডে কি লেখা রয়েছে! আর এসব কি করছেন? এই বিল তো আমার নাতি এসে দেবে!
দোকানদার শান্তভাবে বললেন,
— আপনি বসুন, উত্তেজিত হবেন না।
তারপর মুচকি হেসে বললেন—
— আপনি যা খেয়েছেন, তার বিল তো অনেক হয়েছে। তা- আপনার নাতির জন্য লিখে রেখেছি।
— ওটা আপনার নয়…
লোকটি অবাক হয়ে বললেন,
— তাহলে এটা কার বিল?
দোকানদার বললেন— এইটা আপনার দাদার বিল।
অনেক বছর আগে আপনার দাদা খেয়ে গিয়েছিলেন। আপনি এটা দিয়ে যান!
লোকটির মুখের হাসি এক মুহূর্তেই উধাও হয়ে গলো !
এই হাস্যরসের গল্পটি শুধু মজার নয়, এর ভেতরে আছে একটা গভীর সামাজিক বার্তা—
অন্যকে ঠকাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ঠকতে হয়। অতিরিক্ত চালাকি অনেক সময় নিজের জন্যই ফাঁদ তৈরি করে। জীবনে সততা ও ন্যায্যতা দীর্ঘস্থায়ী, চালাকি নয়। আমরা অনেক সময় ভাবি, একটু বুদ্ধি খাটিয়ে লাভ করে নিলাম!
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
জীবন এক ধরনের আয়না। আপনি যা করবেন, একদিন তা ঘুরে আপনার কাছেই ফিরে আসবে।
কারণ, সমাজে কেউ একা চালাক নয়। আপনি যদি ফাঁকি দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেন, তাহলে সেই একই সংস্কৃতি একসময় আপনাকেও গ্রাস করবে। আপনি অন্যের প্রাপ্য মেরে খেলে, অন্য কেউ আপনার প্রাপ্য মেরে খাবে—এটাই অনিবার্য।
এখানে মূল প্রশ্নটি হচ্ছে—
আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? যেখানে মানুষ সুযোগ পেলেই নিয়ম ভাঙতে চায়।
আমাদের মনে রাখা দরকার- যেখানে ফাঁকি দেওয়া এক ধরনের দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে বিশ্বাস, ন্যায়বিচার, এমনকি সাধারণ মানবিক সম্পর্কও ধ্বংস হয়ে যায়। তাই এখনই আমাদের বিকৃত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে, সুন্দর মানসিকতা ধারণ করতে হবে। না হলে “নাতির বিল” নামের মিথ্যা স্বস্তি, একদিন “দাদার বিল” হয়ে আমাদের ঘাড়েই চেপে বসবে। তখন আর কিছুই করার থাকবে না।
তাই, চালাক না হয়ে সৎ ও সচেতন মানুষ হওয়াটাই আসল বুদ্ধিমত্তা।
(প্রবীণদের মুখে শোনা রম্যগল্পের সূত্রে লেখা)
লেখক : হাবীব চৌহান, সাংবাদিক।
১৭৯ বার পড়া হয়েছে