একই কাজ, ভিন্ন মজুরি-বাংলাদেশে নারীর আয় বৈষম্যের বাস্তবতা
বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:১১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা— প্রতিটি খাতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও আমাদের সামনে রয়ে গেছে: একই কাজ, একই দক্ষতা, একই পারফরম্যান্স থাকা সত্ত্বেও কেন নারীরা পুরুষদের তুলনায় কম আয় করেন?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য এখনও বিদ্যমান। বিশেষ করে বেসরকারি খাত, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার এবং এমনকি কিছু সরকারি পদেও এই বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। একই পদে কাজ করেও নারীরা প্রায়ই কম বেতন পান—যা শুধুমাত্র দক্ষতা বা পারফরম্যান্স দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এই বৈষম্যের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতা। আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারীর কাজকে “সহায়ক” বা “অতিরিক্ত” হিসেবে দেখা হয়, যেখানে পুরুষকে মূল উপার্জনকারী হিসেবে ধরা হয়। ফলে বেতন নির্ধারণে একটি অদৃশ্য পক্ষপাত কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর স্বল্প উপস্থিতি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর সংখ্যা কম হওয়ায়, নীতিনির্ধারণে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট প্রতিফলিত হয় না। ফলে বেতন কাঠামোতেও সমতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য রক্ষা। মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব, পরিবার দেখাশোনা ইত্যাদির কারণে অনেক নারী কর্মজীবনে বিরতি নেন বা কম সময় কাজ করেন—যা তাদের ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলে। কিন্তু এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের প্রাপ্য বেতন নিয়ে দরকষাকষি করতে পিছিয়ে থাকেন—যা সামাজিকভাবে শেখানো আত্মবিশ্বাসের অভাবের একটি প্রতিফলন।
তবে আশার কথা হলো, এই বৈষম্য কমানোর জন্য ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সমতা ভিত্তিক বেতন নীতি, নারী নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমও চালু হয়েছে।
এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ—যেখানে সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ সবাই মিলে কাজ করবে। সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছ বেতন কাঠামো, জেন্ডার সেনসিটিভ নীতিমালা এবং নারীর ক্ষমতায়ন জরুরি।
বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় নারীরা আর পিছিয়ে নেই। কিন্তু প্রকৃত অর্থে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে, এই আয় বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে ফেলতেই হবে। কারণ, একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি তাদের প্রাপ্য সম্মান ও পারিশ্রমিক না পায়, তবে সেই উন্নয়ন কখনই পূর্ণতা পায় না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
২২২ বার পড়া হয়েছে