বাংলা বর্ষপঞ্জির ইতিহাসে চির স্মরণীয় যাঁরা
মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:১৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
অনেকে বলেন কেন বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার করা হলো। অনেকে এর বিরোধিতাও করেন। এইসব প্রশ্নের ও অভিযোগের জবাব দিতেই এই লেখা।
অনেকেই জানেন এখন যে সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জি বাংলাদেশে চালু রয়েছে তা খুবই সহজ। এতে খ্রিস্টীয় সন ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ সব সময়ের জন্য স্থির রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ হবে। একইভাবে অন্যান্য মাসের তারিখও স্থির থাকছে। অনেকেই হয়তো জানেন না এই বর্ষপঞ্জিটির মূল প্রণেতা মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। ১৯৯৬ সাল থেকে এই বর্ষপঞ্জি বাংলাদেশে চলছে। এই বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন ও সংস্কারের ইতিহাস খুবই সমৃদ্ধ।
(ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)
আবহমান কাল থেকেই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণসহ বারো মাস বাঙালির একান্ত নিজস্ব ছিল। বাংলাসহ ভারতীয় ভূখণ্ডে শকাব্দ, লক্ষণাব্দ ইত্যাদি যে বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল তাতে এই মাসগুলোই ছিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সনগুলো ছিল চান্দ্র-সৌর মিশ্র সন।
এর মানে হলো মাস গণনা করা হতো চান্দ্র পদ্ধতিতে আর বছর গণনা করা হতো সৌর পদ্ধতিতে। ব্যাকরণ অনুযায়ী অগ্রহায়ণ মানে অগ্র+হায়ণ (বৎসর)। অর্থাৎ বছরের প্রথম। অগ্রহায়ণ মাসে সে সময় নতুন ফসলও উঠত। এ থেকে ধারণা করা যেতে পারে প্রাচীন বাংলায় হয়তো কোথাও কোথাও বছরের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ।
(আ. জা. ম. তকীয়ূল্লাহ)
চান্দ্র মাস আর সৌর বৎসরের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য তিন বছর পরপর একটি অতিরিক্ত চান্দ্র মাস গণনার রীতি ছিল। এই অতিরিক্ত মাসটিকে বলা হতো মল মাস। মল মাসে পূজাপার্বণ নিষিদ্ধ ছিল।
এদিকে ১২০১ সালে বখতিয়ার খিলজির বাংলাজয়ের পর বিভিন্ন অঞ্চলে হিজরি সনেরও প্রচলন শুরু হয়। বিশেষ করে দরবারের কাজকর্মে।
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সুবা বাংলা নামে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় পুরো সুবাতে মানে প্রদেশে খাজনা আদায়ের জন্য একটা সমন্বিত বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে।
(সম্রাট শাহজাহান)
সম্রাট আকবরের নির্দেশে আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি মলমাস বাদ দিয়ে সৌর বর্ষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন। মূলত হিজরি সনকে ফসলি সনে রূপান্তরিত করা হয়। তবে মাসের নামের ক্ষেত্রে বাংলা নামগুলোই রাখা হয়। সে সময় থেকে বৈশাখকে প্রথম মাস হিসেবে গণনা করা হয়। বাংলা সনের জন্ম ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে—এ কথা মোটামুটিভাবে অধিকাংশ পঞ্জিকা বিশারদ মেনে নিয়েছেন।
সম্রাট শাহজাহানের সময় বাংলা বর্ষপঞ্জির একবার সংস্কার করা হয়।
ইংরেজ আমলে শহরে সরকারি কাজকর্ম চলত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। কিন্তু বাংলার গ্রামে-গঞ্জে জমিদারের খাজনা, পুণ্যাহ, হালখাতা ইত্যাদি চলত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী।
বাংলা মাস কখনো ৩০, ৩১ এমনকি ৩২ দিনেও হতো। কালের বিবর্তনে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বেশ কিছু জটিলতা ও সমস্যা দেখা দিতে থাকে। পঞ্জিকা প্রণেতা ও জ্যোতির্বিদদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বাংলা বর্ষপঞ্জি। কবে কোন মাস শুরু হবে, কবে কোন বছর শুরু হবে তা আগে থেকে বলার উপায় হয়ে পড়ে অত্যন্ত জটিল। বাংলা ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করাও প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
(সম্রাট আকবর)
এই অবস্থায় ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে সুদক্ষ ও খ্যাতনামা পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিদদের সমন্বয়ে একটি বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার উপ-সংঘ গঠন করে।
এই উপ-সংঘের সদস্য ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, পণ্ডিত তারাপদ ভট্টাচার্য কাব্য-ব্যাকরণ-পুরাণ স্মৃতিতীর্থ ভাগবত শাস্ত্রী, সাহিত্যোপাধ্যায় স্মৃতি-পুরাণ রত্ন জ্যোতিঃশাস্ত্রী; পণ্ডিত অবিনাশ চন্দ্র কাব্য জ্যোতিস্তীর্থ, পণ্ডিত সতীশচন্দ্র শিরোমণি জ্যোতির্ভূষণ এবং বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান।
১৯৬৬ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি কমিটি চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করে। অধ্যক্ষ এম এ হামিদ এই সভায় নিয়মিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়। স্বাধীন দেশে নতুনভাবে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়বাহী বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন অনুভূত হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র ভাষাসৈনিক কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ (পুরো নাম আ. জা. ম. তকীয়ূল্লাহ, জন্ম ১৯২৬, মৃত্যু ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ) ১৯৭২ সাল থেকে বাংলা প্রচলিত বর্ষপঞ্জি সংস্কারের জন্য গবেষণা শুরু করেন। কারণ শহীদুল্লাহ কমিটি প্রণীত বর্ষপঞ্জিতে কিছু কিছু দুর্বলতা ছিল। আর চিরাচরিত বাংলা পঞ্জিকার সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল যে এর লিপ ইয়ার গণনার পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট ছিল না এবং বর্ষ গণনায় বর্ষমানের পরিমাপের সঙ্গে লিপ ইয়ার গণনা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। চারশ বছর পরে পহেলা বৈশাখ তিন দিন সরে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল।
(লেখক ও তাঁর বাবা আ. জা. ম. তকীয়ূল্লাহ)
১৯৮৮-৮৯ সালে ১৩৯৫ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশে একটি সমন্বিত বিজ্ঞানসম্মত বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের কথা মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ও অন্যান্য লেখকরা বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতে থাকেন। ফলে বিষয়টি বিবেচনার জন্য বাংলা একাডেমি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। তাঁর এবং অন্যান্যদের দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনা করে পরে তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে শহীদুল্লাহ কমিটির লিপ ইয়ার সংক্রান্ত প্রস্তাবের সংস্কার করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুমোদন করে ১৯৯৬ সালে বঙ্গাব্দ ১৪০২-১৪০৩ বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করে। এর নাম দেওয়া হয় শহীদুল্লাহ পঞ্জিকা। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী এখন যে সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু রয়েছে তা খুবই সহজ। এতে খ্রিস্টীয় সন ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ সব সময়ের জন্য স্থির রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ হবে। একইভাবে অন্যান্য মাসের তারিখও স্থির থাকবে। এই ক্যালেন্ডার ভবিষ্যতেও কোনোদিন পরিবর্তন হবে না। কারণস্বরূপ মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ সরকারকে জানান ১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৩৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্যালেন্ডার তৈরি করেছেন এবং তা বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটিতে পেশ করে দেখিয়েছেন যে এর কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। নতুন নিয়মে যে বাংলা পঞ্জিকা চলছে তা ঋতুনিষ্ঠ সায়ন (ট্রপিক্যাল) পঞ্জিকা।
এখন জানলেন তো? এরপরও যদি ক্যালেন্ডার সংস্কারের বিরোধিতা করেন তাহলে বলতে হবে আপনি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক নন।
লেখক: শান্তা মারিয়া, কবি
২১৭ বার পড়া হয়েছে