প্রতিটি গুম-খুনের বিচার চাই: ন্যায়ের শাসন না থাকলে ‘রাষ্ট্র’ নয়, সেটা ‘মগের মুল্লুক’
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
‘গুম-খুন’ শব্দবন্ধটি এ লেখায় সচেতনভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এই দুটি কুকাজ, ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বা ধরণে হলেও, মানুষের জীবনের ওপর একই চূড়ান্ত ফলাফল বয়ে আনে—জীবনের চলমান পর্দা থেকে হারিয়ে যাওয়া।
মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের
দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের
বাস্তবতায় এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যগুলোর একটি। মানুষের প্রাণহরণ কিংবা কাউকে
জোরপূর্বক অদৃশ্য করে দেওয়ার পক্ষে কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই—যা নীতিশাস্ত্রের
মৌলিক স্বীকার্য। দর্শনের ভাষায় বললে, মানুষের জীবন একটি ‘অন্তর্নিহিত মূল্য’ (ইনট্রিনজিক ভ্যালু)
বহন করে। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সেই জীবনকে হরণ করা কখনোই ন্যায়সঙ্গত হতে
পারে না। তবুও আমাদের সমাজে গুম-খুনের বিচার চাইতে গিয়ে আমরা ভয়াবহভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ি।
কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুম-খুনকে বৈধতা
দেওয়ার চেষ্টা করে। এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফল নয়; এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও
একটি প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ (ইনগ্রুপ বায়াস) বা ‘শ্রেণী দ্বন্দ্ব’ মানুষকে ন্যায়-
অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে। অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের
নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়শই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে। এ প্রসঙ্গে বর্ণবাদবিরোধী
নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান ধর্মযাজক (আর্চবিশপ) ডেসমন্ড টুটু (১৯৩১–২০২১)-এর উক্তিটি
উল্লেখযোগ্য, ‘অন্যায়ের পরিস্থিতিতে আপনি যদি নিরপেক্ষ থাকেন, তবে আপনি অত্যাচারীর পক্ষ
নিয়েছেন’।
আমাদের পক্ষপাতিত্বের ফলে বাস্তবতা দাঁড়ায় এমন যে, গুম-খুনের বিচার চায় এক পক্ষ, কিন্তু নীরবতা
থাকা ও অপরাধের পক্ষে সাফাই গাওয়ার মাধ্যমে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয় অন্তত দুই পক্ষ। এই
অসামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে আমাদের দেশে বিচারহীনতা ক্রমে একটি স্বাভাবিক
নিয়মে পরিণত হয়; একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খাইম
(১৮৫৮–১৯১৭) যাকে ‘নৈতিক বিশৃঙ্খলা’ (অ্যানোমি) বলেছেন, সেই অবস্থাই যেন আমাদের বাস্তবতায়
প্রতিফলিত হয়, যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা মুছে যায়। ফলে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায়
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দুর্বলতার
অনিবার্য পরিণতিতে রূপ নেয়। এই পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের যে মৌলিক সত্যটি নির্ভুলভাবে ধারণ
করতে হবে, তা হলো, ‘গুম-খুন সর্বাবস্থায় গুম-খুনই’। কোনো পরিস্থিতি, আবেগ বা আপাত যুক্তি দিয়ে এই
অপরাধকে বৈধতা দেওয়া যায় না। নৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এই অবস্থানটি এক ধরনের ‘অপরিবর্তনীয়
নীতি’ (ক্যাটেগোরিক্যাল ইম্পেরেটিভ)-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে মানুষকে কখনোই কোনো লক্ষ্য
অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায় না; বরং তাকে নিজেই একটি উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে
হয়। সুতরাং কাউকে গুম করা বা হত্যা করা মানে কেবল তার জীবন হরণ করা নয়; বরং তার মানবিক
মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।
জীবন স্রষ্টার দেওয়া এক অমূল্য দান; এই বিশ্বাস ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেই নয়, মানবতাবাদী চিন্তাধারাতেও
সমানভাবে প্রতিধ্বনিত। জীবন নামক সময়ের সীমার মধ্যে মানুষকে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে—যেমন
চিন্তা করার, মতপ্রকাশের, নিজের জীবনচর্যা নির্ধারণের—তা কেড়ে নেওয়া মানে সেই সৃষ্টির
অন্তর্নিহিত নীতির বিরুদ্ধেই অবস্থান নেওয়া। ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘গুম’ শব্দটি কেবল
শারীরিক অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করে না; এটি এক ধরনের জোরপূর্বক নীরবতা আরোপের প্রতীক, যেখানে
একজন মানুষের কণ্ঠ, পরিচয় ও অস্তিত্ব সবকিছুকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ফলে ‘গুম’ অনেক
ক্ষেত্রেই ‘খুন’-এর একটি প্রলম্বিত প্রক্রিয়া কিংবা আড়াল করা রূপ, যেখানে মৃত্যু হয়তো দৃশ্যমান নয়,
কিন্তু পারিবারিক, সামাজিক কিংবা জাতীয় জীবনে তার অনুপস্থিতির মধ্যেই সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে
ওঠে।
পৃথিবীর প্রতিটি খুনি-ই নিজের পক্ষে কোনো না কোনো যুক্তি দাঁড় করায়—এটি মনোবিজ্ঞানের সুপরিচিত
বাস্তবতা। কেউ আত্মরক্ষার কথা বলে, কেউ প্রতিশোধের, কেউ ধর্মীয় বা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার কথা
তুলে ধরে। কিন্তু এই সব যুক্তিই মূলত ‘নৈতিক বৈধতা’ তৈরি করার এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা, যা
ব্যক্তিকে নিজের অপরাধকে সহনীয় করে তুলতে সাহায্য করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন এই ধরনের
যুক্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় বা নীরব সমর্থন লাভ করে, তখন তা ‘কাঠামোগত সন্ত্রাস’
(স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স)-এ রূপ নেয়; অর্থাৎ সহিংসতা তখন কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ থাকে না, বরং
একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়। অথচ, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের জীবনের ওপর
তার একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আধুনিক মানবাধিকার ধারণার কেন্দ্রবিন্দু। এই
অধিকার কেড়ে নেওয়ার নৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রের নেই, যদি না
তা একটি স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও আইনের শাসন-নির্ভর বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়।
অন্যথায়, গুম-খুন কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর এক গভীর
আঘাত, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক ন্যায়বোধকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের রাষ্ট্র কি সত্যিই সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে? একটি রাষ্ট্রের
মৌলিক নৈতিক দায় অন্তত তিনটি: নাগরিকের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাথমিক তত্ত্বেই বলা হয়, সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে মানুষ তার কিছু স্বাধীনতা
রাষ্ট্রকে অর্পণ করে এই প্রত্যাশায় যে, রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দেবে। কিন্তু
আমাদের দেশের বাস্তবতায় আমরা দেখি এর উল্টো এক চিত্র; বিচারহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি,
যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ ছড়িয়ে আছে অসংখ্য
গুম-খুন হওয়া মানুষের পরিবারের বেদনায়। খুন হওয়া চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের,
এবং বাংলাদেশ পুলিশের নিহত সদস্যদের পরিবারগুলোসহ সাম্প্রতিক সময়ে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর
পরিবার যেমন আজও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার নামে পরিকল্পিত
হত্যার শিকার কিংবা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া অসংখ্য মৃত্যুর পেছনেও লুকিয়ে থাকে অপ্রকাশিত
সত্য। ইতিহাসের নানা বাঁকে, বিশেষ করে বিভিন্ন আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত বা সামাজিক অস্থিরতার
সময়ে প্রাণ হারানো মানুষের পরিবারগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। এই দীর্ঘ
বিচারহীনতা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই ক্ষতবিক্ষত করে না; বরং এটি পুরো সমাজের ওপর এক
গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার ছায়া ফেলে। ফলে মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা ক্রমশ
ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে, যা একটি স্থিতিশীল, কল্যাণমুখী ও
মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যখন অপরাধের বিচার হয় না, তখন আইনের শাসন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং
তার জায়গা দখল করে নেয় শক্তির নীতি, ‘জোর যার মুল্লুক তার’। এর ফলে ন্যায়বোধের পরিবর্তে ভয়,
প্রতিশোধ এবং স্বেচ্ছাচারিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ তখন আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে
নিজেরাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।
এই প্রক্রিয়াটি একটি সমাজকে ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে অন্যায় আর
ব্যতিক্রম নয়; বরং এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। এই অবস্থার পরিবর্তনে আমাদের
ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করা জরুরি। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে এই ভূখণ্ডে সংঘটিত অসংখ্য খুন ও
নিপীড়নের একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে, যার বড় একটি অংশ আজও বিচারহীন। এই প্রেক্ষাপটে একটি
সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে সময়কালভিত্তিক তিনটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
গঠন করা হবে। একটি পলাশী থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সময়ের জন্য, একটি পুরো পাকিস্তান
আমলের জন্য, এবং আরেকটি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের জন্য। এই ধরনের উদ্যোগ কেবল বিচার
নিশ্চিত করার একটি কাঠামোই তৈরি করবে না; বরং একটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক
পুনর্নির্মাণের পথও খুলে দেবে। আইন ও বিচার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন
করতে পারেন, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং উচ্চমানসম্পন্ন।
এর মাধ্যমে কেবল গুম-খুনের বিচারের দাবি পূরণই নয়, একটি বৃহত্তর নৈতিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও
সৃষ্টি হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ অতীতের অন্যায়কে স্বীকার করে এবং তার বিচার নিশ্চিত
করতে সচেষ্ট হয়, সেই সমাজই টেকসই শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রে বিচারহীনতা যতদিন বহাল থাকে, ততদিন সমাজে প্রতিশোধপরায়ণতা, বিশৃঙ্খলা এবং
স্বেচ্ছাচারিতা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে। তাই ন্যায়বিচার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি
জাতির নৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য পূর্বশর্ত। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল বিচারহীনতাই
নয়, আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে আরও দুটি গভীর ও বিপজ্জনক প্রবণতা: পক্ষপাতিত্ব এবং ‘জল
ঘোলা করার সংস্কৃতি’। পক্ষপাতিত্বের এই প্রবণতা আমাদের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ক্রমাগত দুর্বল করে
দিয়েছে। আমরা নিজের ক্ষতি হলে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করি, কিন্তু অন্যের ক্ষতির ক্ষেত্রে নীরব থাকি;
আমাদের ন্যায়বোধও যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হয়ে যায়। ফলে অন্যায়কে আমরা বিচার করি না
ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ডে; বরং বিচার করি ব্যক্তি, পরিবার, দল, শ্রেণী কিংবা সামাজিক ও
রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। অথচ নৈতিক দর্শনের একেবারে মৌলিক সত্য হলো, অন্যায়, যে-ই করুক,
অন্যায়ই থাকে। এই সত্যকে অস্বীকার করা মানে ন্যায়ের ধারণাকেই আপেক্ষিক করে তোলা, যা শেষ
পর্যন্ত সমাজের সব স্তরে অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়।
সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, এই ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ মানুষের
‘নৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ (মোরাল ডিসএনগেজমেন্ট)-এর একটি রূপ, যেখানে ব্যক্তি নিজের অবস্থান বা
স্বার্থ রক্ষার জন্য নৈতিক বিচারকে আংশিক বা বিকৃত করে নেয়। এর ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র
কোনো স্তরেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। কারণ ন্যায় তখন আর একটি সর্বজনীন মূল্যবোধ থাকে না;
বরং তা হয়ে ওঠে সুবিধাভিত্তিক একটি অবস্থান। তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হলো,
পক্ষপাতহীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণ করা—তা নিজের বিরুদ্ধেও হোক বা
আপনজনের বিরুদ্ধেই হোক। এর পাশাপাশি, একটু আগেই বলা হয়েছে, আমাদের আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা
হলো ‘জল ঘোলা করার সংস্কৃতি’। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে বারবার প্রতারিত হতে
হতে অন্যের ওপর, এমনকি নিজের ওপরও মানুষ বিশ্বাস হারিয়েছে। ফলে কোনো স্পষ্ট ঘটনা ঘটার পর
সেটিকে জটিল, অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর করে তোলার এক অদ্ভুত সামাজিক প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করি।
তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি সুবিধাবাদী অংশ, কিছু দায়িত্বহীন চাটুকার গণমাধ্যম এবং ভুঁইফোড়
জনপ্রিয়তাবাদী অনলাইন কর্মীরা প্রায়শই একটি স্পষ্ট অপরাধের পেছনে ‘তৃতীয় শক্তি’, ‘অজ্ঞাত চক্র’
বা ‘গভীর ষড়যন্ত্র’-এর নানামুখী গল্প দাঁড় করিয়ে মূল সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ভাষাতাত্ত্বিক
দৃষ্টিতে, এটি এক ধরনের ‘আলোচনার উদ্দেশ্যমূলক কারসাজি’ (ডিসকারসিভ ম্যানিপুলেশন), যেখানে ভাষা
ও বয়ানকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে বিকৃত করা হয়, যাতে প্রকৃত ঘটনা কিংবা অপরাধী আড়ালে থেকে
যায়।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা কেবল জনমতকে বিভ্রান্তই করে
না; বরং বিচারপ্রক্রিয়াকেও সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে। কারণ যখন সত্যকে অস্পষ্ট করে ফেলা হয়, তখন
দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে,
‘বিভাজন ও শাসন’ (ডিভাইড অ্যান্ড রুল)-এর কৌশল প্রয়োগ করে সমাজকে দুর্বল করা হয়—মানুষকে সত্য
থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সন্দেহ ও বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ করে। ফলে গণ-ঐক্য বা সংঘশক্তির যে চাপ তা
আর থাকে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বারবারই জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞতাবশত সেই একই ফাঁদে
পা দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের পথকে আরও কঠিন করে তোলে এবং অন্যায়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত
করে। জাতি হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, যারা চোখের সামনে খুন দেখেও
দায় এড়িয়ে যায়, তারা কেবল নিরপেক্ষ দর্শক নয়; বরং নৈতিক অর্থে অপরাধেরই অংশীদার। নৈতিক
দর্শনে ‘উপেক্ষা’ (ওমিশন) বা নিষ্ক্রিয়তার দায়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। কারণ
কখনো কখনো নীরবতা নিজেই অপরাধে পরিণত হয়। খুনের মতো চরম অন্যায়ের ক্ষেত্রে এই নীরবতা আর
নিরপেক্ষ থাকে না; এটি কার্যত অন্যায়কে টিকে থাকার অবকাশ করে দেয়। গুমকারী বা খুনিকে আড়াল
করা, মিথ্যা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কিংবা সচেতনভাবে নীরব থাকা—এসবই প্রকারান্তরে গুম-খুনকে বৈধতা
দেওয়া এবং অপরাধীকে রক্ষা করার শামিল।
ফলে ন্যায়বিচারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে পড়ে, বিচারের বাণী যেন নিরবে, নিবৃতে কাঁদে। সাহিত্যিক উপমায় যে
আর্তনাদের কথা আমরা শুনি, বাস্তবে তা রূপ নেয় মানুষের আস্থাহীনতা, ভীতি ও হতাশায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের
কর্ণধার যদি হন এমন মানুষেরা, সত্যিকার অর্থে তাদের ওপর ভরসা করা যায় না। কারণ তারা নৈতিক
অবস্থান থেকে সরে গিয়ে কৌশল আর ছলচাতুরির মাধ্যমে সুবিধাবাদী নিরপেক্ষতার আশ্রয় নেয়।
সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রবণতাকে ‘সামাজিক আস্থার অবক্ষয়’ (ইরোশন অব সোশ্যাল ট্রাস্ট)
হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। যখন মানুষ
নিশ্চিত হতে পারে না যে অন্যায় ঘটলে সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে, তখন সামষ্টিক ন্যায়বোধ ভেঙে পড়ে এবং
ব্যক্তি ক্রমশ একা ও অনিরাপদ হয়ে ওঠে। অতএব, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সময় ও সুযোগ
এসেছে আমাদের জন্য জাতি হিসেবে একটি সুস্পষ্ট, আপসহীন অবস্থান নেওয়ার। সেই অবস্থানটি হতে
হবে সার্বজনীন; ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে বেছে বেছে নয়, বরং আমরা সব গুম-খুনের বিচার চাই। যেমনটি
বলেছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদী, ‘আমি আমার শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে চাই’। আমরা তেমন একটি
ইনসাফের রাষ্ট্র চাই, যেখানে ‘কোনো গুম-খুনকে সমর্থন নয়, কোনো গুমকারী বা খুনীকেই ছাড় নয়’—এই
নীতিগত দৃঢ়তাই হতে পারে আমাদের পক্ষপাতহীন, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ। কারণ
খুনের বিচার নিশ্চিত করা মানে কেবল একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং তা মানবতার পক্ষে
অবস্থান নেওয়া, সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করা, ‘রাষ্ট্র’কে নৈতিক ভিত্তির ওপর সত্যিকার
অর্থে প্রতিষ্ঠিত করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করে, সে সমাজ শেষ
পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই ন্যায়বিচারের দাবিতে আপসহীনতা কেবল একটি
নৈতিক আহ্বান নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা নিয়ে সগৌরবে টিকে থাকার পূর্বশর্ত।
চিরন্তন আপ্তবাক্য হলো, ‘সত্য বড্ডই তিতা’। কিন্তু সেই তিতা সত্যকে গ্রহণ করার নৈতিক সাহস না
থাকলে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজই ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারে না। দর্শনের ভাষায়, সত্য
স্বীকারের মধ্য দিয়েই নৈতিক আত্মশুদ্ধি শুরু হয়। আর সেই আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকলে
ন্যায় প্রতিষ্ঠা কেবল একটি স্লোগানসর্বস্ব বুলি হয়েই থেকে যায়। আমরা যদি বাস্তবতাকে আড়াল করি
কিংবা সুবিধামতো সত্যকে অস্বীকার করি, তবে অন্যায় কেবল টিকে থাকে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে
ওঠে। ফলে দুর্বৃত্তায়ণে সমাজ ও রাষ্ট্র সয়লাব হয়ে যায়; আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রীড়ানকেরা ক্রমে
স্বৈরাচারী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তাই আজ প্রয়োজন একটি সম্মিলিত নৈতিক জাগরণ, যেখানে
আমরা একযোগে বিচারহীনতা, পক্ষপাতিত্ব এবং বিভ্রান্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ
করি। আমাদের শিখতে হবে গুমকারী বা খুনিকে নির্ভয়ে গুমকারী ও খুনি বলতে, অন্যায়কে স্পষ্টভাবে
অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে। কারণ ভাষা কেবল প্রকাশের
মাধ্যম নয়; এটি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ারও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যখন আমরা সত্যকে
সঠিক নামে ডাকতে ব্যর্থ হই, তখন আমরা অজান্তেই অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিই। একটি
ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাই আমাদের অবস্থান হতে হবে অবিচল, আপসহীন এবং
সর্বজনীন। কারণ ন্যায়বিচারহীন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেই এক নীরব গুমকারী ও খুনিতে পরিণত হয়,
যেখানে অন্যায় শুধু ঘটে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় পায়। আর যে রাষ্ট্র অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, সে
রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়; মানবিকতার দাবিও তখন আর তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকে না। অতএব,
ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো একক ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের; এটি একটি জাতির
সামষ্টিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও
কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিটি প্রাণের মূল্য স্বীকৃত হবে এবং কোনো গুম-খুনই আর নীরবে হারিয়ে
যাবে না; বরং রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে ন্যায়ের আলোয় প্রতিটি অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হবে। দেশের জনগণ
‘মগের মুল্লুক’-এর নয়, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ নামক সার্বভৌম ‘রাষ্ট্র’-এর গৌরবান্বিত নাগরিক হতে
চায়, যে ‘রাষ্ট্র’ তার নাগরিকদের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তার বিধান করবে সর্বস্তরে আইনের
শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। জাতি সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায় ‘তীর্থের কাক’-এর মতোই দিন গুনছে।
লেখক: ড. মাহরুফ চৌধুরী ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
২৫৪ বার পড়া হয়েছে