সর্বশেষ

ফেবু লিখন

কৃতজ্ঞতার একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি

হেলাল উদ্দিন
হেলাল উদ্দিন

বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:২৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
৮২ বছর বয়সী বরেণ্য রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আজ বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও স্ট্রোক-পরবর্তী শারীরিক অসুস্থতায় মৃত্যুশয্যায়।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, ডাকসুর সাবেক ভিপি, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম এক অনিবার্য অধ্যায়।

তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আমার বহু স্মৃতি আছে। তবে আজ শুধু একটি স্মৃতির কথা বলতে চাই, যে কারণে আমি তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ।

রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আমি জীবনে কখনো কোনো অবৈধ তদবির করিনি, কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা চাইনি। সম্ভবত এ কারণেই তোফায়েল আহমেদ আমাকে স্নেহ করতেন।

যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তোফায়েল আহমেদ এলে আমাকে পাশে টেনে বসাতেন, কথা বলতেন, সাংবাদিকতার প্রশংসা করতেন। আবার সত্য কথা লিখলে কখনো কখনো মনও খারাপ করতেন।

আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের নাম। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন এই বিতর্কিত কর্মকর্তার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আমার পেশাগত জীবন তছনছ হয়ে যায়।

শুধু আমি নই, আমার নিয়োগকর্তা যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল ও তাঁর পরিবারও ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েন। যমুনা গ্রুপের ব্যবসা-বাণিজ্য নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়, শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে।

মিথ্যা মামলায় ১৭ দিন কারাভোগের পর যখন বের হলাম, তখন আমার ওপর যুগান্তর ছাড়ার চাপ শুরু হয়। কিন্তু নুরুল ইসলাম বাবুল মাথা নত করেননি। আমরা নজিবুর রহমানের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে লিখতে থাকি।

এরপর একসময় খবর এলো, কুখ্যাত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের সহযোগিতায় আমাকে গুম বা ক্রসফায়ারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিষয়টি আমি জানালাম নুরুল ইসলাম বাবুলকে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে ফোন করলেন।

আমি তোফায়েল আহমেদের বাসায় গেলাম। তিনি আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন, জড়িয়ে ধরলেন, আপ্যায়ন করলেন।

সব কথা শুনে তিনি বললেন, একজন পেশাদার সাংবাদিককে সত্য প্রকাশের দায়ে কেন এভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন।

তোফায়েল আহমেদের বাসায় যখন বসে কথা হচ্ছিল, এক পর্যায়ে সুযোগ পেয়ে আমি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে ফোন করি। তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে স্নেহ করতেন এবং নজিবুর রহমানের প্রতিহিংসামূলক আচরণের বিষয়েও অবগত ছিলেন।

আমি ভেবেছিলাম, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর সরাসরি কথা হলে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই এক পর্যায়ে তোফায়েল ভাইকে বললাম—আপনি মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে একটু কথা বলুন।

এরপর আমি নিজেই ফোনটি করে দিই। তিনি তখন ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু আমার ফোন পেয়ে রিসিভ করেন। আমি সংক্ষেপে বললাম—আমি তোফায়েল ভাইয়ের বাসায় আছি। আপনি নজিবুর রহমানের বিষয়টি নিয়ে একটু কথা বলুন।

ফোনটি হাতে দেওয়ার পর দুজনের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছিল, তা পুরোটা আমি শুনিনি। তবে এটুকু বুঝেছিলাম—বিষয়টি তখন সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এবং আমার ওপর চলা অন্যায় চাপ আর গোপন ছিল না।

এরপর তোফায়েল ভাই ফোন করলেন তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালক জেনারেল আকবরকে। এই আকবরই যুগান্তরের সম্পাদককে বারবার আমাকে চাকরিচ্যুত করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।

তোফায়েল আহমেদ তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, হেলাল আমার স্নেহের একজন পেশাদার সাংবাদিক। আমি তাকে ৩০ বছর ধরে চিনি। সে জীবনে আমার কাছে কোনো তদবির বা অর্থের জন্য আসেনি। সত্য প্রকাশে সে অবিচল। তার সম্পর্কে আপনাদের ভুল ধারণা দেওয়া হয়েছে।

জেনারেল আকবর কিছু বললে তোফায়েল আহমেদ উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনি কি আমার চেয়ে বেশি হেলালকে চেনেন?

সেদিন তোফায়েল আহমেদ আমার পক্ষে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না।

শেষ পর্যন্ত নজিবুর রহমানের প্রতিহিংসার আঘাত গিয়ে পড়ে যমুনা গ্রুপের ওপরও। একপর্যায়ে চাপের মুখে ২০১৮ সালের শেষ দিকে আমাকে চাকরি ছাড়তে হয়। দৈনিক যুগান্তরে আমার ১৪ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান ঘটে।

পরে ঘটনা আরও জটিল হয়েছে, আক্রোশ আরও বেড়েছে, আমাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, এমনকি রিকশার ওপর গাড়ি তুলে আমাকে হত্যার চেষ্টাও হয়েছে—সেসব কাহিনি আগেও বলেছি।

এরপর দীর্ঘদিন আমি বেকার ছিলাম। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান আমাকে নিতে চাইলেও নজিবুর রহমানের প্রভাব ও ভয়ের কারণে কোথাও আমার চাকরি হয়নি। আওয়ামী লীগের পতনের আগ পর্যন্ত সেই বেকারত্বের ভার আমাকে বহন করতে হয়েছে।

আজ তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুশয্যায়। রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবনের এক কঠিন সময়ে তিনি যে মানবিকতা, সাহস ও স্নেহ দেখিয়েছিলেন—তার জন্য আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।



লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১২৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন