আমাদের বিয়ের গল্প
শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬ ৫:০৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গতবারের বিয়ে বার্ষিকীতে বলেছিলাম - ম্যারেজেস আর মেড ইন হ্যাভেন- এটা যারা বিশ্বাস করেন না তাদের আমাদের বিয়ের গল্প শোনাব। বলি বলি করেও বলা হয়নি। আজ বলি আমাদের বিয়ের তেত্রিশতম বার্ষিকীর পর।
বিয়ের বয়স হয়েছে। দেখতে সুদর্শন না হলেও ভালো সরকারি চাকরি করি। পাত্রের যোগ্যতা হিসেবে এটা তো ফেলনা না।
সরকারি চাকরিতে প্রথম পোস্টিং কুষ্টিয়ায়। বিয়ে বিষয়ে আমার আগ্রহ জানতে ওখানে কয়েক জন নক করে। আমি দু-এক কথার পরই জানিয়ে দেই পদ্মার এ পাড়ে বিয়ে করবো না। আলাপ আর এগোয় না।
বছর খানেক কুষ্টিয়ায় থাকার পর বদলি হলাম খুলনার বিভাগীয় শহরে। সেখানে একদিন হাজির হলো এক চটপটে তরুণ। বয়সে আমার সামান্য বড় হলেও তার চেহারার সাইজের জন্য ছোটই দেখায়। দু-এক কথার পর সে জানায়, সে একজন পেশাদার ঘটক। আমার আগ্রহের তোয়াক্কা না করেই সে গড়গড় করে তার ঘটকালিতে তার সাকসেস স্টোরি শোনাতে থাকে। প্রামাণিক ছবিটবিও দেখায়। আমি মনে মনে হাসতে হাসতে ওর কথা শুনি। বুঝি, আমাকে পটাতেই সে এসেছে। বলে তার হাতে অনেক পাত্রী আছে। রূপে, গুণে, শিক্ষায়, দীক্ষায়,ভাবে পারিবারিক সবাই অনন্য। আমি তাকে কোনোভাবেই উৎসাহিত করি না। তার নাছোড়বান্দা ভাব দেখে, শেষমেষ বলেই ফেললাম, দেখেন ভাই, আমি পদ্মার এ পারে বিয়ে করবো না।
কোনো চিন্তা নাই। আমার কাছে ঢাকা-কুমিল্লার পাত্রীও আছে।
তাকে সেদিন কোনোভাবে বিদায় করা হলো।
দু-মাস না যেতেই আমি বদলি হলাম বরিশাল জেলা শহরে। এটা ১৯৯২।
বরিশালেও লোকজন ব্যাচেলর অফিসারের ব্যাচেলরত্ব বিদায় করতে নিদারুণ আগ্রহী। আমি এটা-সেটা বলে কাটাই। একদিন হঠাৎ করে কুরিয়ারে পাই একটা ছবি ও বায়োডাটা। পাঠিয়েছে খুলনার সেই ঘটক।
মেয়ের বাড়ি বাগেরহাট। ছবির মেয়েটি খুব সুন্দরী। বাবা বাগেরহাটের অ্যাডভোকেট।
বরিশালের ক্লাব রোডে আমাদের অফিসের বাংলো। একাই থাকি। অফিসের এক এমএলএসএস সাথে, রান্নাবান্না সব করে। সেখানে প্রায়ই আড্ডা দিতে আসে বরিশাল মেডিক্যালে ইন্টার্নি ডাক্তার আমার বন্ধু কামাল। খুব আমুদে ছেলে। এখন সাংঘাতিক পরহেজগার, আমেরিকা প্রবাসী। তো ওকে দেখাই ছবিটা। এক নজর দেখেই বলে, দোস্ত, মেয়ে তো বেশ সুন্দরী। ওই সব ঘটক-ফটক বাদ দিয়ে সরাসরি কথা বলি মেয়ের বাবার সাথে।
আমি বলি, বাদ দাও, আমার ফ্যামিলি এত দূরের বিয়েতে মত দেবে না। আমারও ইচ্ছা নেই এদিকে বিয়ে করার।
কামাল বলে, আরে দোস্ত, কথা বললেই কি আর বিয়ে হয়ে যায়? দেখিই না, একটু ফান করে। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে বাসার টেলিফোন থেকে কল করে বায়োডাটায় দেয়া নম্বরে, বাগেরহাটের অ্যাডভোকেট সাহেবকে।
দারুণ আদাব-লেহাজ কামালের। খুব বিনয়ের সাথে জানায়, আংকেল, আমার এক বোজম ফ্রেন্ডের জন্য আপনার মেয়ের ছবি আর বায়োডাটা পেয়েছি এক ঘটকের কাছ থেকে। এটা নিয়ে কথা বলতে চাই। আপনার অনুমতি পেলে।
ওপাশ থেকে মেয়ের বাবা বলেন, কী বলেন বাবা, আমার মেয়ের ছবি বা বায়োডাটা পাবেন কীভাবে! ও তো সবে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মেডিক্যালে কোচিং করছে ঢাকায়, শুভেচ্ছা কোচিং সেন্টারে। সাথে যোগ করেন, আপাতত তিনি মেয়ের বিয়ের কথা ভাবছেন না।
কামাল টেলিফোন রেখেই সব কিছু আমাকে জানায়। যদিও বাগেরহাটে বিয়ের বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ ছিল না, কিন্তু মেয়ের ছবি দেখে আর কামালের অতি উৎসাহে সায় দিয়েছি। কামাল বলে, তোমার ঘটক তো একটা ফ্রড। ওরে বরিশালে আসতে কও। একটু সাইজ কইরা দেই।
আমিও রাগি। রাগের চেয়েও বেশি বিব্রত বোধ করি। শালা ঘটক এমন ফাজিলামি করতে পারলো।
দু-দিন পরই ফোন পেলাম ওই ঘটকের। 'স্যার, একটা বায়োডাটা আর ছবি পাঠিয়েছি। পেয়েছেন তো?'
আমি রেগে বলি, মিয়া, ফাজলামো করার জায়গা পান না। পাত্রীর ছবি-বায়োডাটা পাঠিয়েছেন আর ওদিকে পাত্রীর বাবা বলছে মেয়ে মেডিক্যালের কোচিং করে, এখন বিয়ে দেবে না।
হায় হায়, কী সর্বনাশ। আপনারা কোথায় খোঁজ নিয়েছেন?
কেন, আপনার পাঠানো বায়োডাটার ঠিকানায়। বাগেরহাটে।
এই রে, কাম সেরেছে। স্যার, আমি মুনে হয় বড় ভুল একখান কইরে ফেলেছি। আমি যে মেয়ের ছবি পাঠিয়েছি ওগো বাড়ি তো যশোর শহরে, বাগেরহাট না। মুনে অয় ভুল করে একজনের বায়োডাটার সাথে অন্য একজনের ছবি চইলে গেছে। ইসস, কী সর্বনাশ, কন তো!
এক দমে এসব আর সরি-টরি বলে ঘটক জানায় সেদিনই সে কারেক্ট বায়োডাটা পাঠিয়ে দেবে। আমাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে লাইন কেটে দেয়।
দু-দিন পরেই পেলাম নতুন বায়োডাটা। যশোর শহরেই বাড়ি। মেয়ে বিএ পরীক্ষার্থী। সাত ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। বাবা বেঁচে নেই। ভাইবোনেরা সবাই মোটামুটি শিক্ষিত। বড় তিন বোনের বিয়ে হয়েছে ভালো জায়গায়। বড় জন পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টের অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার, বাড়ি মানিকগঞ্জ।
সহকর্মী বন্ধু কিবরিয়া যশোরে পোস্টেড। কিছুদিন আগে খুলনায় ওর বিয়ে হয়েছে। ওর পাত্রী দেখার ও পছন্দের সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম।
রোজার মাস। খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে কিবরিয়াকে বলি যশোরের মেয়ের কথা। ঠিকানা বলি। যশোর তো ছোট শহরই। ওকে বলি একটু খোঁজ নিতে।
কিবরিয়া করিতকর্মা অফিসার। আমার সাথে টেলিফোনে কথাবার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভালো পাত্তা পেয়ে যায় পাত্রীর পরিবারের। পাত্রী দুই আত্মীয়- বড় বোনের দুই ভাসুর- কিবরিয়ার আন্ডারেই কাজ করেন। একজন সুপার, অন্যজন ইন্সপেক্টর।
যেদিন কিবরিয়াকে এ কথা বলেছি ঠিক সেদিনই রাজস্ব সভার জন্য কুষ্টিয়া থেকে সস্ত্রীক যশোরে হাজির হয়েছে আরেক ব্যাচমেট বন্ধু সাদিক। অতএব, শুভস্য শীঘ্রম। সেই আত্মীয়ের মাধ্যমে ঠিক হয় সেদিন সন্ধ্যায় তারা- সস্ত্রীক কিবরিয়া ও সাদিক- পাত্রীর বাসায় যাবে ইফতার খেতে আর ইনফরমালি পাত্রী দেখতে। পাত্রীর বাবার বাসা কিবরিয়ার অফিস থেকে ৭/৮ মিনিট হাঁটার দূরত্বে।
সেদিন রাতেই কিবরিয়া জানায় তাদের চারজনের হঠাৎ কনে-দেখা অভিযানের কথা। ও সব সময়ই টু দ্য পয়েন্ট কথা বলে। আজলামো-ফাজলামো নাই। ও জানায় তারা চারজন দেখেছে মেয়েকে, কথা হয়েছে তার সাথে। তার, সাদিক এবং দুই ভাবীরই এক কথায় পছন্দ হয়েছে পাত্রীকে। সাথে সাথে কিবরিয়া এটাও জানায়, উনাদের মূলত ব্যবসায়ী পরিবার। কেউই বেশি উচ্চশিক্ষিত নন। কিন্তু সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি হিসেবে ভালোই পরিচিত। তুমি নিঃসন্দেহে এগুতে পারো।
সাদিকও ফোন করে জানায় একই কথা। সাদিককে মিনমিন করে বলি, এত দূরে? ও হেসেই উড়িয়ে দেয় আমার কথা, বলে,
আরে দূর, রাখো। ঢাকা থেকে তোমাদের ময়মনসিংহ যাওয়ার চেয়ে ঢাকা থেকে যশোরে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। আর বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে আধ ঘণ্টায় যাওয়ার ব্যবস্থাও আছে।
গত দুই বছরে কিবরিয়া, সাদিককে যতটুকু চিনেছি তাতে তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দেয়ার কোনো কারণ নেই। আমি ঢাকায় বড় ভাই- নান্টু দা-কে জানাই সব। পাত্রীর পক্ষের কন্টাক্ট পারসন হন ওর বড় বোনের হাজবেন্ড। ঢাকায় উনার সরকারি বাসাতেই মা, বেবি আপা, নান্টু দা’ ও ভাবিসহ ফরমালি দেখা হয় পাত্রীকে।
মা’সহ সবারই পাত্রী পছন্দ। ভাবী জিজ্ঞেস করেন আমাকে। সাথে সাথে যোগ করেন সতর্কবাণী, এবারও তেড়িবেড়ি করলে আর কোনো জায়গায় যাবো না তোমার পাত্রী দেখতে।
আমি হাসি। বলি, আগে শুনুন ওদের আমাকে পছন্দ হয়েছে কী না।
এভাবেই গাঁটছড়া বেঁধেছি ইভার সাথে, তেত্রিশ বছর আগে, আজকের দিনে।
আমার বাড়ি ময়মনসিংহ আর ইভার যশোরে শুনে অনেকেই বলেন, নিশ্চয়ই বিয়ের সময় আমি যশোরে কর্মরত ছিলাম। আমি বলি, না।
তাহলে? ইউনিভার্সিটিতে পরিচয়?
আমি স্মিত হেসে বলি, উমহু। আফটার অল, ম্যারেজেস আর মেড ইন হ্যাভেন। ওখানেই তৈরি হয়েছে আমাদের বিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ। মধ্যে অনুঘটক ছিলেন এক চ্যাংড়া ঘটক।
সেই থেকে ছায়ার মতো পাশে আছে ইভা। মা বেঁচে থাকতে ঝুটঝামেলার সময় মা’র বুকে মাথা রাখতাম, এখন মাথা রাখি ইভার কাঁধে। ও আমার সব কষ্ট শুষে নেয়, সান্ত্বনার, ভরসার কোমল, সুথিং প্রলেপ লাগিয়ে দেয় যে কোনো ক্ষতে। পরম নির্ভরতার প্রতীক, প্রাণের দোসর, সোলমেট হয়ে আছে সে।
বন্ধুরা, দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১৩৬ বার পড়া হয়েছে