সর্বশেষ

ফেবু লিখন

কোমো লেকের বৃষ্টির স্মৃতি

মুনিরুছ সালেহীন
মুনিরুছ সালেহীন

শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬ ৬:৫৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
গতকাল (২৮ মে ২০২৬) এই সময়ে ছিলাম গ্রামের বাড়ির মসজিদে। ঈদের জামাতে। কিছুক্ষণ আগের প্রস্তুতি ছিল নদীর পাড়ের ঈদগাহে নামাজ পড়ার। আকাশ মুখ ভার করেছিল সকাল থেকেই।

আশা ছিল খোলামাঠে নামাজ পড়ার ফুরসতটুকু হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রকৃতি দুষ্টু কিশোরীর মতো একটু মজা না করে ছাড়লো না। হুড়মুড়িয়ে ঝরতে শুরু করলো। আর আমরাও প্রকৃতি- কিশোরীর খিলখিল, রিমঝিম হাসির ভেতর দৌড়ে এসে হাজির হলাম আমাদের দোতলা মসজিদে।

মেঘ-বৃষ্টি-রোদের খেলা অনেকের শহুরে কেতায় হয়তো বিরক্তি ধরায়। আমার কিন্তু খারাপ লাগে না। এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় সেই সময় যখন আমিও ছিলাম প্রকৃতির লীলাখেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ সকালে আবার শহরে। প্রায় নির্জন রাস্তায় প্রাতর্ভ্রমণ শেষে বাসায় ফিরে নাস্তা। অত:পর বিছানায় গা এলানো। তখনি ফেসবুক মনে করিয়ে দেয় দশ বছর আগের এদিনের স্মৃতি।

ছুটির দিনে ইতালির তুরিন থেকে কয়েকজন বন্ধুর সাথে গিয়েছিলাম মিলানে। মিলান ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ইতালির রূপকথার মতো সুন্দর শহর 'কোমো' এবং তার বুক ঘেঁষে থাকা বিশ্বখ্যাত কোমো লেক ঘুরে আসবো। ট্রেনে মাত্র পয়তাল্লিশ মিনিটের দূরত্বে কোমো লেক।

মিলানের কোলাহল ছেড়ে ট্রেনের চড়ে যখন রওনা হয়েছিলাম, তখনো বুঝিনি প্রকৃতির কী দারুণ এক চমক অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। পাহাড় আর সবুজের বুক চিরে ট্রেন যখন কোমো স্টেশনে এসে থামল, তখনো চারপাশটা ছিল শান্ত। কিন্তু স্টেশনের বাইরে পা রাখতেই আকাশ ভেঙে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই যেন মেঘের দল আল্পস পর্বতের চূড়া থেকে নেমে এসে পুরো শহরটাকে আড়াল করে দিল।

মিলানের রেল স্টেশনে নামতেই অনেক ফেরিওয়ালা এগিয়ে এসেছিল ছাতা হাতে। তাদের প্রায় সবাই বাংলাদেশি। রৌদ্র করোজ্জ্বল দিন দেখে আর ছাতা কেনার ইচ্ছা হয়নি।

কোমো স্টেশনের ছাদ পেরিয়ে ইতালির সেই চেনা পাথুরে রাস্তায় পা রাখতেই বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আমায় ভিজিয়ে দিল। ছাতা না থাকায় যখন একদম অসহায় অবস্থা, তখনই পরম মমতায় এগিয়ে এলেন এক সহৃদয় পথচারী। সম্পূর্ণ অচেনা, ভিন্ন ভাষার সেই মানুষের ছাতার নিচে কোনো রকমে মাথা বাঁচিয়ে একটু আশ্রয় পেলাম। পৃথিবীর এক প্রান্তে এসে আরেক প্রান্তের মানুষের এই নিঃস্বার্থ পরোপকার মনটাকে ছুঁয়ে গেল।

কিন্তু এভাবে তো আর পুরো পথ চলা যায় না! তাই পথের পাশের এক ছোট্ট দোকানে চটজলদি উঠে পড়লাম একটা ছাতা কেনার উদ্দেশ্যে। আর দোকানে পা রাখতেই অপেক্ষা করছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা বিস্ময়। ইতালির সুইজারল্যান্ড সীমান্তবর্তী ওই প্রত্যন্ত, ছোট্ট শহরের এক দোকানে কাউন্টারের ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠের সম্ভাষণ। তাকিয়ে দেখি, এক বাঙালি মুখ! সুদূর প্রবাসে, আল্পসের পাদদেশের এক অচেনা দোকানে একজন বাংলাদেশিকে আবিষ্কার করার সেই বিস্ময় আর আনন্দ লিখে বোঝানো অসম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে কোমো শহরের সেই অচেনা পরিবেশটা যেন নিজের দেশ, নিজের মাটির মতো আপন হয়ে উঠল।

কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত আলাপে বিনিময় হলো কুশল। এরপর তাঁর কাছ থেকে ১০ ইউরো দিয়ে কিনে নিলাম একটি শক্তপোক্ত ছাতা । ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ কমেনি এক ফোঁটা, বরং আরও জাঁকিয়ে বসেছে। কিন্তু দোকানে বসে তা উপভোগের সময় নেই হাতে। কারণ আমাদের মাপা সময়, হাতে ফেরার টিকেট।

অত:পর ছাতা মাথায়, আল্পসের হিমেল হাওয়া আর বৃষ্টির এক অদ্ভুত মিশেল গায়ে মেখে লেক কোমোর পথে পা বাড়ালাম।

বৃষ্টির তীব্রতায় লেকের চেনা নীল জলরাশি রূপ নিয়েছিল এক রহস্যময় ধূসর ক্যানভাসে। লেকের ওপাড়ে পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিলাসবহুল ভিলাগুলো কুয়াশার চাদরে অর্ধেক ঢাকা পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো নামী শিল্পীর জলরঙের লাইভ পেইন্টিং দেখছি।

বৃষ্টির কারণে পর্যটকদের ভিড় ছিল না বললেই চলে। সেই নির্জনতায় কোমোর বিখ্যাত ডুয়োমো (ক্যাথেড্রাল) এবং মধ্যযুগীয় পাথুরে গলিগুলো এক ভিন্ন শান্ত রূপ ধারণ করেছিল। ভেজা পাথরের ওপর প্রাচীন ল্যাম্পপোস্টের আলোর প্রতিফলন পরিবেশটাকে আরও বেশি রোমান্টিক করে তুলেছিল।

ফেরার ট্রেনে জানালার পাশে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেখছি বাইরে প্রকৃতিতে তখনো বৃষ্টির রেশ।

দশ বছর আগের সেই বৃষ্টির হয়তো কোমো শহরটিকে আরেকটু ঘুরে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল। কিন্তু পরিবর্তে উপহার দিয়েছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তপ্ত রোদের চেনা ছবির চেয়েও মেঘ-বৃষ্টি-কুয়াশায় জড়ানো কোমো লেকের সেই রূপ, অচেনা মানুষের ছাতার আশ্রয়, আর স্বদেশী ভাইয়ের সেই হাসিমুখ—আজ এক দশক পরে আবার উজ্জ্বল ও জীবন্ত হয়ে উঠল। থ্যাংক ইউ, ফেসবুক।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১৯৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন