বড়ুরিয়া গ্রামের কথা
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:৫৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গতরাতে কানাডাপ্রবাসী আমার বন্ধু ও ভাই মোজাম্মেল হোসেন ওরফে মজনুর সঙ্গে আলাপকালে আমরা উভয়ে বড়ুরিয়া গ্রামের স্মৃতিচারণ করছিলাম। ইতোপূর্বে আমার টুকটাক লেখালেখির মধ্যে এই গ্রামের কথা নানাভাবে এসে গেছে, যা মজনুর কাছেও একই রকম অনুভূতির বিষয় হয়েছে বলে জানাল।
কুমারখালী রেলস্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে এই গ্রামটি। যে গ্রামে আমার জন্ম ও শৈশব বেড়ে ওঠা। এটা আমার মামাবাড়ির গ্রাম। গত শতকের ষাটের দশকের প্রথমার্ধ বলা যায় মামাবাড়িতেই কাটিয়েছিলাম। গড়াইয়ের তীরে গড়াই নদীকে কেন্দ্র করে এই জনপদ নানাভাবে প্রভাবিত—সেই শৈশব থেকে দেখেছি। গড়াই নদীতে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার স্মৃতি অমলিন। এক বিকেলে মনে আছে প্রচুর সংখ্যক টেংরা মাছ ধরেছিলাম ছিপ দিয়ে। চিংড়ি মাছের টোপ ব্যবহার করেছিলাম। বর্ণপরিচয় মায়ের কাছে শুরু হলেও বেশ কয়েকদিন এলঙ্গী আচার্য মক্তবে গিয়েছিলাম লেখাপড়া করতে। এগুলো আবছা আবছা মনে আছে। একবার হইহই করে আমরা মোল্লাবাড়ির রাস্তার কাছে গেলাম। মহিষের গাড়িতে বিশাল বাঘার মাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাছ এতই সুবিশাল যে মহিষের গাড়ির প্রয়োজন হয়েছে। কেন যেন এই স্মৃতিটি মনে আছে। আমার মামারা এক সময়ে একই চৌহদ্দির মধ্যে সবাই বাস করতেন, মজনুরা সহ। সেই বাড়িটি আমাদের জন্মের কাছাকাছি সময়ে নদীবক্ষে ভেঙে গেছে। আমরা এক সময়ে পুরোনো বাড়ি দেখতে ওই দিকে বেড়াতে যেতাম। শৈশবে আমার কাছে নায়ক ছিলেন আমার মামাতো ভাই আকুল ভাই। আকুল বিশ্বাস নামেই বেশি পরিচিত। তিনি যেভাবে শার্ট পরতেন, যেভাবে বইয়ের মলাটের উপরে নাম লিখতেন, যেভাবে বাইসাইকেল চালাতেন—সবই ছিল নায়কোচিত আমার কাছে। যখন আমি কুমারখালী জে এন স্কুলে ভর্তি হলাম, তখনও বড়ুরিয়া থেকে হেঁটে কুমারখালীতে আসা-যাওয়া করতাম। খুবই ভালো লাগত দু’ধারে মানুষের ঘরবাড়ি, ক্ষেতখামার, কিছু দূরেই তখনকার গড়াই নদী। নদী তখন ছিল বেশ বড়, প্রস্থে ও গভীরতায়। মামাদের একটি নিজস্ব নৌকা ছিল। সেই নৌকায় বিশেষ করে বর্ষায় কত না এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছি।
বড়ুরিয়া থেকে জে এন স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে পড়ত এম এন স্কুল, যে স্কুলে আমি পরে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হই।
গ্রামজীবনের যা কিছু কাছ থেকে দেখা—সবই দেখেছি বড়ুরিয়া গ্রামে। আমাদের শৈশবে ঋতুবৈচিত্র্যের ব্যাপারটি খুবই লক্ষণীয় ছিল। জ্যোৎস্না রাত বোধহয় গ্রাম ছাড়া আর কোথাও তেমন উপভোগ করা যায় না। বাড়ির পাশেই আমবাগানে নানিকে দেখতাম কুলায় করে বাতাসে ধান ঝাড়তে। খুব ভোরবেলায় শীতে আগুন জ্বালিয়ে সাঁজাল তাপাতাম একসঙ্গে অনেকেই। আখ মাড়াই কেন্দ্রে অর্থাৎ খোলায় গিয়ে গরম আখের রস ও গুড় খেতাম। বতরের মৌসুমে উঠোনে কৃষকদের ধান মাড়াই করতে, আর প্রত্যুষে লাঙল কাঁধে কৃষকদের মাঠে যেতে কত দেখেছি, তা আজও যেন চোখে ভাসে।
চষাক্ষেতে কৃষকদের শিল্পিত মই দেওয়ার দৃশ্য এখনো চোখে দেখতে পাই।
মূলত মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গেই কেটেছে আমার শৈশব। অফুরন্ত সময়, প্রচুর খেলাধুলা আর মায়ের শাসনকে ঘিরে আমার বড়ুরিয়ার শৈশব জীবন।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়ানোর সুখ—এটার সার্থক রূপায়ণ দেখেছিলাম আমাদের শৈশবে। বৈশাখী ঝড়ে এ বাগান সে বাগান, মাথার ওপর ঝড়ো বাতাস, উথাল-পাথাল শনশন শব্দ যেন এখনো অনুভব করি সমগ্র সত্তায়। খুব ভোরবেলায় কিছুটা অন্ধকার থাকতেই আম কুড়াতে যাওয়ার মজাই আলাদা ছিল। মামাতো বোন হাসিনা আর আমি বেরুতাম। আমার নানা বড়ুরিয়া গ্রামের ইউসুফ আলী বিশ্বাস একটি বড় আমগাছে উঠে আম পাড়তে গিয়ে পা পিছলে নিচে পড়ে মারা যান—নানী ওমেজান নেসা বিবির কাছে শুনেছি। সেটা অবশ্য সেই ইংরেজ আমলের কথা; আমার মা তখন খুবই ছোট। পিতা-মাতার ছয় সন্তানের মধ্যে আমার মা ছিলেন সর্বকনিষ্ঠা। আমার মামা মরহুম নাদের হোসেন বিশ্বাস অকালপ্রয়াত হন ১৯৬৮ সালে। শৈশবে একদল কাজিনদের সঙ্গে আমার কেটেছে। শৈশবে মামা একদিন বললেন, চল তোদের লজেন্স খাওয়াই। লজেন্স মানে কাঠি লজেন্স। আমিন মামার দোকান থেকে কাঠি লজেন্স কিনে আমাদের প্রত্যেককে একটি করে দিলেন। লজেন্স খাওয়া—সে এক উৎসব। শৈশবে মনে হতো, পকেটে এক টাকা হলে অনেকগুলো লজেন্স খেয়ে কী মজা করব!
শৈশবে বড়ুরিয়া গ্রামে ঘুড়ি উড়ত নানান রকমের। একটার নাম ছিল কৌড়ে ঘুড়ি। তার দিয়ে জড়ানো থাকত ঘুড়ি। আকাশে উড়লেই সংগীতের মূর্ছনা শোনা যেত। ফসলের মাঠে কৌড়ে ঘুড়ি উড়িয়ে কৃষকদের কাজ করতে দেখেছি।
(পুরনো লেখা, ঈষৎ পরিবর্তিত)
লেখক: সাবেক সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২১ বার পড়া হয়েছে