শিক্ষকের কফিনে পেরেক, বেতন বৈষম্য ও পরিকল্পনাহীনতায় ধুঁকছে শিক্ষা ব্যবস্থা
সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ২:৪২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
একটি জাতি কতটা দেউলিয়া হলে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের (শিক্ষক) ভিক্ষুকের চেয়েও অধম অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে; বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তার এক নগ্ন উদাহরণ। আমরা মুখে বলি 'শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড', অথচ পরিসংখ্যান বলছে আমরা সেই মেরুদণ্ডকেই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করছি।
ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশে এই বরাদ্দ মাত্র ১.৭৬ থেকে ২ শতাংশের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে আমাদের দৈন্যদশা আরও স্পষ্ট হয়!
ভারত, শ্রীলঙ্কা এই দেশগুলোতে শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা বাংলাদেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ভারতে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের প্রারম্ভিক বেতন বাংলাদেশের একজন শিক্ষকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই ভিয়েতনাম তাদের জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষা ও শিক্ষক উন্নয়নে ব্যয় করে; যার ফলশ্রুতিতে আজ তারা বিশ্ববাজারে এক শক্তিশালী অর্থনীতি।
দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ছাড়া অন্য প্রায় সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকরা কম বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান।
একজন এন্ট্রি-লেভেলের ব্যাংক কর্মকর্তা বা সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা যে আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রটোকল ভোগ করেন, একজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সেখানে চরম কৃপণ।
বাংলাদেশের একজন প্রাথমিক শিক্ষক মাসিক যে বেতন (গ্রেড-১৩) পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে ৪ সদস্যের পরিবারের মাসিক খাদ্য তালিকার খরচ চালানোও অসম্ভব। যেখানে একজন ব্যাংক স্টাফ প্রফিট বোনাস, এলএফএ (LFA) এবং চিকিৎসা সুবিধা পান, সেখানে শিক্ষকরা উৎসব ভাতার নামে মূল বেতনের মাত্র ২৫ শতাংশ পেয়ে অপমানিত বোধ করেন। এই আকাশচুম্বী বেতন বৈষম্যই মেধাবীদের শিক্ষকতা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
বিদ্যাপীঠগুলোতে আগে মানবিক ও দরদী শিক্ষকের ছায়া ছিল। আজ সেই জায়গা দখল করছে যান্ত্রিকতা। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ মেধাবী স্নাতক শিক্ষকতা পেশাকে কেবল 'অস্থায়ী স্টপেজ' হিসেবে ব্যবহার করেন। ভালো কোনো কর্পোরেট বা ব্যাংক জব পাওয়ার সাথে সাথেই তারা ইস্তফা দেন। ফলে স্কুলগুলো আজ মানসম্মত ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের সংকটে ভুগছে।
দেশের শিক্ষা কাঠামো আজ এক ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকদের মতামত ছাড়াই ঘনঘন কারিকুলাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, শিক্ষকরা যখন ক্লাসে পড়িয়ে জীবন চালাতে পারেন না, তখন তারা বাধ্য হয়েই কোচিং বাণিজ্যের অংশীদার হন।
ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষার ব্যয়ের একটি বড় অংশ (প্রায় ৬৭%) বহন করতে হয় অভিভাবককে, যার প্রধান কারণ গৃহশিক্ষক ও কোচিং নির্ভরতা। রাষ্ট্র শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা না দিয়ে প্রকারান্তরে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার সুযোগ করে দিচ্ছে।
যাদের হাত ধরে আগামীর ভবিষ্যৎ তৈরি হবে--- সেই শিক্ষকদের যখন তাদের ন্যূনতম অধিকারের জন্য রাজপথে লাঞ্ছিত হতে হয়; তখন শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জন্মাবে কীভাবে?
আমরা এমন এক সমাজ গড়ছি যেখানে মেধার চেয়ে টাকার মূল্য বেশি।
ফলস্বরূপ, জাতি হিসেবে আমরা কেবল কিছু ডিগ্রিধারী রোবট পাচ্ছি; মানুষ নয়।
রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, শিক্ষকদের পেটে খিদে আর মনে অসন্তোষ রেখে কোনোদিন সমৃদ্ধ জাতি গঠন সম্ভব নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ—সর্বত্রই আজ কারিগরদের দীর্ঘশ্বাস। সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়, স্তরের ভিন্নতা থাকলেও শিক্ষকদের বঞ্চনার গল্পটা একই।
একটি জাতির মেরুদণ্ড যারা গড়বেন, তারা যদি নিজেই নুয়ে পড়া অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট হন; তবে সেই মেরুদণ্ড হবে ভঙ্গুর। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যখন একজন শিক্ষকের সম্মানী ও সুবিধার কোনো সামঞ্জস্য থাকে না; তখন পাঠদানের একাগ্রতা হারিয়ে যায় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। মেধাবীরা যখন অবহেলা দেখে শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়; তখন জাতির মেধাশূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
শিক্ষকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র ও উচ্চতর বেতন স্কেল গঠন করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।
এই সংকটে কেবল আর্থিক সচ্ছলতাই শেষ কথা নয়; আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আজ সময়ের দাবি। প্রথাগত মুখস্থ বিদ্যা আর পরীক্ষার চাপ থেকে বের করে শিক্ষাকে হতে হবে আনন্দময় ও জীবনমুখী। সেই সাথে শিক্ষকদেরও হতে হবে আরও আন্তরিক ও মানবিক। শিক্ষার্থীদের মনের ভাষা বুঝে, স্নেহের পরশে তাদের পাঠদানে মনোযোগী করা শিক্ষকদের অন্যতম দায়িত্ব।
পড়াশোনা যেন কোচিং বা প্রাইভেট নির্ভর না হয়ে প্রতিষ্ঠানমুখী হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষক যখন ক্লাসরুমকে একঘেয়েমি থেকে মুক্ত করে সৃজনশীল করে তুলবেন, তখনই শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলের প্রতি টান অনুভব করবে। রাষ্ট্র যখন শিক্ষকের মর্যাদা ও প্রয়োজন পূরণ করবে, বিপরীতে শিক্ষককেও তার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও মমতা দিয়ে আগামীর প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে।
কেবল আর্থিক সচ্ছলতাই যথেষ্ট নয়, সবার আগে শিক্ষাখাতের বৈষম্যমূলক নীতিগুলো পরিহার করা ভীষণ দরকার। একই যোগ্যতায় ভিন্ন ভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আর পদমর্যাদার যে ব্যবধান, তা শিক্ষকদের মনে ক্ষোভ ও হীনম্মন্যতা তৈরি করে। বৈষম্য দূর করে একটি সাম্যভিত্তিক কাঠামো দাঁড় করানো দরকার।
পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে আনন্দময় ও জীবনমুখী। শিক্ষকদেরও হতে হবে আরও আন্তরিক ও মানবিক। শিক্ষার্থীদের যান্ত্রিকভাবে না পড়িয়ে স্নেহের পরশে তাদের পাঠদানে মনোযোগী করতে হবে। পড়াশোনা যেন কোচিং বা প্রাইভেট নির্ভর না হয়ে প্রতিষ্ঠানমুখী হয়; সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষক ও রাষ্ট্র উভয়ের।
রাষ্ট্র যখন বৈষম্যমুক্ত নীতি ও যোগ্য সম্মান নিশ্চিত করবে; শিক্ষকরাও তখন সবটুকু মনোযোগ দিয়ে আগামীর মেধা গড়ে তুলবেন—গড়ে উঠবে একটি প্রকৃত শিক্ষিত সমাজ।
অবহেলার সংস্কৃতি ভেঙে—উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠুক একটি প্রকৃত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
১৬৬ বার পড়া হয়েছে