সর্বশেষ

মতামত

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর: ঐক্যের স্মৃতি, গণতন্ত্রের অঙ্গীকার

মো: আসিফ হাসান রাজু
মো: আসিফ হাসান রাজু

রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ৩:১৭ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট, সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দিবসটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেছেন লেখক মো. আসিফ হাসান রাজু।

ইতিহাসের কিছু দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, জাতির সামষ্টিক স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা এবং জাতীয় ঐক্যের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই দিনের অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় পরিবর্তন আনে, আর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তীকালে তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার অধ্যায় আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে।

স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় নতুন রাষ্ট্র গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতার টানাপোড়েন তীব্র হয়। ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীতে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সশস্ত্র বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন কার্যত দিশাহীন। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার আশঙ্কা, ক্ষমতা নিয়ে বিভক্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা মিলিয়ে সময়টি ছিল জাতির জন্য চরম পরীক্ষার।

এই প্রেক্ষাপটেই ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে ৭ নভেম্বর সিপাহি ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। ইতিহাসে ঘটনাকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। সেদিন সাধারণ সৈনিক ও জনতা রাষ্ট্রের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল।
৭ নভেম্বরের পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার বিকাশ। জিয়াউর রহমান এই ধারণাকে একটি রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে সামনে আনেন। ভাষা, ভূখণ্ড, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়া এই পরিচয় এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাতন্ত্র্য ও আত্মমর্যাদার ওপর জোর দেয়। ১৯৭৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।
নৃবিজ্ঞানে জাতিকে অনেক সময় "কল্পিত সম্প্রদায়" হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে মানুষ একে অপরকে না চিনেও এক অভিন্ন পরিচয়ে নিজেদের যুক্ত ভাবে। এই পরিচয় নির্মাণে প্রতীক, স্মৃতি ও উদ্‌যাপনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দিবসগুলো তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো একটি জাতি নিজেকে কীভাবে দেখে, তারই প্রকাশ।

বহুদলীয় ব্যবস্থা ও উন্নয়নের উদ্যোগ
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের অন্যতম আলোচিত দিক বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ সম্প্রসারিত হয় এবং প্রতিযোগিতার নতুন পরিসর তৈরি হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বৈদেশিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারের নানা উদ্যোগ আজও আলোচিত। ১৯৮১ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পরও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে আছে।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য একজন নেতার মুক্তি কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জাতীয় স্বার্থে সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত অবস্থানের প্রতীক। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয় রক্ষার আকাঙ্ক্ষা এই দিনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই চেতনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, জনগণের ভোটাধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। তবে শুধু দাবি তুললেই এই লক্ষ্য অর্জিত হয় না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক আচরণও সমান জরুরি। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার বাইরে থাকা, সব পক্ষকেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তার জন্য প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে হলে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা ও পরিবেশের মতো প্রশ্নে ন্যূনতম ঐকমত্য ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।

তরুণ প্রজন্মের কাছে ৭ নভেম্বরের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা বিশেষভাবে জরুরি। পাঠ্যবই, গবেষণা ও গণমাধ্যমে ইতিহাসের উপস্থাপন যেন কোনো একক দলের বয়ানে সীমাবদ্ধ না থাকে। তথ্য, দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণই পারে নতুন প্রজন্মকে সচেতন ও বিচারশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে মুক্ত ও দায়িত্বশীল আলোচনা আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেবল অতীত স্মরণের দিন হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নবায়নের দিন। এই দিবসের প্রত্যাশা হোক একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ।

জাতীয় ঐক্যের শক্তিতে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। গণতন্ত্র হোক রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি, জনগণ হোক সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত উৎস।

লেখক : শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

১২৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০