সর্বশেষ

সারাদেশ

বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশানে দীপাবলির প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে

সুখেন্দু এদবর, বরিশাল
সুখেন্দু এদবর, বরিশাল

রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
প্রদীপের আলোয় প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ, সমাধিতে ফুলের সাজ আর প্রিয় খাবার নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর উদ্‌যাপিত হয় শ্মশান দীপাবলি। শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে এবারও উৎসবের প্রস্তুতি চলছে বরিশালের ঐতিহাসিক কাউনিয়া মহাশ্মশানে। সমাধি পরিষ্কার, রং করা, আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজ প্রায় শেষ। আয়োজকদের আশা, এবারের আয়োজনে দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় এক লাখ মানুষের সমাগম হবে।

বরিশাল নগরীর পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকায় প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত কাউনিয়া মহাশ্মশান। প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতি ধারণ করে থাকা এই শ্মশানজুড়ে এখন উৎসবের প্রস্তুতি। কেউ সমাধি পরিষ্কার করছেন, কেউ মঠ ধোয়া-মোছায় ব্যস্ত। কোথাও চলছে নতুন করে রং করার কাজ, আবার কোথাও ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে সমাধি। তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে প্রয়াত স্বজনদের মুখচ্ছবিও।

প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো এই মহাশ্মশানের ইতিহাস বরিশাল নগর প্রতিষ্ঠারও আগের। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ধনাঢ্য জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় নতুন বাজার এলাকায় প্রথমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এর বিস্তৃতি ঘটে কাউনিয়া পর্যন্ত। বর্তমানে এখানে রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মঠ। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান হিসেবে পরিচিত এটি।

১৯২৭ সাল থেকে এই মহাশ্মশানে দীপাবলি উৎসব উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে। কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে আয়োজিত হয় এ উৎসব। পূর্বপুরুষ ও প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারত, নেপালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ এখানে আসেন।

উৎসবের দিন সন্ধ্যায় প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে প্রদীপ, মোমবাতি ও ধূপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বজনেরা। ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলেন সমাধি। অনেকে প্রয়াত ব্যক্তির জীবদ্দশায় পছন্দের খাবারও নিয়ে আসেন। ইলিশ মাছ, পায়েসসহ বিভিন্ন খাবার সমাধিতে নিবেদন করেন তাঁরা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো মহাশ্মশান। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তৈরি হয় স্বজনদের মিলনমেলা।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকেও কাউনিয়া মহাশ্মশানের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। এখানে সমাহিত আছেন বাংলা সাহিত্যের কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এ ছাড়া রয়েছেন দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসুসহ বিভিন্ন সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাঙালি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও লেখক অশ্বিনী কুমার দত্তের চিতাভস্মও সংরক্ষিত রয়েছে এই মহাশ্মশানে। মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে তাঁর চিতাভস্ম এনে এখানে স্থাপন করা হয়।

মহাশ্মশানে সমাহিত ব্যক্তিদের স্বজনেরা জানান, প্রতিবছর ভূত চতুর্দশীর দিনে প্রয়াত আত্মীয়স্বজনের আত্মার শান্তি কামনা এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁরা এখানে আসেন। সন্তান, বাবা-মা কিংবা অন্য আত্মীয়ের সমাধি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অনেকে।

প্রিয়াংকা নন্দী নামের এক দর্শনার্থী বলেন, প্রয়াত আত্মীয়স্বজনের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তাঁরা মহাশ্মশানে আসেন। প্রিয়জনেরা জীবিত অবস্থায় যেসব খাবার পছন্দ করতেন, সেসব খাবারও সমাধিতে নিয়ে আসেন স্বজনেরা। কেউ ইলিশ মাছ, কেউ পায়েসসহ পছন্দের খাবার রাখেন। এরপর সমাধিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।

অয়ন বিশ্বাস নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, শ্মশান দীপাবলির দিন প্রতিটি সমাধিতে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানো হয়। এর মাধ্যমে প্রয়াত স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। প্রতিবছর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি এই বিশেষ দিনে মহাশ্মশানে আসেন এবং প্রিয়জনদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

শ্মশান পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, প্রতিবছর দীপাবলি উপলক্ষে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে সমবেত হন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় ও পুরোনো স্মৃতি ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে পুরো আয়োজন পরিণত হয় মিলনমেলায়।

কাউনিয়া মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত বলেন, দীপাবলি উপলক্ষে মহাশ্মশানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আলোকসজ্জার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন তাঁরা শনিবারের অপেক্ষায় রয়েছেন। শনিবার বিকেল থেকেই দর্শনার্থীদের সমাগম শুরু হবে। এবারের আয়োজনেও প্রায় এক লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরালী জানান, দীপাবলি উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ এই মহাশ্মশানে আসেন। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থীরা অংশ নেন। তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে মহাশ্মশান এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।

এদিকে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুরো মহাশ্মশান এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ মোতায়েন এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার জানান, শ্মশান দীপাবলির নিরাপত্তায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি-৮-এর সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। এ ছাড়া সাদাপোশাকে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নজরদারি করবেন। মহাশ্মশানের নির্দিষ্ট স্থানে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া হবে।

সূত্রমতে, ৭ নভেম্বর ভূত চতুর্দশীর পুণ্য তিথিতে শুরু হবে এবারের শ্মশান দীপাবলি। শতবর্ষের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতিকে ঘিরে আয়োজিত এ উৎসবে আবারও হাজারো প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী কাউনিয়া মহাশ্মশান।

১০৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০