অবহেলায় বিবর্ণ শিল্প ও শিল্পীসমাজঃ এক জাতীয় অকৃতজ্ঞতার আখ্যান
শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬ ২:৪০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট অর্থাৎ ১৯৫২ থেকে ২০২৪—বাংলার প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রঞ্জিত হয়েছে যে রক্তে, তার সমান্তরালে চলেছে লেখক, শিল্পী আর সাহিত্যিকদের কলম ও কণ্ঠ। রাজনীতি পথ হারালে, বুলেটের সামনে মিছিলে জড়ো হতে ভয় পায় যখন সাধারণ মানুষ, তখনই শিল্পীর রং-তুলি আর কবির পঙক্তিমালা হয়ে ওঠে সাহসের নির্ভর আশ্রয়। অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, রাষ্ট্র এবং সমাজ এই সৃজনশীল মানুষদের কেবল সংকটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। সংকট কেটে গেলেই তাদের ঠেলে দেওয়া হয় এক গভীর বিস্মৃতির গহ্বরে। যারা দেশ জাগালো, তারা আজ কোন আঁধারে—এই প্রশ্ন করার সময়টুকুও যেন কারো নেই।
ইতিহাসের প্রতিটি মোড় ঘোরানো আন্দোলনে শিল্প হয়ে ওঠে প্রধানতম অস্ত্র। ১৯৫২-এর সেই উত্তাল দিনে যখন রাজপথ রক্তে ভিজেছিল, তখন গান আর কবিতাই ছিল সাধারণ মানুষের সাহসের উৎস। ৬৬-এর স্বায়ত্তশাসন থেকে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—সবখানেই ছিল শিল্পীদের বলিষ্ঠ কণ্ঠ। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' কিংবা জহির রায়হানের ক্যামেরার লেন্স যে উদ্দীপনা তৈরি করেছিল; তা কোনো আধুনিক সমরাস্ত্রের চেয়ে কম ছিল না। এমনকি নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও আমরা দেখেছি, বুলেট আর টিয়ারগ্যাসে যখন আকাশ ভারী হয়ে উঠেছিল, তখন গ্রাফিতি আর গণসংগীতই নতুন আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই যে রক্ত এবং ঘাম দিয়ে শিল্পীরা দেশ ও জাতিকে সংকটমুক্ত করলেন, সংকটের শেষে তারা কোথায় হারালেন?
আমাদের সমাজে শিল্পীকে দেখা হয় দয়ার পাত্র হিসেবে। অথচ একজন লেখক বা সাহিত্যিক একটি জাতির চিন্তার জগত গঠন করেন। তারা কেবল বিনোদনের খোরাক নন; তারা একটি জাতির বৌদ্ধিক স্থপতি। তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট যখন হয় নামমাত্র বা অপমানজনক, তখন তা কেবল ব্যক্তিকে নয়, বরং সেই জাতির মেধা ও মননকেই অপমান করা হয়। শিল্পী কি সচ্ছল না কি অভাবী—এই খোঁজ নেওয়া রাষ্ট্রের কোনো করুণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত ছিল।
শিল্পীর জীবনমান উন্নয়ন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। শিল্পীকে অভাবের তাড়নায় কলম বা তুলি ফেলে দিতে বাধ্য করা মানে একটি জাতির কণ্ঠরোধ করা। শিল্পকে কেবল শখ বা খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে না দেখে একে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশাদার মর্যাদা দেওয়া উচিত। প্রবীণ ও অসুস্থ অবস্থায় কোনো শিল্পীকে যেন হাত পাততে না হয়; বরং রাষ্ট্র যেন সসম্মানে তাদের পাশে দাঁড়ায়।
শিল্প ও শিল্পীদের নিরাপত্তাকে কেবল মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় ‘ডকট্রিন’ বা অলঙ্ঘনীয় জাতীয় দর্শনে রূপ দেওয়া দরকার।
জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ শতাংশ বাধ্যতামূলক করে তাদের আজীবনের অবদানের ঋণ স্বীকার করা।
শিল্প-সাহিত্যকে পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সৃজনশীল পেশায় আসতে ভয় না পায়।
আমরা যদি শিল্পকে কেবল আলগা পরিচয় বা বিলাসিতা মনে করি, তাহলে আমরা একটি আত্মাহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছি। একজন শিল্পী-সাহিত্যিকের দূরদর্শী চিন্তা কিংবা একজন শিল্পীর তুলির টান ছাড়া কোনো বিপ্লবই পূর্ণতা পায় না। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তাদের এই যে একাকীত্ব, তা আমাদের জাতীয় মেরুদণ্ডের ভঙ্গুর অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
শিল্পীদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের আগামী প্রজন্ম কেবল যান্ত্রিক রোবট হবে, কোনো সংবেদনশীল মানুষ হবে না। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, বড় বড় দালানকোঠা দিয়ে উন্নয়ন মাপা যায়, কিন্তু একটি জাতির অমরত্ব টিকে থাকে তার শিল্প আর সাহিত্যে। তাই শিল্পীকে দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে যোগ্য মর্যাদা দেওয়া হোক।
ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও বর্তমানের পরিহাস
একটি জাতির প্রাণশক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোতে নিহিত থাকে না, বরং তার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত থাকে। ইতিহাসের প্রতিটি রক্তঝরা অধ্যায়ে—১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬, ৬৯, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব—শিল্পীরাই ছিলেন রাজপথের অগ্রসেনানি। যখন রাজনীতির কণ্ঠ অবরুদ্ধ হয়েছে, তখন শিল্পীর রং-তুলি, কবির পঙক্তিমালা আর গায়কের সুর হয়ে উঠেছে গণমানুষের বাঁচার রসদ। অথচ এই মহান 'বৌদ্ধিক স্থপতি'দের প্রতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের আচরণ চরম ঐতিহাসিক পরিহাসে ভরা। প্রয়োজনে যারা 'প্রেরণা', প্রয়োজন শেষে তারাই কেন 'তুচ্ছতাচ্ছিল্যের পাত্র' বা স্রেফ 'বিনোদনের খোরাক'? প্রশ্নবোধক হয়ে আর কতকাল ঘুরপাক খাবে!
একটি রাষ্ট্রের মনন বোঝা যায় সেই দেশের সংস্কৃতি খাতের বাজেটের দিকে তাকালে। আমাদের দেশে শিল্প-সংস্কৃতির জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়; তা কেবল অপ্রতুল নয়—বরং অত্যন্ত অপমানজনক। উন্নয়নের মেগা প্রজেক্টের ভিড়ে মানুষের মানসিক বিকাশের এই কারিগররা সব সময়ই প্রান্তিক। রাষ্ট্র যখন শিল্পীকে কেবল একটি নামমাত্র পদক দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে—অথচ তার জীবনযাপনের ন্যূনতম নিরাপত্তা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই পুরস্কার সম্মানের চেয়ে বিদ্রূপ হিসেবেই বেশি প্রতিভাত হয়। এই বাজেট বণ্টন নীতি প্রমাণ করে—রাষ্ট্র শিল্পকে একটি অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা হিসেবে গণ্য করে, যা একটি জাতির আত্মিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ।
শিল্পীর মর্যাদা কোনো দয়া নয়; অধিকার। লেখক, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা সমাজের দয়া বা করুণার পাত্র নন। তারা একটি জাতির পরিচয়পত্র। আন্দোলন বা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যখন দেশ ও জাতি উৎসবের জোয়ারে ভাসে, তখন সেই মিছিলে এই রূপকারদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা সচ্ছল না কি অভাবী, তারা অভিমানে শিল্পচর্চা ছেড়ে দিলেন কি না—সেই খোঁজ নেওয়ার সময় আমাদের নেই। সমাজ তাদের 'বিনোদনের পুতুল' হিসেবে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, শিল্পীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়া মানে একটি জাতির সৃজনশীলতা ক্ষয়ে যাওয়া। শিল্পকে পেশা হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে পূর্ণ সম্মান দেওয়া জরুরি।
পর্দার আড়ালের দীর্ঘশ্বাস
কাছ থেকে দেখলে দেখা যায়, জয়োল্লাসের মিছিল শেষ হলে মিছিলের অগ্রভাগে থাকা শিল্পীসমাজ ফিরে যান এক জরাজীর্ণ ঘরে। তার খোঁজ নেওয়ার মতো ফুরসৎ রাষ্ট্র বা সমাজের থাকে না। অনেক গুণী শিল্পী, সাহিত্যিক আজ বার্ধক্যে বিনা চিকিৎসায় নিভৃতে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের এই নীরব প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়, বরং একটি সৃজনশীল সত্তার অকাল মৃত্যু! আমরা তাদের বিনোদনের খোরাক বানিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি—কিন্তু ভুলে যাই; তাদের কলম আর কণ্ঠ না থাকলে আমাদের ইতিহাস আজ মৌন থাকত। বাজেটে তাদের জন্য যে সামান্য বরাদ্দ রাখা হয়, তা কেবল অপমানজনকই নয়, বরং চরম অবজ্ঞার নামান্তর।
রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, শিল্পীদের সুরক্ষা দেওয়া কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি একটি জাতীয় ঋণ। রাষ্ট্রকে একটি সুনির্দিষ্ট 'কালচারাল স্ট্যাটিউট' বা ডকট্রিন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি সংকটে অবদান রাখা শিল্পী-সাহিত্যিকদের আজীবন সম্মাননা ও মাসিক নিরাপত্তা ভাতা নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সমান্তরালে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে একে একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিতে হবে। কোনো শিল্পী যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, তার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিমা বা বিশেষ সুরক্ষা তহবিল গঠন করতে হবে।
শিল্প কি কেবল অবসরের বিনোদন, নাকি জাতির পরিচয়? উত্তরটি পরিষ্কার—শিল্পই একটি জাতির অবিনশ্বর স্বাক্ষর। দালানকোঠা ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু শিল্পের মাধ্যমে অর্জিত চেতনা অমর। শিল্পীদের প্রতি অবজ্ঞা জারি রেখে কোনো জাতি দীর্ঘকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। যদি আমরা শিল্পীদের কেবল সংকটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি এবং শান্তি ও স্বার্থের সময় তাদের ভুলে যাই, তবে অচিরেই আমাদের সৃজনশীলতার আকাল পড়বে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, শিল্পীরা সংকটের ত্রাণকর্তা, আর শান্তির সময়ে তারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানিত অংশীদার। তাদের প্রতি অবজ্ঞা বন্ধ হোক, শুরু হোক যথাযথ মর্যাদার নতুন এক অধ্যায়।
শিল্পীদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের আগামী প্রজন্ম কেবল যান্ত্রিক রোবট হবে; কোনো সংবেদনশীল মানুষ হবে না। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, বড় বড় দালানকোঠা দিয়ে উন্নয়ন মাপা যায়, কিন্তু একটি জাতির অমরত্ব টিকে থাকে তার শিল্প আর সাহিত্যে। তাই শিল্পীকে দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে যোগ্য মর্যাদা দেওয়া হোক।
সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ শিল্পঃ দয়া নয়, শিল্পীর অধিকার—এটাই সত্য। শিল্পীর নিঃশব্দ আর্তনাদ ও রাষ্ট্রীয় ডকট্রিনের আবশ্যকতার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের অধিকার, সম্মান ও আবশ্যকীয়তা। অবহেলায় শিল্প ও বিবর্ণ শিল্পীসমাজের শত-সহস্র বেদনার এই অকৃতজ্ঞতার আখ্যান আজ পরিষ্কারভাবে ফুটে আছে ইতিহাসের পাতায়-পাতায়!
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
১৮০ বার পড়া হয়েছে