পরিকল্পিত বসুন্ধরাকে ঘিরে নতুন শঙ্কা:
সুশৃঙ্খল নগরী কি হবে আরেক বিশৃঙ্খল ঢাকা?
শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬ ৪:৪৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততা, কোলাহল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, অপরাধপ্রবণতা আর নাগরিক দুর্ভোগের ভেতরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার নাম। এটি শুধু একটি আবাসিক প্রকল্প নয়; বরং আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ নগরজীবনের এক বাস্তব উদাহরণ।
যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি ব্লক, প্রতিটি অবকাঠামো এবং নাগরিক সুবিধা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সেই বসুন্ধরাকে ঘিরেই এখন নতুন এক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক বাসিন্দার আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের সুশৃঙ্খল ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনার এই আবাসিক এলাকা যদি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে এর বর্তমান সৌন্দর্য, নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বাস্তবতা হলো, রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ আবাসিক এলাকা আজ নানামুখী সংকটে জর্জরিত। কোথাও অপরিকল্পিত ভবন, কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও মাদক ও সন্ত্রাসের বিস্তার, আবার কোথাও নাগরিক সেবার চরম অব্যবস্থাপনা। অনেক এলাকায় মানুষ প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, শব্দদূষণ এবং দখলবাজির মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। নাগরিকরা নিয়মিত সিটি করপোরেশনকে কর ও সেবামাশুল দিলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না বলেই অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের।
বাড্ডা, ভাটারা, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, কালাচাঁদপুর, জগন্নাথপুর কিংবা রাজধানীর আরও বহু এলাকার চিত্র দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেয়ালজুড়ে পোস্টার, ব্যানার, রাজনৈতিক স্লোগান, ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকান, অপরিকল্পিত যানবাহন চলাচল এবং অপরাধের আতঙ্ক—এসব যেন অনেক এলাকার নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেখানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আলাদা মানদণ্ড তৈরি করেছে। এ কারণেই বসুন্ধরার বাসিন্দাদের মধ্যে একটি বড় অংশ মনে করেন, এই এলাকার স্বকীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হলে বর্তমান নিয়ন্ত্রিত ও কঠোর ব্যবস্থাপনাই বহাল রাখা জরুরি।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা কেন রাজধানীর মানুষের কাছে এত আকর্ষণীয়—তার উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে পরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়টি। ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় যেখানে ভবনগুলো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বসুন্ধরায় নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রেখে ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে প্রতিটি বাসায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করে। এটি শুধু আরামদায়ক পরিবেশই তৈরি করেনি, বরং স্বাস্থ্যকর নগরজীবনেরও নিশ্চয়তা দিয়েছে।
এখানে হাঁটলে এখনো পাখির ডাক শোনা যায়, সন্ধ্যার পর ঝিঁঝি পোকার শব্দ কানে আসে, সবুজের ছোঁয়া অনুভব করা যায়। রাজধানীর যান্ত্রিক জীবনের ভেতরে এ যেন এক টুকরো প্রশান্তি। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আবাসিক এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় উন্মুক্ত স্থান, বায়ু চলাচল ও সবুজায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বসুন্ধরা সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েই গড়ে উঠেছে।
অবকাঠামোগত দিক থেকেও এলাকাটি রাজধানীর অন্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি সুসংগঠিত। এখানে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই কংক্রিট ব্লক প্রযুক্তির রাস্তা ব্যবহার করা হয়েছে, যা বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে সহায়তা করে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার যে ভয়াবহ চিত্র ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, বসুন্ধরায় তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। প্রশস্ত সড়ক, নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা, পরিকল্পিত ফুটপাত এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এলাকাটিকে একটি আধুনিক আবাসিক নগরীর রূপ দিয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাই বসুন্ধরার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। হাজারো নিরাপত্তাকর্মী, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ, নিয়মিত টহল, উন্নত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত তদারকি পুরো এলাকাকে একটি সুরক্ষিত বলয়ের মধ্যে রেখেছে। রাজধানীর বহু এলাকায় যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, দখলদারি কিংবা সন্ত্রাসী কার্যক্রম সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে, সেখানে বসুন্ধরায় এসবের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত।
অনেক বাসিন্দা মনে করেন, এই নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণেই তাঁরা নিশ্চিন্তে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে পারছেন। শিশুরা নিরাপদে খেলাধুলা করতে পারে, নারীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারেন, এবং পরিবারগুলো মানসিক শান্তি নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে। এই আস্থাই বসুন্ধরাকে অন্য আবাসিক এলাকা থেকে আলাদা করেছে।
সামাজিক ও পরিবেশগত শৃঙ্খলাও এলাকাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে অবৈধ হকার, ভাসমান দোকান, বস্তি কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনার আধিক্য নেই। ফলে পুরো এলাকাজুড়ে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রয়েছে। শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার জন্য এটি তুলনামূলক নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্লকে পরিকল্পিত মসজিদ, উপাসনালয়, পার্ক ও খেলার মাঠ একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করেছে।
বসুন্ধরা শুধু আবাসিক সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এখন একটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ নগর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এখানে রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিকমানের স্কুল ও কলেজ, আধুনিক হাসপাতাল, শপিং মল, কফিশপ, রেস্টুরেন্ট এবং লাইফস্টাইল সুবিধা। খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য রয়েছে স্পোর্টস সিটি, গল্ফ কোর্স, জিমনেসিয়াম এবং উন্মুক্ত সবুজ এলাকা। ফলে বসুন্ধরার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ প্রয়োজন একই এলাকার মধ্যেই পূরণ সম্ভব হয়।
১৯৮৭ সালে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান-এর উদ্যোগে যে পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বাস্তব রূপ পেয়েছে। অপরিকল্পিত ঢাকার মধ্যে বসুন্ধরা এখন আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বহু বছরের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, কঠোর নীতিমালা ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার ফলেই এই এলাকা বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
এ কারণেই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—যদি এই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা ভেঙে যায়, তাহলে ধীরে ধীরে বসুন্ধরাও রাজধানীর অন্য অনেক এলাকার মতো বিশৃঙ্খল ও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। তাঁদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই একটি আদর্শ আবাসিক এলাকা তৈরি হয় না; বরং সেটিকে ধরে রাখতে প্রয়োজন কঠোর নিয়ম, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে সিটি করপোরেশন নিজ আওতাধীন বহু এলাকায় কাঙ্ক্ষিত নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে বসুন্ধরার মতো সুপরিকল্পিত আবাসিক এলাকার স্বকীয়তা রক্ষা করা তাদের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তাঁদের শঙ্কা, একসময় যদি এখানে অবাধ রাজনৈতিক প্রভাব, অবৈধ দখল, অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণ কিংবা অব্যবস্থাপনা প্রবেশ করে, তাহলে বহু বছরের গড়ে ওঠা সৌন্দর্য ও নিরাপত্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বসুন্ধরার অধিবাসীরা মনে করেন, তাঁরা শুধু একটি প্লট বা ফ্ল্যাট কেনেননি; বরং তাঁরা একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখেছেন। সেই আস্থার কারণেই তুলনামূলক বেশি খরচ হলেও মানুষ বসুন্ধরায় বসবাসের স্বপ্ন দেখেন। তাই এই এলাকার নান্দনিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য, আধুনিকতা এবং সুশৃঙ্খল চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখা শুধু কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; বরং এটি প্রতিটি বাসিন্দারও সম্মিলিত দায়িত্ব।
কারণ একটি পরিকল্পিত নগরী ধ্বংস হতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু সেটিকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন হয় বহু বছরের শ্রম, দূরদর্শিতা এবং ত্যাগ।
১৫৫ বার পড়া হয়েছে