সর্বশেষ

মতামত

এমপি হওয়ার শৌখিন দৌড়

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬ ৩:১৯ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
একজন বিশেষজ্ঞ যখন তার নিজস্ব কর্মক্ষেত্র ছেড়ে সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন; অথবা একজন রাজনীতিবিদ যখন ক্রীড়া ও সংস্কৃতির মতো বিশেষায়িত অঙ্গনের প্রধান হন---তখন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এই সংস্কৃতির মূলে রয়েছে কয়েকটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সমস্যা। 

আমাদের দেশে প্রায়ই মনে করা হয়, যিনি শিল্পী বা খেলোয়াড় হিসেবে জনপ্রিয়, তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেও সফল হবেন। কিন্তু আইন প্রণয়ন একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিগত ও তাত্ত্বিক কাজ। সংসদ সদস্যের প্রধান কাজ হলো দেশের জন্য সময়োপযোগী আইন তৈরি করা এবং বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক জ্ঞান ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব।
রাজনৈতিক ইতিহাস ও অর্থনীতি না বুঝে যারা কেবল জনপ্রিয়তার জোরে এমপি হন--- তারা সংসদে গিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না।

একজন বিশেষজ্ঞ এমপি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে (যেমন—স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অর্থনীতি) গভীর জ্ঞান রাখেন। এর ফলে সংসদে যখন কোনো বিল বা বাজেট পেশ হয়, তিনি সেটির খুঁটিনাটি ভুল ধরতে, গঠনমূলক সংশোধনী দিতে পারেন এবং আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা সরাসরি কার্যকর সমাধান দিতে পারেন।
সংসদ সদস্য (MP) হওয়া কি বিনোদনের অংশ? সংসদ হলো একটি দেশের আইন তৈরির সর্বোচ্চ স্থান। অথচ আমরা দেখছি, ভিন্ন অঙ্গনের জনপ্রিয় মানুষরা—যাদের রাজনীতি, ভূগোল বা রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা নেই—তারাও সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য উদগ্রীব। জনপ্রিয়তাকে যোগ্যতার বিকল্প ভাবার এই ভুলটি মারাত্মক। সংসদ সদস্য হওয়া কোনো পুরস্কার নয় যে--- অভিনেতা বা খেলোয়াড় হিসেবে সফল হলেই তাকে এটি দিতে হবে। আইন প্রণয়নের মতো জটিল ও তাত্ত্বিক কাজ যখন অপেশাদারদের হাতে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় দুর্বল হয়ে যায়।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এর মূল কাজ আইন প্রণয়ন।

যিনি যেখানে বিশেষজ্ঞ, তিনি সেখানেই থাকবেন। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষমতা বলতে আমরা কেবল প্রশাসন বা সংসদকে বুঝি। ফলে একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার যখন অনুভব করেন, যে তার পেশাগত দক্ষতা তাকে সমাজে সেই বিশেষ মর্যাদা বা নিরাপত্তা দিচ্ছে না; যা একজন এমপির রয়েছে, তখনই তিনি রাজনীতির দিকে ঝোঁকেন। এর ফলে দেশ একজন দক্ষ কারিগর হারায় এবং রাজনীতিতে একজন অপেশাদার প্রবেশ করে।

একজন জনপ্রিয় অভিনেতা বা খেলোয়াড় তার নিজস্ব ক্ষেত্রে সফল হতে পারেন; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল সমীকরণগুলো বুঝবেন। 

আবার রাজনীতির মানুষদের কেন ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক ফেডারেশনের প্রধান হতে হবে? খেলোয়াড়দের মাঠ আর মঞ্চ যখন রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়; তখন সেই অঙ্গনে নতুন প্রতিভা সৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে—জার্মানি বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়--- তাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিংহভাগই বিশেষজ্ঞ। সেখানে একজন বিজ্ঞানী বা অর্থনীতিবিদকে রাজনীতিতে আসতে হয় না, বরং রাষ্ট্রই তাদের বিশেষায়িত জ্ঞানকে কাজে লাগায়। আমাদের দেশেও এই ‘টেকনোক্র্যাসি’ বা মেধাতন্ত্রের চর্চা শুরু করা জরুরি।

যদি এই উদ্যোগ না নেওয়া হয়; তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। তখন দেশে কেবল একদল সনদধারী থাকবে; কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ থাকবে না।  বিশেষজ্ঞ নাগরিক গড়ে ওঠার পথে এটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী যে ক্ষতিগুলো হবে---
যখন একজন শিক্ষার্থী বা তরুণ গবেষক দেখবেন যে, তার দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম আর অর্জিত জ্ঞানের চেয়ে রাজনৈতিক পদবী বা ক্ষমতা বেশি শক্তিশালী; তখন তিনি নিরুৎসাহিত হবেন। এর ফলে মেধাবীরা হয় দেশ ছেড়ে চলে যাবেন--- অথবা নিজের মেধা চর্চা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক তোষামোদে লিপ্ত হবেন। 

বিশেষজ্ঞ নাগরিক তৈরি হয় দীর্ঘদিনের সাধনায়। কিন্তু যখন প্রতিটি সেক্টরে অপেশাদার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেখানে বিশেষজ্ঞ মতামতের কোনো দাম থাকে না। এটি নতুন প্রজন্মকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরে যাওয়ার পরিবর্তে কেবল 'সারফেস লেভেলে' পরিচিতি বা ক্ষমতা পাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
তরুণদের সামনে যখন বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী, দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক বা বিদগ্ধ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বদলে কেবল ক্ষমতাশালী নেতারাই রোল মডেল হয়ে দাঁড়ান---তখন সমাজ থেকে বিশেষজ্ঞ নাগরিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মুছে যায়। এই সংস্কৃতি বন্ধ না করলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, ক্রীড়া ফেডারেশন বা সাংস্কৃতিক জোটগুলো স্থায়ীভাবে অযোগ্য ও মেরুদণ্ডহীন মানুষের আখড়ায় পরিণত হবে। সেখানে কোনো স্বাধীন বিশেষজ্ঞ তৈরি হওয়ার পরিবেশ আর অবশিষ্ট থাকবে না

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল মেরিটোক্রেসি বা মেধাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা । বিশেষজ্ঞ নাগরিক না হওয়ার প্রধান কারণ হলো "Right Person in the Right Place" নীতির অভাব। যখন রাজনীতি সবকিছুর ওপর প্রাধান্য পায়; তখন মেধার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।

এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে--- সংসদ সদস্য পদের জন্য নির্দিষ্ট একাডেমিক বা পেশাদারী যোগ্যতার মাপকাঠি নিয়ে বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এই হাইব্রিড সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার ব্যক্তিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত করে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে।

ক্ষমতা যেন কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে; একজন বিজ্ঞানী বা শিল্পীর সামাজিক মর্যাদা যেন; একজন রাজনীতিবিদের সমান বা বেশি হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে বিশেষজ্ঞকে তার যোগ্য স্থানে থাকতে দিতে হবে। রাজনীতির মানুষের কাজ রাষ্ট্র পরিচালনা--- বিশেষজ্ঞের কাজ তার বিশেষায়িত জ্ঞান দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।

প্রতিটি পেশার মানুষকে তার নিজস্ব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান ও কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। রাজনীতি হবে রাজনীতিবিদদের জন্য, আর মাঠ-মঞ্চ-ল্যাবরেটরি হবে বিশেষজ্ঞদের জন্য। এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে কখনোই একটি দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ নাগরিক সমাজ গড়ে উঠবে না। পরিবর্তন কেবল আইনের মাধ্যমে নয়; বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর মাধ্যমেই সম্ভব।

লেখক : নাট্যকার ও প্রবান্ধিক

১২৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন