দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের নতুন ধারা
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬ ৫:৩৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ক্ষমতা কখনোই স্থির নয়। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি যাকে 'হেজিমনি' বা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বলেছেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; সেই আধিপত্যও একসময় ভেঙে পড়ে। ২০২৬ সালের দক্ষিণ এশিয়া সেই তাত্ত্বিক সত্যেরই এক বাস্তব প্রতিফলন। বাংলাদেশ থেকে কেরালা, কাঠমান্ডু থেকে কলকাতা—সর্বত্রই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শক্তির পতন এবং নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে।
পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় নতুন শক্তির অনিবার্য অভ্যুদয়---মানুষের জীবন এবং এই বৈশ্বিক বাস্তবতা—সবই প্রবর্তনশীল। আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক প্রেক্ষাপটে এই দুনিয়াটা এক রূপক বা মেটাফোরিক। এখানে ক্ষমতা, সম্পদ, রাজনীতি, আধিপত্য —সবই নির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে পরিবর্তনশীল। আজকে যিনি রাজা, কাল পরশু তিনি অতি সাধারণ মানুষ। আজ যে বিত্তবান, কাল সে রিক্ত। এটাই নিয়তি। তবুও মানুষ এই চিরন্তন সত্য ভুলে গিয়ে নিজেকে সবসময় ক্ষমতার চূড়ায় দেখতে চায়। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই এই দম্ভের পতন ঘটে এবং নতুন শক্তির আবির্ভাব হয়।
ক্ষমতার নেশায় মত্ত শাসকেরা যখন নিজেদের অপরাজেয় ভাবতে শুরু করেন, তখন তাদের কণ্ঠস্বর হুঙ্কারে পরিণত হয়। নির্বাচনের আগে যে আস্ফালন শোনা যায়; বিজয়ের পর অনেক ক্ষেত্রেই তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। কারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তবতায় রাজনীতি চলে ভারসাম্য আর সমঝোতার ওপর। বর্তমানে এককভাবে কোনো ‘লিও’ বা সিংহ-সদৃশ আধিপত্য ধরে রাখার জায়গা পৃথিবীতে আর নেই। জনরোষ আর সময়ের দাবিতে বড় বড় ফোরাম বা রাজনৈতিক দুর্গ আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তর:
২০২৬ সালের এই কালখণ্ডে দাঁড়িয়ে আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় যে পরিবর্তনের জোয়ার দেখছি; তা এই তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করে!
দীর্ঘ ১৫ বছরের একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে যে নতুন নেতৃত্বের সূচনা হয়েছে, তা প্রমাণ করে; জনআকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়।
ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণ ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের ইতি ঘটেছে, যেখানে খোদ প্রভাবশালী নেতৃত্বের পরাজয় ঘটেছে। কেরালায় ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন এবং তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের নবগঠিত দলের জয়গান প্রমাণ করে--- মানুষ এখন প্রথাগত রাজনৈতিক ফ্যাশনের বাইরে নতুন বিকল্প খুঁজছে।
নেপালে তরুণ নেতৃত্বের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং শ্রীলঙ্কায় শক্তিশালী রাজবংশের পতন শিখিয়ে দিয়েছে, দম্ভ দিয়ে মানুষের পেট ভরানো যায় না।
আধিপত্যের এই দুনিয়ায় পরিবর্তন আসবেই। প্রতিপক্ষ হিসেবে একদিন নতুন কোনো ‘লিও কিমবল’ বা নতুন ধারার নেতৃত্বের উদয় হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। ক্ষমতার চূড়ায় বসে যারা আজ পৃথিবীকে তুচ্ছজ্ঞান করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত —ইতিহাস আসলে বিজয়ীদের লেখা কোনো স্থির চিত্র নয়; বরং এটি একটি বহমান স্রোত--- যেখানে দম্ভের অবসান ঘটে সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলনে।
মানুষ যখন নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে, তখনই নিয়তি তার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। আজকের প্রবল প্রতাপশালী শাসককে মনে রাখতে হবে, ইতিহাসের বিচার থেকে কারও নিষ্কৃতি নেই। আস্ফালন ক্ষণিকের জন্য ভয় দেখাতে পারে; কিন্তু তা স্থায়িত্ব দিতে পারে না।
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
১৮১ বার পড়া হয়েছে