সর্বশেষ

সাহিত্য

মৃত্তিকালগ্ন মানুষের আর্তনাদ ও নন্দনতত্ত্ব

দীনবন্ধু মিত্রের সাহিত্যিক অভিযাত্রা ও এক বহুমুখী নির্মেদ ব্যবচ্ছেদ

গাউসুর রহমান 
গাউসুর রহমান 

বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৪১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার ধুলোমাখা পথঘাট আর গঞ্জের হাটে তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা। একদিকে কলকাতার ড্রয়িংরুমে ইংরেজি শিক্ষিত নব্য বাবুদের মদ্যপ আভিজাত্য আর সমাজ সংস্কারের তাত্ত্বিক লড়াই, অন্যদিকে বাংলার নিভৃত পল্লিগ্রামে নীলকুঠির সাহেবের চাবুকের শব্দে কেঁপে ওঠা বাতাস।

ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে, যখন বাংলার সাহিত্য আকাশ কেবল রাজকীয় আখ্যানের বর্ণচ্ছটায় রঞ্জিত ছিল, ঠিক তখনই এক শান্ত অথচ দৃঢ় পদক্ষেপ শোনা গিয়েছিল। তিনি দীনবন্ধু মিত্র। রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা যখন শাস্ত্রের জটিল জাল ছিন্ন করে সমাজকে সংস্কারের পথে নিচ্ছিলেন, দীনবন্ধু তখন পরম মমতায় কান পেতেছিলেন বাংলার পলিমাটির খুব কাছে। আজ ২০২৬ সালের এই বৈশাখী অপরাহ্নে দাঁড়িয়ে যখন অতীতকে ফিরে দেখা হয়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি কেবল একজন নাট্যকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক যুগের আর্তনাদকে কালজয়ী ভাষায় রূপান্তরকারী এক কলম-সৈনিক।

দীনবন্ধুর সাহিত্যিক সত্তার উন্মেষ কোনো চারুকলার নিভৃত কোণে হয়নি, হয়েছিল কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার উত্তাপে। ডাক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যখন নদী-নালা আর দুর্গম পথ পেরিয়ে বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তখন তাঁর নজরে কেবল ডাকহরকরার থলি পড়েনি, পড়েছিল মানুষের বুকের গভীরে জমানো অব্যক্ত বেদনার লিপি। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা 'অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণ' বলি, দীনবন্ধু অবচেতনভাবেই সেই পদ্ধতিকে রক্তে মিশিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি বাইরের কোনো দর্শক ছিলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমাজের এক একান্ত ঘরের মানুষ। জন্মসূত্রে তাঁর নাম ছিল গন্ধর্বনারায়ণ, কিন্তু প্রান্তিক মানুষের প্রতি তাঁর যে অকৃত্রিম টান, তাঁদের চোখের জলের সঙ্গে নিজের সত্তাকে মিলিয়ে দেওয়ার যে দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা—তা-ই তাঁকে সত্যিকারের 'দীনবন্ধু' করে তুলেছিল। ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শনের কথা ভাবলে মনে হয়, দীনবন্ধু যেন তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে ঘোষণা করেছিলেন—মানুষের অস্তিত্ব তার যন্ত্রণার স্বীকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে 'নীল দর্পণ' (১৮৬০) কেবল একটি নাটক নয়, এটি ছিল একটি আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। দীর্ঘকাল ধরে মহাকাব্যিক আখ্যান আর অলঙ্কৃত ভাষার যে মায়াজাল সাহিত্যকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, দীনবন্ধু তাকে সজোরে আছড়ে ফেললেন বাংলার রুক্ষ ও কর্দমাক্ত মাটিতে। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের প্রবক্তা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তোলেন—প্রান্তিক মানুষ কি কথা বলতে পারে?—তখন দেড়শ বছর আগে লেখা দীনবন্ধুর তোরাপ চরিত্রটি যেন সেই প্রশ্নের এক জীবন্ত উত্তর হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায়। তোরাপ কোনো মার্জিত নায়ক নয়, সে এক আদিম বিদ্রোহের প্রতীক। কার্ল মার্কসের শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্ব হয়তো তখনো বাংলার কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি, কিন্তু তোরাপের প্রতিটি গালিগালাজ আর পেশির টান বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কোনো তত্ত্বের মুখাপেক্ষী নয়। ফ্রানৎস ফানোঁর 'দ্য রেচড অব দ্য আর্থ' গ্রন্থে যে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে, তোরাপ যেন সেই প্রতিরোধেরই এক রক্ত-মাংসের রূপায়ণ। নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার, খেত-মজুরদের জমি কেড়ে নেওয়া আর নারীত্বের অবমাননার যে রূঢ় চিত্র দীনবন্ধু এঁকেছেন, তা ফরাসি কথাশিল্পী এমিল জোলার 'প্রকৃতিবাদ'কেও হার মানায়। 

'নীল দর্পণ'-এর ঐতিহাসিক প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল এক নিঃশব্দ বিপ্লবের অনুঘটক। রেভারেন্ড জেমস লং এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে যখন এই নাটক ইংরেজি অনুবাদে বিশ্ব দরবারে পৌঁছাল, তখন তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৮৭২ সালে যখন কলকাতার সাধারণ রঙ্গালয়ে এই নাটক মঞ্চস্থ হয়, তখন যে জনবিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা নাট্যতত্ত্বের ইতিহাসে বিরল। উড সাহেবের চরিত্রে অভিনয়কারী অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্যাসাগর নিজের চটি ছুঁড়ে মেরেছিলেন—এই প্রবাদপ্রতিম ঘটনাটি কেবল অভিনয়ের সার্থকতা প্রমাণ করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে দীনবন্ধু সমাজের 'চতুর্থ দেয়াল' বা পর্দার আড়ালের সত্যকে কতটা নগ্নভাবে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। সাহিত্য যে কেবল শৌখিন বিলাসিতা নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক অমোঘ হাতিয়ার হতে পারে, দীনবন্ধু তা হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

তবে দীনবন্ধুর প্রতিভা কেবল কান্নার কাব্য রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন মানুষের চরিত্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার আর হাস্যরসের এক নিপুণ কারিগর। তাঁর রচিত প্রহসনগুলো সমকালীন সমাজের এক নির্মম দর্পণ। 'সধবার একাদশী' নাটকের কথা ধরা যাক। ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর যে তরুণরা ইংরেজি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে গিয়ে মদ্যপান আর নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিল, তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে নিমচাঁদ দত্ত এক অসামান্য সৃষ্টি। রুশ লেখক দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের জটিল চরিত্রগুলোর মতো নিমচাঁদও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে দীর্ণ। বাইরে থেকে সে মাতাল, তার ভাষা কুরুচিপূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু তার হাসির আড়ালে যে গভীর অস্তিত্ববাদী শূন্যতা (Existential angst) লুকিয়ে আছে, তা সচেতন পাঠককে শিহরিত করে। নিমচাঁদকে দেখলে বোঝা যায়, সে তার মাতলামি আর ব্যঙ্গের মাধ্যমে আসলে সমাজের ভণ্ডামিকেই উপহাস করছে। নিমচাঁদের প্রতিটি সংলাপে যেন এক অপচয়িত মেধার দীর্ঘশ্বাস ধ্বনিত হয়। শেকসপিয়রের নাটকের 'ফুল' বা বিদূষকদের মতো সে-ও সত্যের এক নিষ্ঠুর ভাষ্যকার।

সামাজিক অসংগতি নিয়ে তাঁর অন্য দুটি কাজ—'বিয়ে পাগলা বুড়ো' এবং 'জামাই বারিক'—তৎকালীন সমাজের বহুবিবাহ ও ঘরজামাই প্রথার ওপর এক কঠোর কশাঘাত। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণ তত্ত্বের নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, এই নাটকগুলোতে দীনবন্ধু মানুষের অবদমিত কামুকতা আর পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর কঙ্কালসার রূপটিকে কী নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর রচনার অন্যতম শক্তি ছিল ভাষার ব্যবহার। তথাকথিত সাধু ভাষার কৃত্রিমতা ভেঙে তিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, এমনকি আঞ্চলিক উপভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলেন। এই ভাষাগত বিদ্রোহই পরবর্তীকালের বাস্তববাদী সাহিত্যের পথ প্রশস্ত করেছিল।

দীনবন্ধুর সমকালে তাঁর বিরুদ্ধে 'স্থূলতা'র অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর রচনায় কিছুটা রুক্ষতা বা গ্রাম্যতা লক্ষ করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক নন্দনতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, যা বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে স্থূল মনে হয়েছিল, তা আসলে ছিল জীবনের অবিমিশ্র সত্য। বঙ্কিম ছিলেন আদর্শবাদী, তিনি জগতকে দেখতে চেয়েছিলেন তার কাঙ্ক্ষিত সুন্দর রূপে। আর দীনবন্ধু ছিলেন প্রকৃত বাস্তববাদী; তিনি সমাজকে যেমন দেখেছিলেন, ঠিক তেমনভাবেই আঁকতে চেয়েছিলেন—তা যত কুৎসিত বা নগ্নই হোক না কেন। গুস্তাভ ফ্লোবেয়ার বা বালজাক যেমন ফরাসি সমাজের বুর্জোয়াদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন, দীনবন্ধুও তেমনি বাংলার জমিদার আর নব্য বাবুদের ভণ্ডামিকে জনসমক্ষে এনেছিলেন। তবে দীনবন্ধু হলেন হিমালয় থেকে নেমে আসা এক প্রমত্তা নদী, যা দুই কূল ছাপিয়ে পল্লিবাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের পলিমাটিতে মিশে গেছে। 

নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ যে পেশাদার বাংলা থিয়েটারের বুনিয়াদ গড়েছিলেন, তার বীজ রোপিত হয়েছিল দীনবন্ধুর হাতেই। তিনি কেবল সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সার্থক নাট্যশিল্পী। তাঁর নাটকে মঞ্চসফলতার যে রসদ ছিল, তা সমকালের অন্যান্য লেখকদের মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। দীনবন্ধু জানতেন কীভাবে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতে হয়, কীভাবে দর্শককে মঞ্চের ঘটনার সঙ্গে একাত্ম করে দিতে হয়। 

দীনবন্ধুর সাহিত্যিক জীবনের এই বিশাল ক্যানভাসে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন, আর তা হলো তাঁর রচনায় প্রকৃতির ভূমিকা। তিনি যখন গ্রামীণ বাংলার দৃশ্যপট আঁকেন, তখন সেখানে কেবল মানুষের দ্বন্দ্ব থাকে না, থাকে প্রকৃতির এক মায়াবী ও রুক্ষ রূপ। বিভূতিভূষণের লেখায় আমরা যে আরণ্যক প্রশান্তি পাই, দীনবন্ধুর নাটকের পটভূমিতে তা-ই যেন এক উত্তাল রূপ ধারণ করে। তাঁর নাটকের দৃশ্যপটে কখনো আসে ঝোড়ো হাওয়া, কখনো আসে খাঁ খাঁ রোদের দুপুরের নির্জনতা। নীলকুঠির পাশের নির্জন বুনো ঝোপ বা গড়াই নদীর তীরের সেই বিষণ্ণতা—সবই যেন তাঁর নাটকের একেকটি নীরব চরিত্র। দীনবন্ধু তাঁর নাটকের পাত্র-পাত্রীদের কেবল মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেননি, তাদের চারপাশের মাটির ঘ্রাণ, ঘামের গন্ধ আর চোখের জলের আর্দ্রতাকেও জীবন্ত করে তুলেছেন। 

অনেকে প্রশ্ন করেন, দীনবন্ধু কি কেবল একজন যন্ত্রণার রূপকার ছিলেন? না, তাঁর ভেতরে এক গভীর কৌতুকবোধ ছিল। তিনি জানতেন, জীবন কেবল দীর্ঘশ্বাসের নয়, জীবন হাস্যরসেরও। কিন্তু সেই হাসিটি ছিল চোখের জলের ওপর ভেসে থাকা এক টুকরো খড়কুটোর মতো। তিনি যখন 'বিয়ে পাগলা বুড়ো'র রাজীব লোচনকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, তখন সেই ব্যঙ্গের আড়ালে বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা আর সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। এই যে ট্র্যাজেডি আর কমেডির এক অদ্ভুত মিশেল, যা আমরা শেকসপিয়রের নাটকে দেখি, দীনবন্ধু তা অনায়াস দক্ষতায় বাংলায় আমদানি করেছিলেন। 

১৮৭৩ সালে তাঁর অকালপ্রয়াণ যখন ঘটে, তখন বাংলা সাহিত্য এক বিশাল অভিভাবককে হারিয়েছিল। মাত্র চুয়াল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা শত বছরের সঞ্চয়কেও হার মানায়। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর স্মরণে লিখেছিলেন, দীনবন্ধুর হৃদয় ছিল এক বিশাল সমুদ্রের মতো, যেখানে সবার জন্য স্থান ছিল। সেই হৃদয়ের উত্তাপই আজও তাঁর লেখাকে সতেজ করে রাখে। 

দীনবন্ধু মিত্রের সাহিত্যিক বীক্ষা ছিল একাধারে সমাজতাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিক এই অর্থে যে, তিনি মানুষের ভেতরের সেই শাশ্বত সত্তাকে চিনতে পেরেছিলেন যা সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চায়। তাঁর লেখার প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি বীজের মতো, যা সময়ের সাথে সাথে মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আজ যখন আমরা বিশ্বায়নের এই গোলকধাঁধায় নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজছি, তখন দীনবন্ধুর সেই গ্রামমুখী, মৃত্তিকালগ্ন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শিকড়ের সন্ধান দেয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, মাটির কাছাকাছি না থাকলে আকাশের উচ্চতা মাপা যায় না। দীনবন্ধু মিত্র বাংলা সাহিত্যের সেই আলোকবর্তিকা, যা অন্ধকার সময়ে জ্বলে ওঠে আর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই, আর মানুষের দুঃখের চেয়ে বড় কোনো সাহিত্য হতে পারে না। 

আজ ২০২৬ সালের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে দীনবন্ধু মিত্রের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়নি, বরং নতুন আঙ্গিকে ফিরে এসেছে। হয়তো নীলকুঠির সেই চাবুক আজ নেই, কিন্তু নব্য-সাম্রাজ্যবাদ আর কর্পোরেট শোষণের রূপটি আজও ভিন্নভাবে বর্তমান। আজও যখন কোনো প্রান্তিক কৃষক তাঁর ঘাম ঝরানো ফসলের দাম পায় না, কিংবা কোনো শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন 'নীল দর্পণ'-এর হাহাকার নতুন করে শোনা যায়। দীনবন্ধু শিখিয়েছিলেন যে, সাহিত্যিকের কলম যেন কোনো শক্তির কাছে মাথা নত না করে। তাঁর সাহিত্য ছিল মানুষের জন্য, মাটির জন্য। 

দীনবন্ধু মিত্র কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন। তিনি এক চিরন্তন বিদ্রোহের নাম। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো—সে তোরাপ হোক বা নিমচাঁদ—সবাই যেন আমাদের চারপাশে আজও ভিড় করে থাকে। তাঁরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মুক্তির সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না। দীনবন্ধু মিত্রের সাহিত্য মানেই হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন যুদ্ধ এবং আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোর এক কালজয়ী অঙ্গীকার। বাংলার আকাশের সেই উজ্জ্বল ধ্রুবতারাটি আজও আমাদের পথ দেখায়, স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিল্পের সার্থকতা কেবল নান্দনিকতায় নয়, তার দায়বদ্ধতায়। মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পেরেছে শরীরী অর্থে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল আত্মা আজও প্রতিটি সোচ্চার মিছিলে, প্রতিটি আর্তনাদে আর প্রতিবাদের ভাষায় অমর হয়ে আছে। দীনবন্ধু মিত্র তাই কোনো অতীতের নাম নয়, তিনি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক শাশ্বত প্রেরণা।


লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন