মুক্তাগাছায় ভোটকেন্দ্র সংস্কারের ৪০ লাখ টাকায় অনিয়মের অভিযোগ
বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কার কাজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কোনো দৃশ্যমান কাজ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিল ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা উপজেলার ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ভোটকেন্দ্র সংস্কার বাবদ প্রায় ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে সুহিলা, মহিষতারা, চেচুয়া, বাঁশাটি জগন্নাথবাড়ী, শিমলা, আমির উদ্দিন পৌর, কান্দুলিয়া ও আরফান আলী পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে রাজাবাড়ী, নরকোনা, সৈয়দপাড়া, কান্দাপাড়া, সত্রাশিয়া, আমোদপুর ও সৈয়দগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া মনতলা বিদ্যালয়ে ১ লাখ ২০ হাজার, মন্ডলসেন ও জয়দা বিদ্যালয়ে ৯০ হাজার, রঘুনাথপুর ও হায়দরপুর বিদ্যালয়ে ৮০ হাজার, কুতুবপুর ও বন্দগোয়ালিয়া বিদ্যালয়ে ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ে ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে দেয়াল রং, বেঞ্চ মেরামত, টয়লেট সংস্কার বা শ্রেণীকক্ষ উন্নয়নের কোনো কাজই হয়নি। কোথাও কোথাও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে দায়সারা কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
গাড়াইকুটি (দক্ষিণ) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কাজই হয়নি। এমনকি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরাও জানেন না যে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোরশেদা আজিজ জানান, টাকা সময়মতো উত্তোলন করা হলেও নানা কারণে সংস্কার কাজ করা হয়নি, তবে কাজ করা হবে। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে এড়িয়ে যান। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা কোনো কাজ হতে দেখেননি এবং বরাদ্দ বা ব্যয়ের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজন দোকানদার জানান, তারা সাংবাদিকদের মাধ্যমেই জানতে পেরেছেন যে বিদ্যালয়ের জন্য সংস্কার বাবদ অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।
অভিভাবক সদস্যদের অভিযোগ, সাধারণত বিদ্যালয়ের উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে কমিটির বৈঠক হয়, কিন্তু এবার কোনো বৈঠক হয়নি। সবকিছু গোপনে সম্পন্ন হয়েছে এবং পরে বলা হয়েছে কাজ শেষ।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে আরফান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। সেখানে কাজ না করেই অধিকাংশ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সেলিম মিয়া এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “এই বিষয়ে খোঁচাখুঁচি করবেন না। আমরা শিক্ষা অফিসারকে দেবীর মতো মানি। লেখালেখি করে লাভ নেই, যা হওয়ার হয়ে গেছে।”
স্থানীয় এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের স্কুলে কোনো পরিবর্তন দেখি না, অথচ কাগজে-কলমে সব কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। তাহলে টাকা গেল কোথায়?”
পৌর শহরের নায়েব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা খাতুন জানান, সংস্কার বাবদ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ভ্যাট কেটে তিনি ৪০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এর মধ্যে টাকা তুলতে গিয়ে আরও ১,৫০০ টাকা সরকারি অফিসে দিতে হয়েছে। বাকি অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের কাঁচি গেট মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কমিশন বা ‘পার্সেন্টেজ’ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু শিক্ষক, শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী একটি মহল মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এসব সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং নির্বাচনী প্রস্তুতিতেও বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে তদন্ত করা হোক। তারা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে বিল উত্তোলনের সময় অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কবিতা নন্দী বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতেই বিল সুপারিশ করার কথা ছিল। তিনি এ বিষয়ে ইউএনও’র কাছে একাধিকবার গিয়েছেন, তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম জানান, তাদের টিম কাজগুলো পরিদর্শন করেছে। তবে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে দেখা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, “কাজ না করেই বিল উত্তোলনের বিষয়ে কোনো অভিযোগ এখনো পাইনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
১২৫ বার পড়া হয়েছে