সর্বশেষ

সাহিত্য

দ্বীপকূলে

নূর ই সিয়াম উচ্চারণ
নূর ই সিয়াম উচ্চারণ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:০০ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:

একদিকে বন, অন্যদিকে পাহাড়, একদিকে আবার সমুদ্র। প্রকৃতি যেন দুহাত ভরে দিয়েছে। সকাল হলেই রাতে ভেজানো ভাত, আর কাঁচা মরিচ সাথে ১ টুকরা বড় আকারের ১টা পেঁয়াজ চিবিয়ে গোগ্রাসে মাটির পেয়ালা থেকে পানি গিলে আজ বের হয়েছে নন্দু। ওর একটা বাজে স্বভাব আছে, রাত বিরোতে হুট করেই ঘর থেকে বের হয়ে যাবার স্বভাব। আশেপাশে ঘর-দোরও নেই তেমন। সমুদ্রের কোল ঘেষে এক ছোট্ট দ্বীপ, দ্বীপের মাঝ বরাবর বিশাল বিশাল বহু প্রজাতির, বহু গাছ। ওগুলোর নাম জানে না নন্দু। এ অঞ্চলে সর্বসাকুল্যে ২০টার মতো ঘর। নন্দুদের সবথেকে কাছে যে বাড়িটা সেটাও অর্ধ কিলো আন্দাজমতো। ছোট্ট দ্বীপ হলেও যতটা ছোট হওয়ার কথা ততটাও না,অন্তত ২০ টা ঘরের জন্য দ্বীপটা যেন এক দেশই বটে।

আজ সারাটা দিন আকাশটা পরিষ্কারই ছিল। বিপত্তি বাধিয়ে বসল অপরাহ্নের দিকে। আকাশ যেন রণমূর্তি হয়ে বিপ্লব করে বসেছে। দক্ষিণ কোণ থেকে কালো কালো অজগরের মতো মেঘ এসে দ্বীপকূলে বাজার বসাতে লাগলো। হাট পুরোপুরি জমতে জমতে আরো অনেকক্ষণ লাগিয়ে দিলো। মেঘ ডাকছে শেয়ালের চেয়েও জোরে। মনে হচ্ছে খিরকির পাশে ১০-১২টা ভরাযৌবনের শেয়াল ডাকছে।

ঘরের সবথেকে প্রৌঢ় রায় দিলেন, " তেনার সময় অয়ে এলো, রক্ষে করো আল্লাহ, তুমি সহায়"।
বুকের ভেতর চিনচিনে মর্সিয়া শুরু হলো নন্দুর। আন্দাজমতো ক্রোশ হাঁটলে ৫-৬ ঘরের বসবাস। সেখানে এক ঘরে থাকতো অশীতিপর এক প্রৌঢ়া। নিজের দাদির মতোই ভালোবাসতো সে। বহুদিন ওদিকে সে যায় না।
এদিকে আকাশের যে অবস্থা তাতে তো মনে হয় বৃদ্ধার অর্ধভগ্ন ঝুপড়িটা ভেঙ্গে যাবে।দুনিয়ায় তার আপন বলতে কেউ নেই। অন্নজোটে অন্যের দয়ায়,পাশের বাসার কমলা, রহিমরা বেলাভাগে খাবার দেয়। কথাগুলো মনে করতে করতেই চোঁখের নিচটায় পানিতে ছোটখাট ডোবা হয়ে গেছে তার। অন্যমনে এসব ভাবছিল সে, ভাত নিয়ে চুপ করে বসে আছে সে, খানিক রাগান্বিত স্বরে মায়ের গগণবিরাগী ঝনঝনানিতে হুশ ফিরে পেতে না পেতেই মায়ের সন্দেহজনক প্রশ্ন,
---"কিরে খোকা,তোর চোখে জল?" খোকার অপ্রস্তুত উত্তর,
"না মা কিছু না"
কথা শেষ না হতেই দৌঁড়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পরে।

এদিকে বৃষ্টির ফোটা পরতে শুরু করেছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি যেন চেঙ্গিস বাহিনি হয়ে উঠলো। মাটির ঘরে, উপরে শনের ছাদ বেয়ে বৃষ্টি যেন এবার ঘরে আসা শুরু করলো। ওদিকে উত্তরের দিকে ছিল তাদের গরুর একখানা গোয়ালঘর। গরুটা পোয়াতি। কি নাদুস নুদুস দেখতে! ভালোবাসে সে ওকে ডাকে রাজাবাবু বলে! তার জন্যও তার দুঃচিন্তার শেষ হচ্ছে না।
ওহ আল্লাহ, আমার ফুলকলির কি হবে, রক্ষে করো মাবুদ,রক্ষে করো।

ফুলকলি ছোট্ট ফুটফুটে, ছটফটে ৮-৯ বছরের এক মেয়ে। নন্দুর সাথে বেজায় ভাব। ওদিকটায় গেলেই ওর সাথে ভাব জমাতে ভোলে না। এসব ভাবতে ভাবতে ও পাড়ার রহিম মিয়ার ডাক,
" ও রহমান, বলি ও রহমান,শুনছো বাপু?বলি কাহিনি খানা জানো নি? দোর খোলো বাবু কাকভেজা ভিজে গেলাম যে!
রহমানের চোঁখ মাত্র বুজছিল, ঠিক ঘুমোয়নি তবে তন্দ্রাচ্ছন্নে ছিল। রহিম মিয়ার ডাকে, অনেকটা থতমতো খেয়েই ঘরের দরজা খুললো। খুলতেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিচমিচে কালো, বলিষ্ঠ, সদ্য চল্লিশ পার করা মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোককে সে কিন্তু অনায়াসেই চিনতে পারলো। আধাপাকা দাড়িগুলো বৃষ্টির বাগরায় ভিজে চুপচুপ করছে।এসব ভাবতে সময় লাগলো না, রহিম মিয়ার মৃদ্যুস্বরে জবাব,
"বলি ভাইগা, ও বুড়ি তো মরতে বয়েচে?" রহমানের প্রশ্নসূচক জবাব, বলেন কি? হ্যাঁ,গা!বলি নন্দু হারামজাদা কৈ গা? ওকে ডাকো, ওকে দেখতে চায় সে। এই বাদলার রাতে না গেলেই কি না? কথা শেষ হলো কিনা কে জানে, রহিম মিয়া ও ঘরে নন্দুকে ডাকতে চলে গেলো,নন্দুও ঘর থেকে যেন সবই শুনছিল। প্রস্তুত হয়েই ছিল।রহিম মিয়ার প্রবেশমাত্রই সে তার হাত ধরে বেরিয়ে এলো। বিপত্তি বাঁধলো পথিমধ্যে। ঐ প্রথম লাইনেই বলেছিলাম দ্বীপকূল পাহাড়, বন আর সমুদ্রের এক ত্রিমিলনভূমি।বরষার আতিশয্যে পাহাড় ধ্বস শুরু হয়েছে। ওদিকে রহিম মিয়ার গাঁয়ে যেতে পাহাড় পাদদেশ হয়েই যেতে হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রকান্ড এক পাহাড়খন্ড এসে ওদের রাস্তাটা বন্ধ করে দিলো। খানিক ব্যথাও পেয়েছে দু'জনেই। চল্লিশোর্ধ রহিম মিয়া পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হলে বসে পরেন। পরে হাত দিতেই বুঝতে আর বাকি থাকে না এটা রক্ত। শুধু রক্ত না, মনে হচ্ছে রক্তগঙ্গার স্রোতধারা তার পা দিয়ে বহমান, এ স্রোত অসহনীয়!
এবার রহিম মিয়া বেশ আর্তস্বরে কাতর কন্ঠে খানিক অসহায়ত্ব মিশিয়ে নন্দুকে বললেন,
"বাপ, দেখ তো আশপাশে কোনো গাছ পাশ কিনা। "
নন্দু অন্ধকার অমানিশায় হাতরাতে হাতরাতে বেশ কিছুক্ষণ পর যখন ঐ সেখানে পৌছালো তখন সে যেন দুনিয়ায় জাহান্নামের এক জলস দেখতে পেলো। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে,ঘুরঘুট্টি আরো অন্ধকার! এ অন্ধকার হয়তো সকালের মিষ্টি রোদেও জুড়োবে না। রহিম মিয়া নেই! নেই মানে সত্যিই নেই। এমন আস্ত মানুষটা কই গেলো?!
এখন তো জোয়ারের সময়, অতি নিকটেই সমুদ্র।তবে কি জলোচ্ছ্বাসই? তবে তা কি করে হবে এখনো তো এদিকটায় পানি আসে নি?

সে দৌঁড় দিলো, সমুদ্রের কাছে যেতে অশান্ত সমুদ্রকে আবিষ্কার করল এবং তার আর বুঝতে বাকি রইল না ব্যাপারখানা। ছোটবেলা থেকে কত দূর্ঘটনারই তো স্বাক্ষী সে, গতবছরও ২-৩ জন মাঝিমাল্লা মাছ নিতে গিয়ে আর আসে নি। শ্যামলকেও তো খেয়েছে সমুদ্র!
রেডিওতে শুনেছে 'জলবায়ু পরিবর্তন' ইংরাজিতে কি যেনো কি কয়? " হ, হ কিলাইমেট চিঞ্জো' দ্বীপে কতশত গাছপালা কাটা পড়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। নন্দু এও শুনেছে গাছ মানুষের পরম বন্ধু। না কিছু একটা করতে হবে, মানুষকে বোঝাতেই হবে। কিন্তু কি করে আগের সেই সুন্দর,সবুজ পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে,কিভাবে সমুদ্রের আগ্রাসন থেকে দ্বীপকে বাঁচাবে সে?

ভাবতে ভাবতে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের পানে একবার ফিরে চায় সে।
সাথে সাথে তার চোঁখ বন্ধ, কিছুক্ষণ পর তার অবচেতন মনের উত্তর, গাছ,গাছ, গাছ...


 লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর

১৯৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন