সর্বশেষ

মতামত

ছায়া হারায় বৃক্ষ ও মানব, অথচ অমলিন ভৌগোলিক স্মৃতি

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৩৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
স্থাননাম বিজ্ঞানের গভীর পর্যালোচনায় পরিলক্ষিত হয়—জনবসতির ভৌগোলিক সংকেতগুলো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং স্থানান্তরের নীরব দলিল। মহাকালের স্বাভাবিক নিয়মে দৃশ্যমান রূপ, প্রাণীকূল ও বস্তুসত্তা বিলীন হয়; তবে নামগুলো নির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক হিসেবে মানুষের সামাজিক স্মৃতিতে রয়ে যায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর উৎপত্তিতে যে সত্তার প্রাথমিক ভূমিকা থাকে, তা অনুপস্থিত হয়ে গেলেও তার ভাষাভিত্তিক রূপান্তর থেকে যায় অক্ষুণ্ণ।
লিটন আব্বাস

'ফকিরতলা' নামক ভৌগোলিক মোড়টির বিশ্লেষণ এই সত্যকে প্রমাণিত করে। কোনো এক সময় সাধক কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের উপস্থিতি নির্দিষ্ট স্থানটির প্রাথমিক সামাজিক পরিচয় গড়ে তুলেছিল। প্রাক-আধুনিক সময়ে ওই সত্তার ভৌত অবসান ঘটে, আস্তানার অবকাঠামোও মুছে যায়। তথাপি জনপরিসরে স্থানটি আপন ভৌগোলিক সংকেত হারায়নি।

অনুরূপভাবে 'মায়ান মোড়' নামক স্থাননাম ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক নগর কাঠামোর স্মারক। নির্দিষ্ট মায়ান নামক ব্যক্তি বহু পূর্বে বিদায় নিলেও, পরিবহনের দৈনন্দিন ব্যবহারে এবং সাধারণের উচ্চারণে তার নাম স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠেছে।

শুধু ফকিরতলা কিংবা মায়ান মোড়ই নয়, বাংলাদেশের মানচিত্রজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এমন হাজারো স্মৃতির প্রত্নতত্ত্ব। ঢাকার 'হাতিরঝিল' কিংবা 'নীলক্ষেত'-এর কথাই ধরা যাক। যে ঝিলে একসময় ভাওয়াল রাজার হাতি স্নান করত কিংবা যেখানে ঔপনিবেশিক আমলে নীল চাষ হতো, আজ তার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই; কিন্তু নাম দুটি আজও দেশের অন্যতম ব্যস্ত স্থানাঙ্ক।

চট্টগ্রামের 'বটতলী' কিংবা সিলেটের 'টিলাগর' যেমন অতীত প্রকৃতির সাক্ষ্য দেয়, তেমনি রাজশাহীর 'ঘোড়ামারা' এবং খুলনা ও বরিশালের বিভিন্ন এলাকার 'কদমতলা' ও 'পাহাড়তলী'-র মতো নামগুলো হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ও প্রাণীকূলের স্মারক বহন করে চলেছে।

উদ্ভিদভিত্তিক নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই রূপান্তর গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। 'জামতলা', 'আমতলা' কিংবা 'ঝাউতলা' বিষয়গুলো খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একসময় বিশালাকার প্রাচীন বৃক্ষ সীমানা নির্ধারণ ও দিকদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল। আধুনিক নগরায়ণ, বৃক্ষচ্ছেদন ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বৃক্ষগুলোর অবসান ঘটেছে বহু আগেই। তবে প্রজাতিগুলোর নাম রয়ে গেছে স্বমহিমায়। ফলে রিকশাওয়ালা, চালক ও সাধারণ যাত্রী নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করতে কাল্পনিক সেই বৃক্ষের আশ্রয় নেন।

বস্তুগত অবক্ষয় ও জীবনের অবসান সত্ত্বেও স্থাননামগুলোর এই টিকে থাকা ইতিহাসের চমৎকার বৈপরীত্য। দৃশ্যমান রূপ ও অস্তিত্ব নশ্বর হলেও ভাষার ব্যাকরণে স্থাননাম অমরত্ব লাভ করে। মানুষের নাম মুছে যায়, বন উজাড় হয়, বহুতল ভবনের চাপে প্রাচীন অবকাঠামো ধূলিসাৎ হয়—কিন্তু স্থাননামগুলো থেকে যায় স্বমহিমায়। এই নামগুলো আমাদের প্রতিদিনের পথচলার মানচিত্র হয়ে কেবল ইতিহাসকেই নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া কাল ও সময়ের অমলিন স্মৃতিকে যুগ যুগ ধরে বহন করে চলে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার।

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০