সংসদে ঐতিহাসিক বিল পাশঃ বিরোধীদের আপত্তি
সম্পত্তি দান করেও আজীবন সুরক্ষা: নতুন আইনে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভোগাধিকার নিশ্চিত
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:১২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। এই বিল পাসের মাধ্যমে ১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’-এ ঐতিহাসিক সংশোধন আনা হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে—বাবা-মা বা দাদা-দাদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার পাবেন।
সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বিলটি পাস হয়। সরকারি দলের পক্ষে বিলটি উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ভোটাভুটির পর বিলটি সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী পাস বলে ঘোষণা করেন স্পিকার।
বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে: বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে নিজের কষ্টের সম্পত্তি সন্তানের নামে দান করে দেন। কিন্তু সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার পর সন্তান (বা তার স্ত্রী/স্বামী) বৃদ্ধ অভিভাবককে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেন, দায়িত্ব নিতে চান না। সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার পর অনেক সন্তান বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে আর সংসারের অংশ হিসেবে রাখতে চান না। এমন মানসিকতা অনেক পরিবারেই দেখা যায়।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সরকার ১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’-এ সংশোধন আনে। নতুন বিলে ‘Gift reserving life interest’ নামে একটি নতুন পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে, যেখানে মালিকানা ও ভোগাধিকার পৃথক থাকবে।
আইনের মূল বিধান অনুযায়ী, পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি যদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করেন, তবে মালিকানা গ্রহীতার কাছে চলে যাবে, কিন্তু দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার দাতার কাছেই থাকবে। একই বিধান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সংসদীয় আলোচনায় বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক বাবা-মাকে সম্পত্তি সন্তানের নামে লিখে দিতে বাধ্য করা হয়, পরে তাদেরকেই সেই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বা ভোগাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই সংশোধনের লক্ষ্য এমন অভিভাবকদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া, যেন তারা সম্পত্তি দিলেও আজীবন নিরাপদে ব্যবহার করতে পারেন।
বিলটি পাসের সময় সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী পক্ষ, বিশেষ করে জামায়াত, দাবি করেন যে এই বিধান শরিয়াহ বা কুরআনের উত্তরাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তারা প্রশ্ন তোলেন, “কুরআনের নীতি মানব, নাকি বাদ দেব?” অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলে, এটি মূলত বয়স্কদের সুরক্ষা ও পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থা।
নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, দাতার জীবদ্দশায় যদি গ্রহীতা (সন্তান) মারা যায়, তবুও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে; পরে সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে আইন অনুযায়ী যাবে। এই ধরনের হস্তান্তর করতে রেজিস্টার্ড দলিল প্রয়োজন হবে; দলিলে জীবনকালীন ভোগাধিকারের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ। নিবন্ধনের পর এমন দান সাধারণত অপরিবর্তনীয়, তবে দুই পথে পরিবর্তন বা বাতিল সম্ভব: প্রথমত, দাতা ও গ্রহীতার উভয়ের সম্মতিতে রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে পরিবর্তন বা বাতিল, যেমন আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজনে। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো পক্ষের সম্মতি পাওয়া সম্ভব না হয়, যেমন নাবালকত্ব, নিখোঁজ, মানসিক অসুস্থতা, আইনগত অক্ষমতা বা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণ, তবে জেলা জজের অনুমোদনে পরিবর্তন বা বাতিল সম্ভব।
ব্যবহারিক দৃশ্যে, যদি দাতা অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার হয় এবং সন্তান সম্মতি দেয়, তবে রেজিস্টার্ড দলিল করে কিছু অংশ মুক্ত করে বিক্রি করা যাবে। সন্তান যদি অস্বীকার করে, তবে দাতা জেলা জজের আদালতে আবেদন করে চিকিৎসার প্রকৃত প্রয়োজন দেখালে, আদালত সম্মতি ছাড়াই দলিল পরিবর্তন বা বাতিলের অনুমোদন দিতে পারে।
একইভাবে, যদি গ্রহীতা (সন্তান) অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য সম্পত্তি বিক্রি করতে চান এবং দাতা সম্মতি দেন, তবে রেজিস্টার্ড দলিল করে বিক্রির পথ খোলা যাবে। দাতা যদি অস্বীকার করেন, তবে গ্রহীতা জেলা জজের আদালতে আবেদন করে চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজন ও সম্মতি পাওয়া সম্ভব নয় দেখালে, আদালত অনুমোদন দিতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, এই সংশোধন বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি বৃদ্ধ দাতাকে আজীবন ভোগাধিকার ও নিরাপত্তা দেয়, আবার চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে দাতা-গ্রহীতা উভয়ের জন্য সম্মতি বা আদালতি পথ খোলা রাখে।
তবে আইনের সফল প্রয়োগ নির্ভর করবে সচেতনতা ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। দাতাদের জন্য পরামর্শ, দান দলিলে স্পষ্ট শর্ত রাখুন: ভোগাধিকারের মেয়াদ, চিকিৎসার মতো প্রয়োজনে পরিবর্তনের শর্ত, বিক্রির ক্ষেত্রে দাতার সম্মতি প্রয়োজন কি না। রেজিস্ট্রেশন জরুরি; মুখের কথা বা সাধারণ দলিলে ঝুঁকি থাকে।
গ্রহীতাদের জন্য বার্তা, সম্পত্তি পেয়ে দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাবেন না। আইন দাতার ভোগাধিকার সুরক্ষিত রেখেছে, তাই বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর মানসিকতা ত্যাগ করুন। দাতার চিকিৎসার মতো প্রয়োজনে সম্মতি দিন; না হলে আদালতি ঝুঁকি থাকবে।
এই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সচেতনতা বাড়লে বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেওয়ার সংস্কৃতি কমবে, এবং পারিবারিক দায়িত্ব ও মর্যাদা বজায় থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
১৯৩ বার পড়া হয়েছে