ধূমকেতুর আল্পনা ও বিশ্ব-মানবিকতার মানচিত্র: নজরুলের চিরকালীন দ্রোহের ব্যাকরণ
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:০১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ শতকের সেই ধুলোমলিন দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। সময়টা ছিল এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণ একদিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দাপট আর অন্যদিকে পরাধীনতার গ্লানিতে নুয়ে পড়া এক বিশাল জনপদ। এশিয়া আর আফ্রিকার মানচিত্রে তখন শোষণের নীল দাগ। ঠিক সেই গুমোট আবহাওয়ায় বাংলার আকাশ চিরে উদয় হয়েছিল এক ধূমকেতুর। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তবে তাঁকে কেবল একজন 'বিদ্রোহী কবি' বা 'জাতীয় কবি'র ফ্রেমে আটকে রাখা হয়তো তাঁর বিশালতাকে অস্বীকার করারই নামান্তর। নজরুলের লড়াইটা কেবল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ছিল না; তাঁর লড়াই ছিল মানুষের ভেতরের সেই আদিম ক্ষুদ্রতা আর শৃঙ্খল মেনে নেওয়ার দাসবৃত্তির বিরুদ্ধে।
একটু নিবিড়ভাবে তাকালে দেখা যায়, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল মূলত এক প্রকার সত্তাতাত্ত্বিক জাগরণ। একে হয়তো দার্শনিক পরিভাষায় 'অনটোলজিক্যাল রেবেলিয়ন' বলা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তা ছিল স্রেফ বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সাহস। ফরাসি দার্শনিক ফ্রান্তজ ফ্যানো তাঁর ‘দ্য রেচেড অফ দ্য আর্থ’ গ্রন্থে ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের যে জটিলতা বিশ্লেষণ করেছেন, নজরুল যেন তার অনেক আগেই কবিতার ছন্দে সেই মুক্তির পথরেখা এঁকেছিলেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি ছিল না; সেটি ছিল শৃঙ্খলিত মানুষের আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের এক বৈশ্বিক চিৎকার। যখন তিনি বলেন, “আমি চির-উন্নত শির/ শির নেহারি’ আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!” তখন এই ‘আমি’ কোনো একজন ব্যক্তির অহং নয়। এই ‘আমি’ হলো সেই সমষ্টিগত সত্তা, যাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবদমন করে রাখা হয়েছে। এই ‘আমি’ যেমন গঙ্গা-পদ্মার তীরের কৃষকের, তেমনি তা নীল নদের ধারের কোনো সর্বহারা মানুষেরও।
নজরুলের এই বৈশ্বিক সত্তার গভীরে কাজ করত এক অতি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ও দার্শনিক বোধ। আজ এডওয়ার্ড সাইদের ‘অরিয়েন্টালিজম’ নিয়ে বহু চর্চা হয়, যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে পশ্চিমারা প্রাচ্যকে একটা কাল্পনিক আর হেয় ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছিল। কিন্তু নজরুল সেই যুগের মানুষ হয়েও পাশ্চাত্যের এই শ্রেষ্ঠত্ববাদকে শৈল্পিক শক্তিতে চূর্ণ করেছিলেন। তিনি প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক সম্পদ আর লড়াকু মেজাজকে এমন এক সুরে বেঁধেছিলেন, যা সাম্রাজ্যবাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯২০-এর দশকের সেই অস্থির সময় অটোমান সাম্রাজ্যের পতন, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে মানুষের হাহাকার সবটাই নজরুলের সংবেদনশীল হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছিল। তিনি বুঝেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদ কেবল ভূখণ্ড দখল করে না, সে দখল করে মানুষের মগজ আর সংস্কৃতি। তাই তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল ‘অগ্নিবীণা’র মতো একেকটি সুরের স্ফুলিঙ্গ। হোমি কে. ভাবা যে ‘হাইব্রিডিটি’ বা মিশ্রণের কথা বলেন, নজরুলের সাহিত্য যেন তাকে ছাপিয়ে এক প্রকার ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ বা প্রতিরোধী বয়ান তৈরি করেছিল। তিনি তাঁর কবিতায় যেভাবে আরবি, ফারসি আর সংস্কৃত শব্দের এক অদ্ভুত নহর বইয়ে দিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত ভাষাগত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক চপেটাঘাত। তিনি কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষার দোহাই না মেনে এমন এক জনমুখী ভাষা তৈরি করেছিলেন, যা সাধারণের প্রাণের কথা বলতে পারে।
নজরুলের আন্তর্জাতিক সংহতি বা প্যান-ইসলামিজমের ধারণাটিকে যদি একটু নিরাসক্তভাবে দেখা যায়, তবে বোঝা যাবে তা কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ধার ধারত না। কামাল পাশা, আনোয়ার পাশা কিংবা মিশরের জগলুল পাশার সংগ্রামকে তিনি দেখেছিলেন মুক্তির অভিন্ন প্রতীক হিসেবে। তাঁর কাছে ‘কামাল পাশা’ কবিতাটি কেবল তুরস্কের ইতিহাস নয়, বরং তা ছিল এক অপরাজেয় জাতির পুনরুত্থানের গান। নজরুলের কবিতায় যখন কালবৈশাখীর রক্ত-পতাকা ওড়ে, তখন তাতে যেন মিশে থাকে সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের দীর্ঘশ্বাস। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর লেখায় ‘সাবঅল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বর নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, নজরুল তাঁর রচনায় সেই নিম্নবর্গকেই সাহিত্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি যখন ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় শ্রমিকের রক্তমাখা আঙুলের হিসাব চান, তখন তিনি কেবল কাব্যচর্চা করেন না, বরং পুঁজিবাদের সেই অমানবিক যন্ত্রকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর এই সাম্যবাদ কোনো পুঁথিগত তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল মৃত্তিকা-সংলগ্ন এক মানবিক অনুভব। কারখানার যান্ত্রিকতা নয়, মানুষের প্রতি এক অতীন্দ্রিয় প্রেম থেকেই তাঁর এই সাম্যবাদী দর্শনের জন্ম।
আজকের এই ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, যখন জেন্ডার পলিটিক্স বা লিঙ্গ-রাজনীতি নিয়ে চারদিকে এত তর্ক-বিতর্ক, তখন নজরুলের ‘নারী’ কবিতার সেই অমোঘ বাণী আজও কানে বাজে। “বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” এটি কেবল সম-অধিকারের স্লোগান ছিল না, বরং এটি ছিল এমন এক জীবনদর্শন যেখানে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের কোনো স্থান নেই। নজরুল নারীকে কেবল দেবী বা ভোগের সামগ্রী হিসেবে দেখেননি, বরং দেখেছেন সৃষ্টির মূল প্রেরণা হিসেবে। বর্তমান বিশ্ব যখন কর্পোরেট চশমায় নারীকে পণ্য হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন নজরুলের এই কবিতা মানুষের আত্মমর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক দেয়। তিনি নারীর ভেতর সেই শক্তিকে অনুভব করেছিলেন, যা ঘর আর বাহির উভয়কেই আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে।
নজরুলের সাহিত্যের প্রাণভোমরা ছিল তাঁর অকৃত্রিম মানবতাবাদ। যে সময়টায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর বিভাজনের বিষবাষ্পে ভারতবর্ষের বাতাস ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছিল, নজরুল তখন নির্ভয়ে ঘোষণা করেছিলেন “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” তাঁর এই দর্শন কেবল তৎকালীন বাংলার জন্য নয়, বরং বর্তমানের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা আর জাতিগত সংঘাতের পৃথিবীতে এক মহৌষধ। তিনি ধর্মের বাহ্যিক আচারের চেয়ে মানুষের পবিত্র হৃদয়কে অনেক উঁচুতে স্থান দিয়েছিলেন। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণেই তিনি প্রকৃত অর্থে একজন ‘কসমোপলিটান’ বা বিশ্ব-নাগরিক হয়ে উঠেছিলেন। বিশ শতকের অনেক বড় কবিও যখন নিজের জাতীয়তাবাদের গণ্ডিতে বন্দি ছিলেন, নজরুল তখন সীমান্ত পেরিয়ে শোষিত মানুষের এক অভিন্ন মানচিত্র এঁকেছিলেন। তাঁর এই বিশ্ব-নাগরিকত্ব কোনো বিমূর্ত কল্পনা ছিল না, এটি ছিল রক্ত-মাংসের মানুষের বেদনার সাথে একাত্ম হওয়া।
সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের ক্ষেত্রে নজরুলের অবদানকে আজ নতুন করে বিচার করা প্রয়োজন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল পশ্চিমের রেনেসাঁর অন্ধ অনুকরণ করে আধুনিক হওয়া যায় না। আধুনিকতা থাকতে হয় নিজের শেকড়ে, নিজের ঐতিহ্যে। প্রাচ্যের ধ্রুপদী সঙ্গীত আর বাংলার লোকজ সুরের যে মেলবন্ধন তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক নান্দনিক বিদ্রোহ। তাঁর গজল আর শ্যামাসঙ্গীত একই মোহনায় এসে মিশেছে। আজকের এই ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা উত্তর-সত্যের যুগে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের সংস্কৃতিকে একঘেয়ে করে তুলছে, সেখানে নজরুলের আত্মপরিচয়ের লড়াই শেখায় কীভাবে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেও বিশ্বের সাথে পা মেলানো যায়।
এখনকার এই সময়ে যখন আমরা ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে কঙ্গোর খনিজ খনিগুলোর দিকে তাকাই, দেখি সাম্রাজ্যবাদ কেবল তার মুখোশ বদলেছে। বড় বড় কর্পোরেশন আর শক্তিশালী দেশগুলো আজও দুর্বল জনপদগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় নজরুলের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি আজও প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে বজ্রের মতো প্রতিধ্বনিত হয়। “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ ওই নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়!” এই যে নূতনের আবাহন, তা কেবল সময়ের ক্যালেন্ডার বদলানো নয়, বরং এটি শোষিত মানুষের এক নতুন রাজনৈতিক ও আত্মিক জাগরণ। তাঁর দ্রোহ ছিল মূলত এক প্রকার সৃজনশীল ধ্বংস। জরাজীর্ণ আর পচা-গলা পুরাতনকে তিনি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এক সুন্দর ও মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষায়। এমনকি আজকের পরিবেশগত সংকটের দিনে নজরুলের প্রকৃতিপ্রেম এক ভিন্ন ব্যঞ্জনা পায়। তিনি প্রকৃতিকে কেবল উপভোগের বস্তু ভাবেননি; তাঁর কাছে পাহাড়, নদী আর অরণ্য ছিল মানুষের সংগ্রামের নিত্যসঙ্গী। প্রকৃতির রুদ্র রূপের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন শোষকের বিরুদ্ধে প্রকৃতির নিজেরই এক অঘোষিত বিদ্রোহ।
লুই আলথুসার-এর ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস’ বা আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রের তত্ত্বর কথা ভাবলে দেখা যায়, নজরুল কীভাবে সেই অদৃশ্য শৃঙ্খলকে চুরমার করেছিলেন। তিনি কেবল ব্রিটিশদের তৈরি আইন ভাঙেননি, বরং ঔপনিবেশিক শিক্ষার মাধ্যমে তৈরি হওয়া সেই ‘মগজ ধোলাই’ বা হেজেমনিকেও তুচ্ছ করেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামশি বর্ণিত এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য ভাঙার জন্য প্রয়োজন ছিল নজরুলের মতো এক বাউণ্ডুলে আর নির্ভীক আত্মার। তিনি কোনো সরকারি পদ বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন না; তাঁর মূল শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের নিখাদ ভালোবাসা। তাই তিনি অবলীলায় বলতে পারতেন “মম ললাট-ঘিরে জয়-তিলক রাজ-রাজেন্দ্রের জয়ী।” এই জয় ছিল আত্মার স্বাধীনতার জয়।
নজরুলকে কেন ‘তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র’ বলা হয়? এর কারণ কেবল তাঁর জন্মবৃত্তান্ত নয়। এর কারণ তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের মানুষের সম্মিলিত আর্তনাদ। লাতিন আমেরিকার পাবলো নেরুদা কিংবা আফ্রিকার চিনুয়া আচেবের লেখায় যে যন্ত্রণার প্রতিফলন আমরা পাই, নজরুল তার কয়েক দশক আগেই সেই যন্ত্রণাকে মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছিলেন। তিনি এমন এক বিরল কবি, যিনি একই সাথে কৃষকের লাঙল ধরার গান গেয়েছেন আবার রাজবন্দীর শৃঙ্খল ভাঙার সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি যদি আজ স্প্যানিশ বা সোয়াহিলি ভাষায় অনুবাদ করে গ্লোবাল সাউথের কোনো প্রান্তে পাঠ করা হয়, তবে সেখানকার মানুষও তাতে খুঁজে পাবে তাদের নিজেদেরই ছায়া। এখানেই নজরুলের চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতা। তাঁর কবিতা কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে আটকে থাকে না, তা স্থান ও কালের সীমানা ডিঙিয়ে হয়ে ওঠে সর্বজনীন।
নজরুলের জীবনের ট্র্যাজেডি আর নীরবতাও যেন এক বড় দার্শনিক ইঙ্গিত। জীবনের শেষ দীর্ঘ সময় তিনি মৌন ছিলেন। কিন্তু সেই নীরবতা কি কেবলই অসুস্থতা ছিল? নাকি তা ছিল এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীর প্রতি এক তীব্র অভিমান? তবে তাঁর শব্দগুলো কখনও নীরব হয়নি। ২০২৬ সালের এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক আবহে নজরুল আমাদের সামনে এক ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছেন। তিনি শিখিয়েছেন যে, ভয়কে জয় করাই হলো স্বাধীনতার প্রথম পাঠ। নজরুলের সেই অমোঘ বাণী “যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত!” যতদিন পৃথিবীতে এই শোষণ আর বঞ্চনা থাকবে, ততদিন এই রণ-ধ্বনি প্রতিটি মিছিলে প্রাণের স্পন্দন জোগাবে।
নজরুল মানেই হলো শৃঙ্খল ভাঙার উল্লাস, নজরুল মানেই হলো সাম্যের এক মহোৎসব। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি লড়াকু মানুষের আত্মার আত্মীয় হয়ে। তাঁর বৈশ্বিক সত্তা কোনো ভৌগোলিক মানচিত্রের দাস নয়, বরং তা মানবপ্রেমের এক অসীম আকাশ। কোনো কোনো মানুষ নশ্বর হয়েও অবিনাশী হয়ে ওঠেন তাঁদের কর্মের গুণে। নজরুল তেমনই এক সত্তা, যা সময়ের ঘড়ি ধরে বিচার করা অসম্ভব। আজ থেকে হাজার বছর পরেও যখন কোনো মানুষ শৃঙ্খল মুক্তির স্বপ্ন দেখবে, তাকে নজরুলের কাছেই ফিরে আসতে হবে। কারণ নজরুল কেবল একজন কবি নন তিনি এক অক্ষয় দর্শন, এক চিরন্তনী বিপ্লব, আর আমাদের সবার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সেই অবিনাশী মানুষটির এক জাগরূক রূপকার।
একটু ভেবে দেখলে মনে হয়, নজরুল কি তবে সেই আগত সময়েরও কবি নন? যখন মানুষ যন্ত্রের ভিড়ে নিজের অস্তিত্ব হারাবে, তখন নজরুলের মাটির গানগুলোই তাকে মনে করিয়ে দেবে যে সে রক্ত-মাংসের এক সংবেদনশীল জীব। তিনি ছিলেন সেই শিল্পী, যিনি প্রলয়ের মাঝেও সৃষ্টির বীণা বাজাতে জানতেন। ধ্বংস আর নির্মাণ এই দুইয়ের যে নিবিড় খেলা মহাবিশ্বে চলছে, নজরুলের জীবন আর সাহিত্য ছিল তারই এক ছোট সংস্করণ। তাই তো তিনি আজও প্রাসঙ্গিক, আজও অনিবার্য। ২০২৬ সালের এই সকালের রোদে কিংবা কোনো এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় যখন নজরুলের কোনো গান কানে ভেসে আসে, মনে হয় তিনি যেন পাশের ঘরে বসেই আমাদের সাথে কথা বলছেন। তাঁর সেই চির-উন্নত শির আজও আমাদের প্রেরণা দেয় অনাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। নজরুল তো কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি কোনো চরিত্র নন, তিনি আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নজরুলের চেতনার যে স্রোত গঙ্গা-পদ্মা ছাড়িয়ে ভলগা বা মিসিসিপিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে, তা অনন্ত। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক পৃথিবীর যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা জাতের কোনো দেওয়াল থাকবে না। আজ হয়তো সেই স্বপ্ন পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু সেই স্বপ্নের বীজ তিনি আমাদের অন্তরে বুনে দিয়ে গেছেন। সেই বীজের অঙ্কুরোদ্গমই হলো মানুষের প্রকৃত মুক্তি। নজরুল মানেই হলো সেই মুক্তির জয়গান। তিনি কেবল পরাধীন উপমহাদেশের কবি নন, তিনি বিশ্বের প্রতিটি শৃঙ্খলিত প্রাণের নিজস্ব কণ্ঠস্বর। বিশ শতকের সেই বিদ্রোহ আজ একুশ শতকের এই মধ্যভাগেও আমাদের পথ দেখায়। তাঁর সেই ধূমকেতুর মতো উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্ধকার যতই ঘন হোক, একটা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট সব তিমির বিদীর্ণ করার জন্য। কাজী নজরুল ইসলাম সেই অবিনাশী স্ফুলিঙ্গ, যা চিরকাল জ্বলবে মানব সভ্যতার প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৩ বার পড়া হয়েছে