কাজল মাজমাদারের মানবিক উদ্যোগ রূপ নিল 'ময়লার স্তূপ থেকে শিশুদের স্বপ্নের মাঠে'
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১:৩৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
একটি উদ্যোগ, একটি শিশুর হাসি এবং নিজের শহরের প্রতি গভীর ভালোবাসার গল্প কিছু পরিবর্তন খুব ছোট পরিসরে ঘটে, অথচ তার আবেদন ছড়িয়ে পড়ে মানুষের হৃদয়ের অনেক গভীরে। কিছু উদ্যোগের জন্য বিশাল বাজেট কিংবা দীর্ঘ পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না—প্রয়োজন হয় শুধু একটি নির্মল ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ এবং নিজের শহরের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ায় জেলা পরিষদ সংলগ্ন স্বতীশ চন্দ্র সাহালেনের দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত ময়লার স্তূপ যখন শিশুদের খেলার মাঠে রূপ নিল, ঠিক তেমনই এক অনুভূতির জন্ম হয়েছে কুষ্টিয়াবাসীর হৃদয়ে।
যে জায়গাটি দীর্ঘদিন ছিল ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, দুর্গন্ধ আর অবহেলার প্রতীক—সেই জায়গাটিই যখন মাত্র এক দিনের ব্যবধানে শিশুদের খেলার মাঠে রূপ নিতে শুরু করল, তখন মনে হলো—ময়লার স্তূপের নিচে আসলে চাপা পড়ে ছিল একটি প্রজন্মের শৈশব।
আর সেই শৈশবকে যেন আবার ফিরিয়ে দেওয়া হলো শিশুদের হাতে।
একটি মাঠ কোনোদিনই শুধু কিছুটা খালি জমি নয়।
একটি মাঠ মানে শিশুর উচ্ছ্বাস।
একটি মাঠ মানে বিকেলের কোলাহল।
একটি মাঠ মানে বন্ধুত্বের জন্ম।
একটি মাঠ মানে শরীরচর্চা, সুস্থতা ও নির্মল আনন্দ।
আর একটি মাঠ মানে—একটি শিশুর স্বপ্ন দেখার জন্য একটু বড় আকাশ।
সেই জায়গাটি যখন একটি ময়লার ভাগাড় থেকে শিশুদের মাঠে পরিণত হয়, তখন এটি শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানবিকতার এক অসাধারণ স্বাক্ষর।
এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যাঁর নাম গভীরভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ মো: আক্তারুজ্জামান (কাজল মাজমাদার)।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল রাজপথ থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন গণআন্দোলনের পথ ধরে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় যিনি মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, রাজপথে থেকেছেন—কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় তাই শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়; বরং বহু মানুষের কাছে তিনি রাজপথের এক পরিচিত মুখ, মানুষের সুখ-দুঃখের একজন আপনজন।
রাজনীতির অভিধানে অনেক শব্দ আছে—নেতাকর্মী, সংগঠক, জনপ্রতিনিধি। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের অভিধানে সবচেয়ে মূল্যবান শব্দটি হলো—আপনজন।
আর একজন রাজনৈতিক মানুষ তখনই মানুষের আপনজন হয়ে ওঠেন, যখন তিনি মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করেন; যখন অন্যের সমস্যাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে অনুভব করেন; যখন কোনো প্রচার, পদ কিংবা প্রতিদানের অপেক্ষা না করে মানুষের প্রয়োজনের জায়গায় দাঁড়িয়ে যান।
ময়লার ভাগাড়ের জায়গায় শিশুদের জন্য একটি মাঠ করে দেওয়া হয়তো কাগজে-কলমে খুব বড় কোনো প্রকল্প নয়। কিন্তু একজন মায়ের কাছে এটি অনেক বড় কিছু। একজন বাবার কাছে এটি অনেক বড় কিছু। আর একটি শিশুর কাছে—এটি হয়তো তার পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের জায়গা।
আমরা প্রায়ই উন্নয়নের কথা বলি। বড় রাস্তা, বড় ভবন, বড় প্রকল্পের কথা বলি। কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবে দেখি—একটি শহরের প্রকৃত উন্নয়ন কতটা পরিমাপ করা যায় তার শিশুদের হাসি দিয়ে?
যে শহরে শিশুরা নিরাপদে খেলতে পারে,
যেখানে প্রবীণরা নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারেন,
যেখানে মহল্লাগুলো পরিচ্ছন্ন থাকে,
যেখানে নাগরিকরা স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারেন—
সেই শহরই তো সত্যিকারের সুন্দর শহর।
কুষ্টিয়া কোনো সাধারণ শহর নয়। এটি ইতিহাসের শহর, সংস্কৃতির শহর, মনন ও মানবিকতার শহর। বাউল সম্রাট লালন শাহের সাধনভূমি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ, কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনসহ অসংখ্য গুণী মানুষের পদচারণায় সমৃদ্ধ এই জনপদ।
এই শহরের মাটি তাই শুধু অতীতকে ধারণ করে না; এই মাটি ভবিষ্যতের কাছেও দায়বদ্ধ। আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন কুষ্টিয়া রেখে যাব—সেই প্রশ্নটি আজ আমাদের সামনে। আমরা কি এমন কুষ্টিয়া চাই, যেখানে শিশুরা ময়লার স্তূপের পাশে বড় হবে?
নাকি এমন কুষ্টিয়া চাই, যেখানে বিকেল নামলেই মাঠে মাঠে শিশুদের হাসির শব্দ উঠবে?
আমরা চাই—
প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশুদের জন্য মাঠ থাকুক। প্রবীণদের জন্য নিরাপদ হাঁটার পথ থাকুক। মহল্লাগুলো পরিচ্ছন্ন থাকুক। তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদনের সুযোগ থাকুক। আর কুষ্টিয়া হয়ে উঠুক আরও মানবিক, আরও পরিচ্ছন্ন, আরও বাসযোগ্য একটি শহর।
স্বতীশ চন্দ্র সাহালেনের ময়লার স্তূপ থেকে খেলার মাঠে রূপান্তরের এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাদের তাই একটি বড় শিক্ষা দেয়— পরিবর্তনের জন্য সবসময় বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগই একটি পুরো মহল্লার চেহারা বদলে দিতে পারে।
একটি শিশুর মুখের হাসির চেয়ে বড় কোনো অর্জন হয়তো নেই। একটি মহল্লার মানুষের স্বস্তির চেয়ে বড় কোনো উন্নয়নের সংজ্ঞাও হয়তো নেই।
কুষ্টিয়াবাসী এমন মানুষই চায়, যারা কুষ্টিয়াকে শুধু রাজনৈতিক মানচিত্রে নয়, হৃদয়ের মানচিত্রে ধারণ করবেন। যারা শহরের প্রতিটি অলি-গলি, প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, প্রতিটি শিশু, প্রতিটি প্রবীণ, প্রতিটি নাগরিকের কথা ভাববেন।
কারণ শেষ পর্যন্ত শহর শুধু রাস্তা-ঘাটের সমষ্টি নয়—
শহর হলো মানুষ। শহর হলো স্মৃতি। শহর হলো ভালোবাসা।
আর শহরের ভবিষ্যৎ হলো আমাদের শিশুরা।
ময়লার স্তূপ সরিয়ে একটি মাঠ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা—একটি জায়গা থেকে ময়লা সরিয়ে সেখানে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছে।
হয়তো আগামী কোনো এক বিকেলে সেই মাঠে খেলতে থাকা কোনো শিশু বড় হয়ে বলবে— “এই মাঠটা একদিন ছিল ময়লার ভাগাড়। কেউ একজন চেয়েছিল বলেই আজ এখানে আমরা খেলতে পারছি।”
সেই একটি বাক্যের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে থাকবে মো: আক্তারুজ্জামান (কাজল মাজমাদার)-এর এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
কুষ্টিয়ার আকাশে আবার শিশুর হাসি উঠুক। কুষ্টিয়ার প্রতিটি মহল্লায় পরিচ্ছন্নতার সুবাস ছড়াক।
কুষ্টিয়ার প্রতিটি শিশুর শৈশব হোক মাঠভরা, আকাশভরা, স্বপ্নভরা।
আর যারা সত্যিই এই শহরকে ভালোবাসেন, তাদের হাত ধরেই একদিন আমাদের প্রিয় কুষ্টিয়া আরও সুন্দর হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশাই থাকুক আমাদের হৃদয়ের গভীরে।
১২৯ বার পড়া হয়েছে