সর্বশেষ

মতামত

রাজধানীর রাস্তায় ভাঙাচোরা বাসের রাজত্ব: আইন কি শুধু কাগজে, কর্তৃপক্ষ কি অন্ধ নাকি এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলার চলন্ত প্রদর্শনী

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৫১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী—রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র, অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও কূটনীতিকদের প্রথম দেখার শহর। অথচ এই শহরের প্রধান সড়কগুলোতে প্রতিদিন এমন অসংখ্য বাস-মিনিবাস চলাচল করে, যেগুলো দেখে মনে হয় সেগুলো কোনো নিয়ন্ত্রিত নগর পরিবহনের অংশ নয়; বরং অনিয়ম, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার চলমান প্রদর্শনী।

রংচটা বডি, জং ধরা গায়ের পাত, ভাঙা জানালার কাচে পট্টি, দরজার বদলে ঝুলন্ত লোহার অংশ, বিকল ব্রেকলাইট, পেছনে ব্যাকলাইট নেই, কাঁপতে থাকা বাম্পার, ছেঁড়া সিট, ধোঁয়া ছড়ানো ইঞ্জিন—এসব বাস কীভাবে রাজধানীর সড়কে চলতে পারে? এরা কি গণপরিবহন, নাকি যাত্রীদের জন্য প্রতিদিনের চলন্ত ঝুঁকি?

সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৫-এ ক্ষতিগ্রস্ত, জরাজীর্ণ, রংচটা, বিবর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসের অনুপযোগী গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ। এমন গাড়ি চালালে ধারা ৭৫ অনুযায়ী জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও আছে। তাহলে প্রশ্ন একটাই—আইনটি কার জন্য? বইয়ের পাতার জন্য, নাকি রাস্তায় বাস্তব প্রয়োগের জন্য?

ঢাকার রাস্তায় একটি ভাঙাচোরা বাস চোখে পড়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। আর প্রতিটি এমন বাস রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে উপহাস করছে। কারণ, ওই বাসটি রাস্তায় নামার আগে কোনো না কোনোভাবে ফিটনেস সনদ পেয়েছে, রুট পারমিট পেয়েছে, ট্যাক্স টোকেন পেয়েছে, কিংবা অন্তত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার চোখের সামনে দিয়ে চলার সুযোগ পেয়েছে।

তাহলে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয় কী দেখে? গাড়ির প্রকৃত অবস্থা দেখে, নাকি কেবল কাগজ দেখে? একটি বাসের জানালার কাচ ভাঙা, পেছনের আলো অচল, বডি ক্ষতিগ্রস্ত, দরজা ঝুঁকিপূর্ণ—তারপরও সেটি ‘ফিট’ হয় কোন যুক্তিতে? ফিটনেস পরীক্ষার সময় কি কোনো কারিগরি পরিদর্শন হয়? গাড়ির ছবি, ভিডিও, ব্রেক পরীক্ষা, লাইট পরীক্ষা, টায়ার পরীক্ষা, ধোঁয়া পরীক্ষা—এসবের কোনো ডিজিটাল রেকর্ড আছে? থাকলে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?

শুধু বিআরটিএকে দায়ী করলেই চলবে না। ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিন সড়কে থাকে। পুলিশের সামনে বাস একে অন্যকে ধাক্কা দিয়ে ওভারটেক করে, মাঝরাস্তায় থামে, যাত্রী তুলতে গিয়ে পুরো সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করে, রেস করে, নির্ধারিত স্টপেজের তোয়াক্কা করে না। প্রশ্ন হলো—এসব দৃশ্য কি পুলিশের চোখে পড়ে না, নাকি দেখেও না দেখার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে?

যদি পুলিশের সামনে আইন ভাঙা যায়, যদি ভাঙা কাচের বাস, আলোহীন বাস, ধোঁয়া ছড়ানো বাস নির্বিঘ্নে চলে, তাহলে সাধারণ মানুষ আইন মানবে কেন? আইন কেবল দুর্বল মানুষের জন্য—এই বার্তাই কি রাষ্ট্র দিতে চায়?
এখানে চালককে একা দোষ দিলে সত্য আড়াল করা হবে। চালক মালিকের গাড়ি চালান, মালিক রুটে গাড়ি নামান, সমিতি রুট নিয়ন্ত্রণ করে, বিআরটিএ ফিটনেস ও পারমিট দেয়, পুলিশ সড়কে তদারকি করে, সরকার নীতি নির্ধারণ করে। একটি ভাঙাচোরা বাস তাই একজন চালকের ব্যর্থতা নয়; এটি মালিক, ফিটনেস পরীক্ষক, রুট নিয়ন্ত্রক, ট্রাফিক পুলিশ এবং সরকারের সম্মিলিত ব্যর্থতার চলমান প্রতীক।

রাজধানীর রাস্তায় চলমান এই বিশৃঙ্খলা শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নও। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বিমানবন্দর থেকে শহরে ঢুকে যদি দেখেন ভাঙাচোরা বাস, বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, প্রকাশ্য আইনভঙ্গ এবং অকার্যকর নিয়ন্ত্রণ—তাঁর মনে কী ধারণা তৈরি হবে? তিনি কি বিশ্বাস করবেন যে এই দেশে তাঁর বিনিয়োগ, সম্পদ ও চুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে?

এখন সময় এসেছে রুটিন অভিযান, লোকদেখানো জরিমানা ও দায় এড়ানোর বক্তব্য বন্ধ করার। প্রতিটি বাসের ফিটনেস পরীক্ষার ডিজিটাল প্রমাণ প্রকাশ করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ বাস তাৎক্ষণিকভাবে অফ-রোড করতে হবে। একই অপরাধে বারবার ধরা পড়লে ফিটনেস বাতিল, রুট পারমিট স্থগিত এবং মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী বা ফিটনেস পরীক্ষকের গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

প্রশ্নটি আর “কেন বাসগুলো এমন?” নয়। প্রশ্ন হলো—কার অনুমতিতে রাজধানীর সড়ককে অনিয়মের মুক্তাঞ্চল বানানো হয়েছে? সরকার কি সত্যিই এই দৃশ্য বদলাতে চায়, নাকি ভাঙাচোরা বাসের সঙ্গে ভাঙাচোরা জবাবদিহিকেও স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে?


লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

১২৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন