নদীর জায়গায় কারখানা-সড়ক-জেটি, তদন্তে মিলল দখলের প্রমাণ
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর প্রায় ২৪১ দশমিক ২৭ একর জমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে মেঘনা গ্রুপের বিরুদ্ধে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটির দীর্ঘ তদন্তে নদীর জমিতে প্রতিষ্ঠান, ভবন ও সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের দখলের তথ্য উঠে এসেছে। দখল করা জমির মধ্যে ৮৪ দশমিক ৭৭ একর এলাকায় মূল ভবন এবং ৫ দশমিক ৫ একর এলাকায় সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদীর জমি দখল করে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগের তদন্ত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। প্রায় দুই বছর ধরে সরেজমিনে তদন্ত শেষে ১২ সদস্যের কমিটি একটি প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেঘনা গ্রুপের সাতটি প্রতিষ্ঠান নদীর প্রায় ২৪১ দশমিক ২৭ একর জমি অবৈধভাবে দখল করেছে। এর মধ্যে ৮৪ দশমিক ৭৭ একর জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা ও মূল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ৫ দশমিক ৫ একর জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, দখল করা নদীর জমি দ্রুত উদ্ধার করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নদী রক্ষায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আলাউদ্দিন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে জেলা প্রশাসন নদীর জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেবে।
তদন্ত কমিটি ২০১৯ সালের অক্টোবরে কাজ শুরু করে। পরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে তদন্ত কার্যক্রম কিছু সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর আবার তদন্ত শুরু করা হয়। কমিটির সদস্যরা সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যের বাজার, হোসেনপুর ও পিরোজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চর রমজান, সোনাউল্লাহ, পূর্ব দামোদরদী, পশ্চিম দামোদরদী, দুধঘাটা, টেঙ্গরচর, ছয়হিস্যা, নরসুলদী, আষাঢ়িয়ারচর ও ঝাউচর এলাকায় নদীর জমি ভরাট করে মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়।
কমিটি সরেজমিন পরিদর্শনের সময় মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস, সুগার রিফাইনারি, ফ্রেশ সুগার, কেমিক্যাল কারখানা, ফ্রেশ সিমেন্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করে। এসব স্থাপনার কয়েকটি নদীর মূল ভূমি, তীরবর্তী এলাকা ও প্লাবনভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মেঘনা নদীর শাখা মারাখালী নদীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের তীর থেকে নদীর ভেতরে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত দখলের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় নদীর জমি ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর, স্থাপনা ও জেটি নির্মাণের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, নদীর জমি ভরাটের কারণে মেঘনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নদী ও আশপাশের জলাভূমির পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নিম্নাঞ্চলের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রেকর্ড ও জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন
তদন্ত প্রতিবেদনে ভূমি রেকর্ডের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। ভূমি অফিসের বক্তব্য অনুযায়ী, সিএস রেকর্ডে মেঘনা গ্রুপের দখলে থাকা অনেক জমিকে নদীর জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। আরএস রেকর্ডে কিছু জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার পর তা অন্যের কাছে বিক্রির ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী সরকারের নির্ধারিত অংশের অর্থ পরিশোধের বিধান রয়েছে। কিছু জমির ক্ষেত্রে এ বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি।
জেটি ও পরিবেশ ছাড়পত্র
মেঘনা গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জেটি রয়েছে এবং এসবের জন্য বিআইডব্লিউটিএর অনুমতির বিষয়ও তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে। তবে নদীর জমিতে স্থাপিত দুটি জেটির লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি বলে বিআইডব্লিউটিএর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া মেঘনা গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে। নদীর জমি বা প্লাবনভূমিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সেখান থেকে তরল বর্জ্য নদীতে পড়লে তা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
১২ দফা সুপারিশ
নদীর জমি উদ্ধার ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তদন্ত কমিটি ১২টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে দ্রুত নদীর জমি চিহ্নিত করে দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মেঘনা নদী দখল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে নদীর দখলমুক্তকরণ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন তাঁদের হাতে এখনো পৌঁছায়নি। তবে এ বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে সভা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইতিমধ্যে মদিনা গ্রুপের দখলে থাকা নদী ও নদীতীরবর্তী সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দখলের বিষয়ও তালিকাভুক্ত করে নদীর জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
১২৪ বার পড়া হয়েছে