শুল্ক থেকে হরমুজ, আশ্রয়ভিসা থেকে কানাডা: এক সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের রাজনীতি
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ৭:১১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি, ভিসা বাতিলের উদ্যোগ ও কানাডাকে ঘিরে বিতর্কিত বক্তব্য—গত এক সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চাপ ও অনিশ্চয়তার নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। ইরান থেকে হরমুজ প্রণালি, আশ্রয়ভিসা থেকে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই কঠোর অবস্থানের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘চাপের রাজনীতি’র চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত, হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরানকে ঘিরে অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক ভাষা, হরমুজ প্রণালিতে কঠোর হুমকি, কানাডার সঙ্গে তীব্র শুল্কযুদ্ধ, আশ্রয়প্রার্থীদের পুরোনো ভিজিটর-ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা এবং লেক অন্টারিওর নাম “লেক আমেরিকা” করার প্রস্তাব—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের নীতি এখন কূটনৈতিক সংযমের চেয়ে চাপ, ভয় এবং অনিশ্চয়তার রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
প্রথমে ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ানো হয়। ২০ আগস্ট ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর ইতিহাসের “সবচেয়ে কঠোর” অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ওয়াশিংটন জানায়, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা যেকোনো দেশ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও দ্বিতীয়িক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
এরপর ২৪ আগস্ট মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে নতুন ব্যবস্থা নেয়। ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন—এই পাঁচ খাতকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা হয়। ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন না করলে অন্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সব প্রতিশ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
এর পরই হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের ভাষা আরও কঠোর হয়। ২৫ আগস্ট তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী হরমুজের আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে সব মাইন অপসারণ বা নিষ্ক্রিয় করেছে। তিনি ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন, নতুন করে মাইন বসানো হলে সংশ্লিষ্ট নৌযান ধ্বংস করা হবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে সেখানে সামরিক হুমকি বা একতরফা শক্তি প্রদর্শনের ভাষা শুধু ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; এটি তেলবাজার, জাহাজ চলাচল, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত। ইরান ও ওমান তখন প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল।
এরপর অভিবাসন প্রশ্নে নতুন ঘোষণা আসে। ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, B-1 ব্যবসায়িক ও B-2 পর্যটন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা করছেন—এমন সর্বোচ্চ দুই লাখ মানুষের পুরোনো ভিসা বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে।
এখানে বিতর্কের জায়গা হলো, বহু আশ্রয়প্রার্থীর ভিজিটর-স্ট্যাটাস বহু আগেই শেষ হয়েছে, বা দীর্ঘ অবস্থানের কারণে পুরোনো ভিসা ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে গেছে। তাই এই পদক্ষেপ চলমান আশ্রয় মামলা বাতিল, বৈধ কর্ম-অনুমতি বাতিল কিংবা তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের সমান নয়। সমালোচকদের মতে, এর বড় অংশ ভবিষ্যৎ ভিসা-রেকর্ডে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি ও “কঠোর অভিবাসননীতি”র রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্যোগ।
এরপর কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ দ্রুত সংকটে রূপ নেয়। ১৯ আগস্টের সাময়িক সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর, ২২ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে।
এর জবাবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৭০০-এর বেশি পণ্যে পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করে। ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষিযন্ত্র, কাগজ, ইলেকট্রনিকস, পোশাক ও নানা ভোক্তাপণ্য এই তালিকায় রয়েছে। কানাডার শুল্ক ৮ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা।
তারপর ট্রাম্প বলেন, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কানাডা থেকে আসা গাড়ি, ট্রাক, অটো পার্টস ও ইস্পাতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এটি উত্তর আমেরিকার বহু দশকের সমন্বিত অটো-সরবরাহব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে, কারণ মার্কিন গাড়ি নির্মাতারাও কানাডীয় যন্ত্রাংশ ও উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল।
বাণিজ্যবিরোধের মধ্যেই ট্রাম্প লেক অন্টারিওর নাম বদলে “লেক আমেরিকা” করার কথা বলেন এবং পরিবর্তিত নামসহ একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। একই সময়ে তিনি কানাডাকে “অঙ্গরাজ্য না হয়েও অঙ্গরাজ্যের সুবিধা নেওয়া” দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন—যা কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বলার তাঁর পুরোনো বক্তব্যের নতুন পুনরাবৃত্তি।
বাস্তবে আন্তর্জাতিক এই জলভাগের নাম যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বদলাতে পারে না। কিন্তু এমন বক্তব্য কানাডার সার্বভৌমত্ববোধে আঘাত করে এবং দুই প্রতিবেশীর দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।
গত এক সপ্তাহের ঘটনাগুলোতে একটি স্পষ্ট ধারা দেখা যায়: ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি, ভিসা-বাতিলের ঘোষণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানিমূলক ভাষাকে একযোগে রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার করছে।
এই পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে সংবাদচক্র নিয়ন্ত্রণ, সমর্থকদের কাছে কঠোর নেতৃত্বের বার্তা এবং দরকষাকষিতে ভয় তৈরি করতে পারে। কিন্তু এর মূল্যও বড়—বাজারে অনিশ্চয়তা, মিত্রদের আস্থাহানি, প্রতিশোধমূলক বাণিজ্যব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়।
পরাশক্তির ক্ষমতা শুধু শুল্ক, যুদ্ধজাহাজ বা নিষেধাজ্ঞায় নয়; তার শক্তি নির্ভর করে প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা, মিত্রতার স্থায়িত্ব ও নীতির পূর্বানুমেয়তার ওপর। এক সপ্তাহের এই ঘটনাপ্রবাহে সেই বিশ্বাসযোগ্যতাই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
১১১ বার পড়া হয়েছে