হ্যালো, তসলিমা নাসরিন, ছি:
শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ ৪:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
তসলিমা নাসরিন লিখলেন ‘লজ্জা’ নামক একটি বই। উপন্যাসটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। ভারতের অযোধ্যায় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের পটভূমিতে বইটি রচিত হয়েছিল। প্রকাশের পরপরই এটি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং ওই বছরই বাংলাদেশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এর কারণ কী?
সরকারের আশঙ্কা ছিল, বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিক্রিয়ায় উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও বিবরণ দেশের ভেতরে নতুন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে এবং বড় ধরনের দাঙ্গা বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়।
মৌলবাদী শক্তি তসলিমা নাসরিনকে ইসলামের শত্রু ও উগ্র হিন্দু মৌলবাদের সমর্থক বিবেচনায় তাকে গ্রেপ্তারের দাবি তোলে এবং কিছু উগ্র মৌলবাদী তার শিরোচ্ছেদের আহ্বান জানায়। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী সংসদে ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তনের জন্য বিল উত্থাপন করে।
ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ কোনো রাজনৈতিক দল অবস্থান নেয়নি। একমাত্র বাম সংগঠনগুলো তাদের ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে এই আইনের বিরোধিতা শুধু করেইনি, তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো ৯ ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ ব্লাসফেমি (ধর্ম অবমাননা) আইন প্রবর্তনের প্রতিবাদে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল পালন করে।
সেই তসলিমা নাসরিন একসময় মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের তাঁর অর্ধেক সময় কাটিয়েছেন ভারতবর্ষে। একটা সময় তিনি প্রিয় কলকাতায় অবস্থান করতে পারেননি, বিতাড়িত হয়েছেন। সেই কলকাতায় তৃণমূলের ক্ষমতার পালাবদলের পর তসলিমা আবার ফিরেছেন।
বিজেপি শাসিত কলকাতায় তাঁর ফেরা এবং বাংলা আকাদেমির সভায় তিনি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাথে ফ্রেম ভাগাভাগি করেছেন, স্টেজে বসেছেন, হাসিমুখে কথা বলেছেন। মুসলিম মৌলবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে সেই তসলিমা এবার সরাসরি হিন্দুমৌলবাদী বিজেপির কোলে চড়ে বসলেন!
তসলিমা কি ভুলে গিয়েছেন, গোমাংস বহনের জন্য ২০২৩ সালের মার্চ মাসে বিহারে ট্রেনে সারন বা সিওয়ান জেলায় নাসিম কুরেশি নামের এক ব্যক্তির ওপর হামলা করে পিটিয়ে মারা হয়েছে ?
মহারাষ্ট্রে (২০২৪ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে) ধুলে-মুম্বই এক্সপ্রেস ট্রেনে ৭২ বছর বয়সি আশরাফ আলী সাইয়েদ হুসেন নামের এক বৃদ্ধের ওপর হামলা করে মেরেছে বিজেপির গুন্ডারা।
ভারতে গত এক দশকে 'গোরক্ষা'র নামে বা গরুর মাংস বহনের সন্দেহে একাধিক মুসলিম ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। যেমন—জুনাঈদ খান নামের ১৫ বছরের এক কিশোরকে ২০১৭ সালে চলন্ত ট্রেনে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।
এ ছাড়া পেহলু খান, রাখবর খানসহ বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর উগ্রপন্থীরা 'মব' আক্রমণ চালায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানের পর থেকে এ ধরনের উগ্র গোরক্ষক দলগুলোর তৎপরতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বিষয়ে তসলিমার কি কোনো বক্তব্য বা লেখা আপনাদের চোখে পড়েছে?
পড়েনি।
জানার ইচ্ছে, এসব বিষয়ে তিনি কেন নিশ্চুপ ছিলেন?
তসলিমা নাসরিন কি ভুলে গিয়েছেন,
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লির উত্তর- পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল?
নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA) নিয়ে আন্দোলন ও প্রতিবাদের জেরে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতায় প্রায় ৫৩ জন নিহত হন, যার একটি বড় অংশই ছিলেন মুসলিম। দাঙ্গার সময় বহু মসজিদ ভাঙচুর, মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া এবং পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। সে সময় ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বেশ কিছু নেতার উসকানিমূলক বক্তব্য এই দাঙ্গায় প্রভাব ফেলেছিল বলে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে। তসলিমা কি এসবের জন্য দায়ী বিজেপিকে অভিযুক্ত করেছেন?
নাকি তাঁর কাছে মৌলবাদ মানে কেবল মুসলিম মৌলবাদ, হিন্দু মৌলবাদ বলে কিছু নেই?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের চূড়ান্ত রায় ছাড়া অভিযুক্ত বা প্রতিবাদী মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক প্রচলন হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে মুসলিমদের ওপর একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
হ্যালো, মিসেস তসলিমা নাসরিন, এই নিয়ে আপনার কোনো মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়েনি।
আপনার ফেসবুক স্ক্রল করে দেখেছি কোথাও কিছু নেই। কেন নেই, কেন এর বিরুদ্ধাচার করে লেখেননি?
নাকি হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক হয় না?
নাকি এদের সাম্প্রদায়িকতা আপনার কাছে কোনো বিষয় মনে হয় না?
বিগত চার দশকের বেশি সময় যাবৎ বিভিন্ন ধর্মীয় সভা বা রাজনৈতিক সমাবেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিকভাবে একঘরে করা এবং উসকানিমূলক শ্লোগান দেওয়ার ঘটনা ভারতে প্রায়ই ঘটছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজেপির শীর্ষস্থানীয় বা স্থানীয় নেতাদের অনেকের নীরবতা বা প্রত্যক্ষ মদদে এ ধরনের ঘৃণাভিত্তিক অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আচরণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সেই বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশংসা শুনে আপনি বিগলিত। একবার কি নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছেন, যাদের হাতে মানুষের রক্ত, চোখে ঘৃণা, মুখে বিষ, অন্তরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প—তাদের সাথে স্টেজ কেন শেয়ার করছেন?
কারণ, আপনি একচক্ষুদর্শী। এটা এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে,
আপনি কোনো দেশ বা দলের পক্ষ হয়ে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন। ছি:
আমার ভাবতে খারাপ লাগছে, কেন জীবনের মায়া ভুলে আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চারকণ্ঠ ছিলাম?
আপনি মুসলিম মৌলবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে হিন্দু মৌলবাদের পক্ষাবলম্বন করলেন। মৌলবাদের বিরোধিতা করলে সকল মৌলবাদের বিরোধিতা করেন।
ছিঃ তসলিমা, ছিঃ!
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
১৫০ বার পড়া হয়েছে