রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:১৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখা। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তির আগ্রহকে সুযোগে রূপান্তর করতে হলে বাংলাদেশের প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি। ড. মাহরুফ চৌধুরীর এই বিশ্লেষণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো, পরাশক্তিগুলো কখনোই ছোট বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর প্রতি নিছক সৌজন্যবশত আগ্রহ দেখায় না। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে নিজস্ব অর্থনৈতিক, কৌশলগত, সামরিক কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ। কোনো বৃহৎ শক্তি যখন কোনো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে চায়, তখন সেই সম্পর্কের পেছনে অবশ্যই তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য কাজ করে। একইভাবে ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের জন্যও অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত সেই রাষ্ট্রের প্রতি আবেগ, ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়; বরং নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত ও অগ্রসর হচ্ছে, তার ভিত্তিতে। ফলে কোনো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো অন্যদের স্বার্থের সংঘর্ষের মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে কীভাবে সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ এবং অগ্রসর করা যায়। আজকের বাংলাদেশও ঠিক এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
বিগত কয়েক দশকে বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একমেরুকেন্দ্রিকতা থেকে ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিকতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য যে রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বর্তমানে সেই কাঠামো ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি, রাশিয়ার কৌশলগত পুনরুত্থান এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার বণ্টন ক্রমেই বহুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিযোগিতা। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের জন্য কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা ক্রমেই জটিল এবং কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চল পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের গুরুত্ব এখানে শুধু তার জনসংখ্যা, বাজার কিংবা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে নয়; এর ভৌগোলিক অবস্থানও তাকে এই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। ভারত মহাসাগরীয় সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য স্থল ও নৌসংযোগ, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং চীনের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনার বিষয় নয়; বরং পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্য দিয়ে নিজের জন্য সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করার একটি জটিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ। সুযোগ এই কারণে যে, বহু শক্তির আগ্রহ একটি রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। যখন একাধিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সামনে বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজারসুবিধা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু এই সুযোগ তখনই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে এবং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ককে সেই অগ্রাধিকারের আলোকে পরিচালনা করে।
আবার চ্যালেঞ্জ এই কারণে যে, ভুল পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে অন্যের প্রতিযোগিতার বলি বা প্রক্সিতে পরিণত করতে পারে। বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বে ছোট রাষ্ট্র যদি নিজের নীতিগত স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার ভূখণ্ড, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অন্যের কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। অতএব বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন কোনো পরাশক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং কীভাবে পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতাকে নিজের জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগিয়ে ফায়দা অর্জন করা যায় এবং একই সঙ্গে তাদের সংঘাত থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব (রিয়েলিজম) রাষ্ট্রকে মূলত স্বার্থসর্বস্ব ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে (এ বিষয়ে আগের লেখায় কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে)। বাস্তববাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় বিশ্ব সরকার নেই; ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়। এই ‘আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য’ (ইন্টারন্যাশনাল অ্যানার্কি)-এর অর্থ বিশৃঙ্খলা নয়; বরং রাষ্ট্রগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করার মতো কোনো বৈশ্বিক সর্বময় কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতি। ফলে বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রও তার নিজস্ব স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে—এমন নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেই। এ কারণেই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্থায়ী আবেগের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর সামনে সাধারণত তিনটি পথ খোলা থাকে—‘কোনো পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোটে আবদ্ধ হওয়া’ (ব্যান্ডওয়াগনিং); ‘প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করা’ (ব্যালেন্সিং); অথবা ‘পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের ঝুঁকি কমানো’ (হেজিং)। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্র সবসময় একই কৌশল অনুসরণ করে না। আন্তর্জাতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং নেতৃত্বের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশলও পরিবর্তিত হতে পারে। তবে ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ ও লাভজনক পথ হয়ে ওঠে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অন্যের প্রতিযোগিতার অংশ হওয়া নয়, বরং প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশটি দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় পথ, অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার কৌশল অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র হিসেবে তৎকালীন সরকার ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির মাধ্যমে যে ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তার মূল দর্শন ছিল রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে মৌলিক দর্শন বিকশিত হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সার্বভৌম সমতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধার কথা প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কৌশল নয়; এর একটি সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তিও রয়েছে।
পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সেই নীতির আধুনিক রূপ হতে পারে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি), অর্থাৎ কোনো শক্তির শিবিরে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে স্বাধীনভাবে জাতীয় স্বার্থ অনুসরণ করার সক্ষমতা। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে সবার থেকে দূরে থাকা নয়, আবার সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখাও নয়। বরং এর অর্থ হলো প্রতিটি সম্পর্ককে তার নিজস্ব মূল্য ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করা এবং কোনো অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা যেন অন্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার বাধ্যবাধকতায় পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেমন থাকবে, তেমনি ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং রাশিয়া ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতাও অব্যাহত থাকবে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের এই বহুমাত্রিকতা কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও নীতিগত স্বাধীনতার ভিত্তি হতে পারে।
তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থ নিজেকেই সংজ্ঞায়িত করতে হবে। অন্য শক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য কী চায়, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ নিজে কী চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক শান্তি—এসবকে জাতীয় অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে তার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্র নিজের জাতীয় অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে না, তার পররাষ্ট্রনীতি সহজেই অন্যের অগ্রাধিকারের প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। আর যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার নির্বাচন করতে পারে, সে তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জন্য কার্যকর কৌশলগত পরিসর তৈরি করতে সক্ষম হয়।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের চারপাশে অন্তত চারটি বড় শক্তির স্বার্থ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। চীন বাংলাদেশকে তার আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামো কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। ভারতের কাছে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি উন্মুক্ত, অবাধ ও স্থিতিশীল সামুদ্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে জাপানও মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরদার করছে। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য শক্তিরও বাংলাদেশের বাজার, বাণিজ্য, জলবায়ু, শ্রম, মানবিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিসর এখন কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতির একটি জটিল বহুপক্ষীয় সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো, আমরা কি কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকব, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করব? প্রশ্নটি নিছক কূটনৈতিক পছন্দের নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা সরাসরি যুক্ত। কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত কিংবা কূটনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হলে সেই রাষ্ট্রের নীতিগত প্রভাবও ক্রমে বৃদ্ধি পেতে পারে। তখন সহযোগিতা ও নির্ভরতার মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নামে যদি বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলেও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হতে পারে। অতএব ভারসাম্য মানে মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান রেখে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ছোট ও মাঝারি শক্তির অনেক সফল রাষ্ট্র কখনোই নিজেদের ভাগ্য একটি মাত্র শক্তির হাতে তুলে দেয়নি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়া, পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে কূটনীতির লক্ষ্য কোনো পক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন নয়; বরং জাতীয় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সর্বাধিক সুবিধা অর্জন করা। এসব রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—একটি রাষ্ট্র তার আকারে ছোট হলেও যদি তার কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, নীতির ধারাবাহিকতা থাকে এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকে, তাহলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যেও তার দরকষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এখানে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। ভৌগোলিকভাবে ছোট এই রাষ্ট্রটি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একই সময়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অন্য শক্তির সঙ্গে বৈরিতার সমার্থক হতে দেয়নি। ভিয়েতনামও তার পররাষ্ট্রনীতিতে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বাধীনতা ও কৌশলগত পরিসর বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করলেও তারা নিজেদের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। এই অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের জন্য সরাসরি অনুকরণীয় মডেল নয়। কারণ প্রতিটি দেশের ইতিহাস, রাষ্ট্রকাঠামো, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আলাদা। তবে এ উদাহরণগুলো একটি মৌলিক নীতি শেখায়: শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং সেই রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশের জন্যও তাই কূটনৈতিক ভারসাম্যের অর্থ হওয়া উচিত ‘সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, কারও কাছে নতজানু হওয়া নয়’। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেমন জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি ভারতের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব সম্পর্ককে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কৌশলের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করার কারণে অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন কূটনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অনুকূল নয়। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট ‘কৌশলগত কাঠামো’ (স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক)।
কোন ক্ষেত্রে কোন দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন, কোন সহযোগিতার সঙ্গে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন প্রকল্প জাতীয় সক্ষমতা বাড়াবে এবং কোন নির্ভরতা ভবিষ্যতে কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে—এসব প্রশ্নকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তখন কূটনীতি ব্যক্তিনির্ভর বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রতিক্রিয়া না হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত হবে। আর এভাবেই বাংলাদেশ পরাশক্তির প্রতিযোগিতার দর্শক বা প্রক্সি না হয়ে নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সেই প্রতিযোগিতা থেকে সর্বোচ্চ জাতীয় সুবিধা আদায় করতে পারবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। যদি চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পাওয়া যায়, তবে তা গ্রহণ করা উচিত জাতীয় স্বার্থের আলোকে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, তবে সেটিও কাজে লাগানো উচিত। যদি ভারতের সঙ্গে সংযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, তবে সেটিও জাতীয় স্বার্থের অংশ।
একইভাবে জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা অন্যান্য অংশীদারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাকেও কোনো ভূ-রাজনৈতিক আনুগত্যের মানদণ্ডে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের বিচারে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শিক মোহ নয়, বাস্তববাদী বিচক্ষণতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্রের পতাকা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিংবা পররাষ্ট্রনীতির ঘোষিত আদর্শের প্রতি আবেগ দিয়ে নয়; বরং সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কী ফল বয়ে আনছে, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কেবল একটি কূটনৈতিক স্লোগান নয়; এটি অর্জনের জন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও প্রয়োজন।
কোনো রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই স্বাধীনতার কথা বলুক, তার অর্থনীতি যদি অতিরিক্তভাবে একটি বা কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়, তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যদি সীমিত থাকে, তার জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা যদি দুর্বল হয় এবং তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অকার্যকর হয়, তাহলে বাস্তবে তার কূটনৈতিক স্বাধীনতার পরিসরও সংকুচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির স্বায়ত্তশাসন শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে যত বেশি সক্ষম, তার অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
দুর্বল অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্যের অভাব কোনো রাষ্ট্রকে সহজেই বহিঃশক্তির প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। বিশেষ করে যখন একটি দেশের উন্নয়ন অর্থায়ন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, খাদ্য কিংবা রপ্তানি বাজারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন সেই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পনীতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন।
গবেষকেরা মনে করেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল অপরিহার্য। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষমতা শুধু কূটনৈতিক ভাষা বা রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে আসে না; এর পেছনে থাকে একটি রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতা। যে রাষ্ট্র বিকল্প অংশীদার তৈরি করতে পারে, নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে এবং সংকটের সময়ে নিজের প্রয়োজনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেই পূরণ করতে পারে, সে রাষ্ট্রই বহিঃচাপ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন।
বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো একটি দেশ বা শক্তির সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপরিহার্য হয়ে না ওঠে। একইভাবে কোনো একটি বাজার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র বাজার হওয়া উচিত নয়; কোনো একটি প্রযুক্তি প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু তার বিকল্প সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগও থাকতে হবে। এই বহুমুখীকরণই অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা (ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স) বাড়াবে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারিত করবে। তাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত ভিত্তি বিদেশের সঙ্গে দূরত্ব নয়; বরং দেশের ভেতরে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যার ফলে বাংলাদেশ সহযোগিতা বেছে নিতে পারে প্রয়োজনের কারণে, নির্ভরতার কারণে নয়। এই কারণেই জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়ননীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
একটি শক্তিশালী অর্থনীতি শক্তিশালী কূটনীতির ভিত্তি তৈরি করে; একটি দক্ষ মানবসম্পদভিত্তিক সমাজ প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমায়; একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ন্যায্য চুক্তি করার সক্ষমতা বাড়ায়; আর একটি সুসংহত জাতীয় ঐকমত্য পররাষ্ট্রনীতিকে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে দোদুল্যমান হওয়া থেকে রক্ষা করে। বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা তাই শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তিগুলোর সদিচ্ছার ওপর নয়, নিজেদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী করতে পারি, তার ওপরই নির্ভর করবে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য গড়ে তোলা। উন্নত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রগুলোতে সরকার পরিবর্তিত হলেও মৌলিক জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
সরকার বদলায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের মৌলিক ভিত্তি রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। এর ফলে একটি সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ শুরু করে, পরবর্তী সরকারও প্রয়োজন অনুযায়ী তার মূল্যায়ন ও সংশোধন করে, কিন্তু কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে না। এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে এবং বিদেশি অংশীদারদের কাছেও নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দেয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায়, একটি সরকারের পররাষ্ট্রনৈতিক অগ্রাধিকার পরবর্তী সরকার এসে প্রশ্নবিদ্ধ করে অথবা পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিরোধিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এর ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারের নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতাও দুর্বল হতে পারে।
কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যদি মনে করে যে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা কিংবা কৌশলগত অগ্রাধিকার মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখন, যখন জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন দলীয় স্বার্থের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। পররাষ্ট্রনীতি কোনো সরকারের দলীয় সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ এবং তার সুফল বা ক্ষতির প্রভাব বহু প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। অথচ ভূ-রাজনীতি কোনো পাঁচ বছরের নির্বাচনী চক্রের বিষয় নয়; এটি কয়েক দশকের পরিকল্পনার বিষয়। একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক রেলসংযোগ, জ্বালানি অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি কিংবা একটি নতুন কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রকৃত ফলাফল অনেক সময় একটি সরকারের মেয়াদ অতিক্রম করে প্রকাশিত হয়। একইভাবে আজকের কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাবও হয়তো এক দশক বা তারও পরে দৃশ্যমান হতে পারে।
তাই পররাষ্ট্রনীতিতে ‘স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ’ এবং ‘দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা জরুরি। রাষ্ট্রের মৌলিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা এই কারণেই অপরিহার্য। এখানে জাতীয় ঐকমত্যের অর্থ এই নয় যে সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ কিংবা বিশেষজ্ঞদের প্রতিটি বিষয়ে একই মত থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। বরং প্রয়োজন হলো কোন বিষয়গুলোকে দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে রেখে ‘জাতীয় স্বার্থের মূল ক্ষেত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা। সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংযোগ, বৈদেশিক বিনিয়োগ, সমুদ্রসম্পদ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির একটি কাঠামো থাকা প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তনের পর সেই কাঠামো পর্যালোচনা, সংশোধন কিংবা উন্নত করা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিবার শূন্য থেকে শুরু করা হলে কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারে না।
আজকের বিশ্বে বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলারও প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুসংহত পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাকে সুযোগে রূপান্তর করা। বৃহৎ শক্তিগুলো যখন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী, তখন বাংলাদেশকে তাদের প্রতিযোগিতার নিষ্ক্রিয় ক্ষেত্র না হয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হতে হবে। অর্থাৎ অন্যরা কী চায়, শুধু তা বিবেচনা না করে বাংলাদেশ কী অর্জন করতে চায়, তার একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় রূপরেখা থাকতে হবে। এই রূপরেখা যত স্পষ্ট হবে, দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থানও তত শক্তিশালী হবে।
চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা অন্য যে কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত: এতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হবে কিংবা সম্পর্ক ইতিবাচক পথে অগ্রসর হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য, জাতীয় প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য সুফল-ঝুঁকির নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব কিংবা স্থায়ী বৈরিতার ধারণায় আবদ্ধ না করে প্রতিটি সম্পর্ককে তার বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। যে সহযোগিতা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেটিকে এগিয়ে নিতে হবে; আর যে কোনো প্রস্তাব ভবিষ্যতে অযাচিত নির্ভরতা বা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেটিকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে আমরা পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে কীভাবে দেখি, তার ওপর। যদি নিজেদের কেবল তাদের প্রতিযোগিতার একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখি, তাহলে অন্যের কৌশলই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু যদি নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, সক্রিয় অর্থনৈতিক অংশীদার এবং নিজস্ব স্বার্থসম্পন্ন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে একই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পূর্বশর্ত হলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়া এবং সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। কারণ শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি কেবল শক্তিশালী কূটনীতিক দিয়ে তৈরি হয় না; তার ভিত্তি তৈরি হয় একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র, সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার এবং সেই অগ্রাধিকারের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যান্স মরগেনথাউ (১৯০৪–১৯৮০) একসময় লিখেছিলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শের গুরুত্ব থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থের আলোকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাঁর ‘রাজনৈতিক বাস্তববাদ’ (পলিটিক্যাল রিয়েলিজম)-এর মূল শিক্ষা ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে বুঝতে হলে রাষ্ট্রের আচরণের পেছনে কাজ করা ক্ষমতা ও স্বার্থের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। আমাদের কূটনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত না কে আমাদের বন্ধু, বরং কে কোন ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে এবং সেই সহযোগিতার বিনিময়ে বাংলাদেশের কী স্বার্থ রক্ষা ও অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো অংশীদারের সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে তা যেন বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব কিংবা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে সংকুচিত না করে।
একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে আঞ্চলিক শক্তি ও অর্থনৈতিক সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে তাকে আবেগনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বার্থভিত্তিক, বাস্তববাদী এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তার ওপর দাঁড়াতে হবে। এখানে বাস্তববাদ মানে নীতিহীনতা নয়; বরং নীতিকে বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা। সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আন্তর্জাতিক আইন—এসব নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে ‘শূন্য-সমের দৃষ্টিতে’ (জিরো-সাম পার্সপেক্টিভ) না দেখে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য শক্তি নিজেদের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থে আমাদের এ অঞ্চলে সক্রিয় থাকবে। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি সৃষ্টি করতে পারে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, মানবসম্পদ ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের অভূতপূর্ব সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার এবং ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি। অন্যরা বাংলাদেশে জন্য কী পরিকল্পনা করছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যতের জন্য কী পরিকল্পনা করছে।
রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত কোনো শক্তির আনুগত্য নয়, কোনো শক্তির অযথা বিরোধিতাও নয়; বরং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা এবং জাতীয় কল্যাণের সর্বোচ্চ অনুসরণ। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলমান থাকবে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশেরই। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তি হবে এমন একটি অবস্থান, যেখানে আমাদের দেশ অন্যের প্রতিযোগিতার ময়দান নয়, বরং নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার বেছে নেওয়া একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও কৌশলগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। সেই সক্ষমতাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করবে এবং একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় দেশের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ও কার্যকর অবস্থান নিশ্চিত করবে।
(পর্ব-৩: চলবে)
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
১১৯ বার পড়া হয়েছে