রেকর্ড বৃষ্টিতে তলিয়েছে চট্টগ্রাম: বন্ধ ট্রেন-পরীক্ষা, বন্যার শঙ্কা আরো বাড়ছে
বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬ ৬:৪০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং সাগরের অস্বাভাবিক জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই মাসের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ডের মধ্যে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হয়েছে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথের যোগাযোগ। স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী আরও অন্তত দুই দিন ভারী বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
রোববার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সোমবার ও মঙ্গলবার আরও তীব্র আকার ধারণ করলে চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা জুলাই মাসের অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের মধ্যে একটি। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টাতেও ২৮৪ মিলিমিটার অতিভারী বর্ষণ হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ভারতের দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে অবস্থান করা একটি স্থল নিম্নচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলে প্রবেশ করে। উপকূলীয় পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেই জলীয় বাষ্প থেকে দফায় দফায় অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
টানা বর্ষণের পাশাপাশি সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল থাকায় জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নগরের জমে থাকা পানি দ্রুত নামতে পারেনি। আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলা, বাকলিয়া, হালিশহরসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
সড়কে পানি জমে থাকায় গণপরিবহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক অফিসগামী মানুষকে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ সড়কে আটকে থাকতে হয়েছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে রেল যোগাযোগেও। জানআলীহাট ও ষোলশহর এলাকায় রেললাইন পানির নিচে চলে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনও দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর যাত্রা বাতিল করা হয়।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও সংযোগ সড়কে পানি জমে যাওয়ায় কয়েকটি ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামা ও খালাস কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। উত্তাল সাগরের কারণে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে পণ্য খালাস এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথে লাইটার জাহাজ চলাচলেও প্রভাব পড়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বুধবারের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সমন্বয়ে ১০১ সদস্যের একটি র্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি সহায়তার জন্য একটি হটলাইন চালু করা হয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে সাঙ্গু, হালদা ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আগামী আরও অন্তত দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল দখল ও ভরাট, পাহাড় কাটা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নগর পরিকল্পনা ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।
১৭৪ বার পড়া হয়েছে