সর্বশেষ

মতামত

গণমাধ্যমকর্মীও গণসেবক

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬ ৯:০১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের বাংলাদেশ গড়ার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—সবখানেই গণমাধ্যমকর্মীদের অবদান গৌরবময়।

ব্রিটিশ আমলে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট', কাঙাল হরিনাথের 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' গ্রামীণ বাংলার শোষিত মানুষের পক্ষে প্রথম লড়াই শুরু করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রগতিশীল পত্রিকাগুলো স্বাধিকারের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখে।

৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও বিভিন্ন পত্রিকা মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রধান ভূমিকা রাখে। সত্য প্রকাশের অপরাধে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীনসহ বহু সাংবাদিককে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়।

এছাড়াও, ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে শহীদ হন মোস্তফা জব্বার। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের হামলায় তিনি নিহত হন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে; হাসান মেহেদী ‘ঢাকা টাইমস’ (Dhaka Times)-এর সিনিয়র রিপোর্টার। ১৮ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন।

‘দৈনিক ভোরের আওয়াজ’ পত্রিকার গাজীপুর প্রতিনিধি শাকিল হোসাইন। ১৮ জুলাই উত্তরায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

তাহির জামান প্রিয় ফ্রিল্যান্স ভিডিও জার্নালিস্ট এবং ‘দ্য রিপোর্ট ডট লাইভ’ (TheReport.live)-এর সাবেক কর্মী। ১৯ জুলাই ঢাকার সায়েন্স ল্যাব/সেন্ট্রাল রোড এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

আবু তাহের মো. তুরাব ‘দৈনিক নয়া দিগন্ত’ ও ‘দৈনিক জালালাবাদ’ পত্রিকার সিলেট প্রতিনিধি। ১৯ জুলাই সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।

সোহেল আখঞ্জী ‘দৈনিক লোকালয় বার্তা’ পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক। ৫ আগস্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

প্রদীপ কুমার ভৌমিক ‘দৈনিক খবরপত্র’ পত্রিকার সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি। ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় মারধরের শিকার হয়ে নিহত হন।

আন্দোলন চলাকালীন শুধু সাংবাদিক নিহতই হননি; পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সারা দেশে ৫০০ জনেরও বেশি সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে অনেক গণমাধ্যমকর্মী ছররা গুলিতে চোখ হারিয়েছেন এবং অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সাংবাদিকতার সরঞ্জাম যেমন ক্যামেরা, লাইভ ডিভাইস এবং গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে।

এই দুই গণঅভ্যুত্থানের সময়ই তথ্য ও সত্য তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকরা রাজপথে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

যেকোনো আন্দোলন, লড়াই কিংবা সংগ্রামে গণমাধ্যমকর্মীরা ফ্রন্টলাইনে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। শাসকের রক্তচক্ষু ও বুলেটের ভয়কে উপেক্ষা করে তাঁদের এই সাহসী সাংবাদিকতাই প্রতিটি বিপ্লবের সফলতার মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করে; এবং পাশাপাশি তাঁরা জনকল্যাণের দাবির পক্ষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এটা শুধু দায়িত্ব নয়, সেবাও; আর এভাবেই তাঁরা অকাতরে সেবা ও সেবাধর্মী দায়িত্ব পালন করে যান।

যেহেতু, সমাজের গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের নিজের কোনো কণ্ঠস্বর থাকে না। একজন সাংবাদিকই সেই কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়ান।

তাঁদের কলম হলো মানুষের কল্যাণের হাতিয়ার। সাংবাদিকতা শুধু খবর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের একটি মহৎ কাজ। একজন আসল সাংবাদিক শুধু তথ্য দেন না, বরং খবরের পেছনের মানবিক রূপটি ফুটিয়ে তুলে শোষিত মানুষের মুক্তির পথ দেখান। তাঁদের লেখার মাধ্যমে সমাজের আসল চিত্র ফুটে ওঠে, যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সমাজসেবার আয়না হিসেবে কাজ করে। এই সামাজিক দায়িত্ব থেকেই একজন গণমাধ্যমকর্মী সত্যিকারের গণসেবক হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক ও সমাজসেবকের এই মিল সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখায়।

সাংবাদিকতাকে প্রায়শই অভিহিত করা হয় সমাজের অবিকল্প দর্পণ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে। তবে আধুনিকতার এই তীব্র ঘূর্ণাবর্তে একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ আমাদের অস্তিত্বকে তাড়া করে ফেরা উচিত—সাংবাদিকতা কি কেবলই যান্ত্রিকভাবে তথ্য সরবরাহের এক শীতল মাধ্যম; নাকি এর অন্তরালে সুপ্ত থাকে এক গভীর ও চিরন্তন সামাজিক দায়বদ্ধতা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এক শাশ্বত সত্যের মুখোমুখি হতে হয়।

—একজন সংবাদকর্মী তাঁর পেশাগত বৃত্তের সংকীর্ণ সীমানা পেরিয়ে হৃদয়ে সমাজসেবার নিঃস্বার্থ ব্রত ধারণ করেন, তখনই কেবল একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত, টেকসই এবং কল্যাণমুখী রূপান্তর ঘটে।

আজকের করপোরেট সংস্কৃতির এই গোলকধাঁধায় খবরের কোনো দুর্ভিক্ষ নেই। প্রতি সেকেন্ডে ‘ব্রেকিং নিউজ’ কিংবা চটকদার শিরোনামের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে পাঠকসমাজ। ভিউ, ক্লিক আর টিআরপির এই অন্তহীন ইঁদুরদৌড়ে অনেক সময় হারিয়ে যায় সংবাদের মূল সত্তা। কিন্তু এই যান্ত্রিক বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একজন সাংবাদিক যখন নিজেকে একজন সমাজসেবক হিসেবেও ভাবেন; তখন তাঁর মনস্তত্ত্ব ও কর্মক্ষেত্রের দিগন্ত উন্মোচিত হয় এক ভিন্ন আলোয়। তিনি কেবল একটি তাৎক্ষণিক ঘটনা কিংবা ‘নিউজ ভ্যালু’র পেছনে ছোটেন না; বরং সন্ধান করেন সেই ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাস, তাদের অধিকারের সংকট এবং তা সমাধানের বাস্তবমুখী পথ।

গ্রামীণ সাংবাদিকতার মহান পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩–১৮৯৬) তাঁর বিখ্যাত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র মাধ্যমে এই সমাজসেবামূলক সাংবাদিকতারই এক কালজয়ী ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ব্রিটিশ নীলকর আর স্থানীয় অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল এক নির্ভীক তরবারি। তিনি কেবল অবিচারের খবরই লেখেননি; অত্যাচারিত কৃষকদের দিয়েছেন আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা, নিজের গ্রামে গড়ে তুলেছেন পাঠশালা ও বালিকা বিদ্যালয়। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল বিপন্নের জন্য এক পরম আশ্রয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ সামাজিক আন্দোলন।

এই অনন্য ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আধুনিক যুগে আমরা পেয়েছি চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন (১৯৪৯–১৯৯৫)-কে। উত্তরবঙ্গের ধূসর চরাঞ্চল থেকে শুরু করে অবহেলিত জনপদে ঘুরে ঘুরে তিনি যে সাংবাদিকতা করেছেন, তা ছিল মূলত নিখাদ সমাজসেবারই এক অনুপম রূপ। ডেস্কে বসে কল্পনার রঙ চড়ানো নয়; নিজে মানুষের জীর্ণ কুটিরে গিয়ে তাদের নুন-ভাতের কষ্ট নিজের করে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। মোনাজাত উদ্দিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো কেবল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার দেওয়ালই ভাঙেনি; হাজারো ঘরহীন মানুষকে এনে দিয়েছে সুনিশ্চিত ছাদ এবং দুবেলা অন্ন। তিনি শিখিয়েছেন, শীতের রাতে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা মানুষের দুর্দশার খবর কাগজের পাতায় তোলার পাশাপাশি; একটি উষ্ণ কম্বল তাদের গায়ে জড়িয়ে দেওয়ার আকুতি নিজের ভেতর ধারণ করাই একজন সত্যিকারের ‘সাংবাদিক-সমাজসেবক’-এর প্রধান লক্ষণ।

এই সমাজ রূপান্তরের ক্যানভাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন সিরাজুদ্দীন হোসেনের মতো মননশীল সাংবাদিকরা। ষাটের দশকে অপহৃত ও পাচার হওয়া শিশুদের উদ্ধার করতে তাঁর কলম যেভাবে জননিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠেছিল; তা আজীবন সমাজসেবার এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। আবার নারী জাগরণের অগ্রদূত নুরজাহান বেগম তাঁর ঐতিহাসিক ‘বেগম’ পত্রিকার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, কীভাবে সাংবাদিকতাকে সামাজিক কুসংস্কার ও পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খল ভাঙার শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করা যায়।

সংবাদকর্মীদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়; সমাজের প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও শোষিত মানুষের কোনো শক্তিশালী কণ্ঠস্বর থাকে না। ক্ষমতার অলিন্দে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো সহজে পৌঁছায় না। একজন সমাজসেবক-সাংবাদিকই হন সেই কণ্ঠহীনদের বজ্রকণ্ঠ।

তবে এই মহৎ ব্রত পালনের অর্থ এই নয়; একজন সাংবাদিক তাঁর পেশাগত বস্তুনিষ্ঠতা কিংবা নিরপেক্ষতা বিসর্জন দেবেন। সমাজসেবার এই মানবিক চেতনা একজন সাংবাদিককে করে তোলে আরও বেশি দায়িত্বশীল। তাকে উদ্বুদ্ধ করে বর্তমান সময়ের অতিপ্রয়োজনীয় সমাধানমুখী সাংবাদিকতায়। সমাজের অন্ধকারের পাশাপাশি আলোর গল্প, মানবিক উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের সততার ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরাও তাঁর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব; যা সমাজে আরও হাজারো মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

সাংবাদিকতার মূল চালিকাশক্তি আসলে মানবকল্যাণের মাঝে নিহিত। সাংবাদিকতা যখন করপোরেট ব্যবসার দেয়াল ভেঙে এবং যান্ত্রিকতার গণ্ডি পেরিয়ে কাঙাল হরিনাথ, মোনাজাত উদ্দিন কিংবা সিরাজুদ্দীন হোসেনের আদর্শে সমাজসেবার মহৎ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হয়; তখনই সমাজ থেকে অন্যায়ের অমাবস্যা দূর হয়। একজন সমাজসেবক-সাংবাদিকের প্রতিটি শব্দ হয়ে ওঠে তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একেকটি জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ।

এমন সমাজসেবামূলক সাংবাদিকতা আমরা দেখেছি ৫০, ৬০, ৭০, ৮০ এমনকি ৯০-এর দশকেও। তখন সাংবাদিকরা শুধু সংবাদ পরিবেশন কিংবা ফলোআপ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং কাঙাল হরিনাথের মতো সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছেন। এখনো কিছু গণমাধ্যমে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়। কিছু গণমাধ্যমকর্মী একে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন যে—তারা শুধু সংবাদের ফেরিওয়ালা নন, জনগণের সেবকও। কোনো গণমাধ্যম যখন সমাজ ও দেশের উন্নতি এবং মুক্তি নিয়ে কাজ করবে, তখনই এই পচনশীল সমাজ ও পরিবেশ আস্তে আস্তে সুস্থ হতে শুরু করবে।

আজকের প্রজন্মের সাংবাদিকদের এই মানবিক ও বৈপ্লবিক ব্রত নিয়েই এগিয়ে আসা উচিত; তবেই গড়ে উঠবে একটি সমতাভিত্তিক, সুন্দর ও মানবিক পৃথিবী।

গণমাধ্যমকর্মীরা কেবল পেশাদার নন, তাঁরা নিঃস্বার্থ সামাজিক যোদ্ধা। রাষ্ট্র ও জনগণের উচিত এই গণসেবকদের কাজের স্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাহলে সমাজ থেকে অন্ধকারের অবসান ঘটে প্রগতির আলো আরও বেগবান হবে।

লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক

১৫০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন