সর্বশেষ

মতামত

পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

অদিতি করিম
অদিতি করিম

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ ৬:০৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে যখন পুশইন নিয়ে টানাপোড়েন এবং উত্তেজনা, ঠিক তখনই বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে এলেন নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার পর তিনি বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প (যুক্তরাষ্ট্র), নরেন্দ্র মোদি (ভারত), শি জিনপিং (চীন)।

ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদী পেশাদার কূটনৈতিক নন; তিনি একজন রাজনীতিবিদ। গত এপ্রিলে ভারত সরকার দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এ প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে দেশটির হাইকমিশনার করে বাংলাদেশে পাঠাল।

বাংলাদেশে প্রবেশ করেই দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি (বাংলাদেশের) অ্যাড করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে আসছি। একই আকাশ, একই বাতাস, একই। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

হাইকমিশনার হিসেবে নিজের অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাইবোন ও মা, তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করার মধ্য দিয়ে ভারত একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তা হলো, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। তাই বাংলাদেশকেও এখন এ সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

সীমান্তে উত্তেজনা, মানুষ হত্যা, পুশইনের মতো অমানবিক ঘটনা কখনো ভালো সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে না। এটা দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততার প্রকাশ। দুই দেশের জন্যই এ বৈরিতা ক্ষতিকর। বর্তমান বিশ্বে বল প্রয়োগ বা যুদ্ধ কোনো সংকটের সমাধান দেয় না; বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। ভারতের অযৌক্তিক পুশইন নিয়ে আর কালবিলম্ব না করে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তেজনা কারও জন্যই ভালো ফল দেবে না।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার। এটি বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত, যা ভারতের পাঁচটি রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সীমান্তে উত্তেজনা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দুই দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

শুধু সীমান্ত নয়, দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। পদ্মা, তিস্তাসহ একাধিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, ভিসা জটিলতা এবং ভারতের বন্দরগুলো দীর্ঘদিন বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা দরকার।

একটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শান্তির জন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক জরুরি। সবকিছু পাল্টানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনার সম্পর্ক নয়, বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা প্রয়োজন।

তা ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা বন্ধুত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সমস্যা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ। পুশইন করে কিংবা সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত আসার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দুই দেশকেই এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এ সময় উগ্র ভারতবিরোধিতার নামে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভুল পথে নিয়ে যায়। ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের দায়িত্বহীন ভারতবিদ্বেষী কথাবার্তায় বাংলাদেশের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয়নি।

ইউনূস ভারতের সেভেন সিস্টার নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা সুস্পষ্টভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করে বলে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত করেছেন।

ইউনূস সরকার বাইরে ভারতবিরোধিতা করলেও ভেতরে দেশকে আরও বেশি ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল করেছে। তাঁর আমলে ভারত থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছে। কিন্তু ভারতের ভিসা বন্ধ হয়ে যায়, বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়।

আজকের পুশইন ইউনূস সরকারের ভুল কূটনৈতিক তৎপরতার ফল। শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বের সঙ্গেই বাংলাদেশ যেন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ড. ইউনূসের ভুল নীতির কারণে।

বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো নয়। বারো লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রায় নয় বছর ধরে অবস্থান করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য বিশাল চাপ। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে তার করা কোনো গোল আমরা উদযাপন করতে পারিনি। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য নেই।

ইউনূস বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা এ বছরের রোজার ঈদ মিয়ানমারে করবে। সেটি বাস্তবায়িত হয়নি; বরং এর মধ্যে অন্তত দুই লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

ক্ষমতা নেওয়ার পর ইউনূস বলেছিলেন, বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে। কিন্তু কার্যত দেড় বছরে বিশ্বের দরজাই বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ইউরোপের যেসব দেশের বাংলাদেশে ভিসা সেন্টার নেই, তারা বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করবে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের দিল্লি থেকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু দেড় বছরে একটি দেশেরও ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে বিদেশে পড়তে যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

যেসব দেশে ভিসা ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারতেন, সেসব দেশের অধিকাংশই এখন ভিসামুক্ত প্রবেশ বন্ধ করেছে। বাকি অনেক দেশও ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ভিসা এখন অনেকের কাছে সোনার হরিণ।

ইউনূস মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তা চালু হয়নি। বহু দেশে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। যুক্তরাষ্ট্রও ভিসা বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে গেছে বলেও সমালোচনা রয়েছে।

দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশ সফর করলেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যত সফল হয়নি। বাংলাদেশের কূটনীতি আজ পথহারা। তাই নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত পররাষ্ট্রনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জন্য কিছু সুখবরও এসেছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিসকে ৮ ভোটে পরাজিত করে তিনি এক বছরের জন্য এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগও চলছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হচ্ছে মালয়েশিয়ায়। ২১ জুনের এ সফরে বন্ধ শ্রমবাজার খুলবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এটি হবে তারেক রহমানের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি সাফল্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। সেই ভিত্তিকে আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে দিতে হবে অগ্রাধিকার। পাশাপাশি কূটনীতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে।

আমরা আশাবাদী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শিগগিরই সঠিক পথ খুঁজে পাবে।

লেখক : নাট্যকার ও কলাম লেখক

১২৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন