সর্বশেষ

মতামত

নীল কালির টিপসই

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬ ৮:৩৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
রুম্মানার মনে হলো, তার কোল থেকে জ্যান্ত কিছু একটা আলগা হয়ে গেল। কোনো কান্না নেই, কোনো চিৎকার নেই। শুধু একটা খসখসে শব্দ।

সরকারি হাসপাতালের চার নম্বর ওয়ার্ডের প্লাস্টার খসে পড়া দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। দেয়ালের গায়ে একটা সরকারি পোস্টার ঝুলছে—‘একটি সন্তানই যথেষ্ট’। পোস্টারের হাসিমুখের মা-বাবার ঠিক নিচেই বসে আছে শমসের দালালের ছায়াটা। শমসেরের হাত থেকে পারফিউমের সস্তা, তীব্র গন্ধ আসছিল। সে এক তাড়া পাঁচশো টাকার নোট গুনছে। নোটের খড়খড়ে শব্দটা রুম্মানার কানের পর্দা ফুটো করে দিচ্ছিল।

"একদম ফর্সা মাল। তাও আবার ছেলে!" শমসেরের ফিসফিসে গলায় এক অদ্ভুত ব্যবসায়ী তৃপ্তি।

রুম্মানার স্বামী কালু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের নখ খুঁটছিল। সেদিকে তাকালে মনে হয়, সে কোনো মানুষ নয়, স্রেফ একটা হাড়জিরজিরে কঙ্কাল, যাকে জোর করে একটা ছেঁড়া লুঙ্গি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কালু রুম্মানার দিকে তাকাতে পারছে না। তার পকেটে এখন বারো হাজার টাকা। এই টাকায় তিন মাসের বকেয়া ঘরভাড়া শোধ হবে, আর চালের দোকানের খাতাটা পরিষ্কার হবে। বাকি টাকা দিয়ে কালু হয়তো একটা ভাঙা রিকশা ভাড়ার অগ্রিম দেবে।

কালু কোনো অপরাধী নয়। সে কেবল এই রাষ্ট্রের তৈরি করা ক্ষুধার নরকে বেঁচে থাকা এক অণুজীব। যে রাষ্ট্রে চালের কেজি আশি টাকা, আর একটা তাজা বাচ্চার দাম মাত্র বারো হাজার।

"নেন, এই সাদা কাগজটায় একটু বুড়ো আঙুলের টিপ দিয়ে দেন।" শমসের একটা স্ট্যাম্প পেপার এগিয়ে দিল।

রুম্মানার আঙুলে নীল রঙের কালি মাখানো হলো। তার মনে হলো, ওই নীল কালিটা আসলে বিষ। যে বিষে একটু পরেই তার মাতৃত্বের সমস্ত আইনি অধিকার নীল হয়ে মরে যাবে। সে টিপসই দিল। কোনো কাঁপা হাত নয়, তীব্র এক অসাড়তায় তার আঙুলটা কাগজের বুকে চেপে বসল।

ঠিক আধঘণ্টা পর হাসপাতালের পেছনের গেটে একটা কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল। এসি সচল থাকা গাড়ির ভেতর থেকে নামলেন এক ভদ্রমহিলা। ফিটফাট, চশমা পরা, আভিজাত্যের সুবাস ছড়ানো অবয়ব। তিনি নিঃসন্তান। তাঁর চাই একটা ফর্সা এবং সুস্থ সন্তান। অন্ধকার বাজারের এই নিখুঁত চেইন সাপ্লাইয়ে তিনি একজন সম্মানিত ক্রেতা।

শমসের খুব সাবধানে কাপড়ে মোড়ানো পুটলিটা ভদ্রমহিলার কোলে তুলে দিল। ভদ্রমহিলা বাচ্চার মুখটা একটু দেখে চশমাটা ঠিক করলেন। তাঁর মুখে এক পরম তৃপ্তির হাসি। তিনি বাচ্চার মায়ের দিকে একবারও তাকালেন না। দেখার প্রয়োজনও মনে করলেন না। কারণ, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে টাকার বিনিময়ে যা কেনা হয়, তার উৎপাদকের কোনো পরিচয় থাকে না। ফ্যাক্টরির শ্রমিক যেমন অন্তরালেই থাকে, রুম্মানাও তাই।

গাড়িটা স্টার্ট নিল। কালো কাচ চড়ে গেল ওপরে। ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়িটা চলে গেল শহরের নামী কোনো অট্টালিকার দিকে।

কালু এসে রুম্মানার কাঁধে হাত রাখল। "চল, বাসায় চল।"

রুম্মানা বিছানা থেকে নামল। তার শরীর থেকে তখনও ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সে দেখল, চারপাশের দেয়ালগুলো যেন তাকে উপহাস করছে। এই সেই হাসপাতাল, যেখানে ওষুধের স্লিপ হাতে নিয়ে কালুকে সারা রাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। এই সেই সমাজ, যা তাকে কাজ দিতে পারেনি, পুষ্টি দিতে পারেনি, কিন্তু আজ তার সন্তানের চামড়ার রং ‘ফর্সা’ বলে তার একটা চড়া দাম নির্ধারণ করে দিল।

রাস্তায় নেমে রুম্মানা আকাশের দিকে তাকাল। একটা বিশাল ডিজিটাল বিলবোর্ডে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির বিজ্ঞাপন ঝকঝক করছে।

রুম্মানা হাসল। এক তীব্র, উন্মাদ আর মনস্তাত্ত্বিক হাসি। সে বুঝতে পারল, এই তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্র; তার বিচারব্যবস্থা আসলে এক বড় শমসের দালাল। যে দালাল প্রতিদিন হাজারো রুম্মানার ক্ষুধা আর জরায়ুকে বন্ধক রেখে নিজেদের শোষণের রাজত্ব সচল রাখে।

সে কালুর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আচ্ছা কালু, সামনের বার যদি কালো বাচ্চা হয়, শমসের কি দাম কম দেবে?"

কালু থমকে দাঁড়াল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় রুম্মানার চোখ দুটোকে মানুষের চোখ বলে মনে হলো না..!

লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক

১৩৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন