জিয়া থেকে তারেক রহমান: জনবান্ধব রাজনীতির ঐতিহাসিক ধারা
শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬ ১০:৩২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ-অর্থনীতির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলে একটি চিরায়ত সত্য বারবার সামনে আসে—এই দেশের প্রকৃত শক্তির উৎস ও ভিত্তি হচ্ছে এর সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যুগের পর যুগ ধরে এই বিশাল জনপদ জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তারা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে গেছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একবার ভোটের সময় বাদ দিলে, এই প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-কষ্ট শোনার মতো আন্তরিক মানুষের সংখ্যা এই দেশে অত্যন্ত নগণ্য।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই এই অবহেলিত জনগোষ্ঠী গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে, তখনই দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে নতুন দিশা দেখিয়েছেন। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন উদ্যোগে, যা ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলো পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার কল্যাণমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বেগবান ও বিকশিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও সুশৃঙ্খল রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছে।
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মাতৃভূমি মুক্ত করেছিল এই আশায় যে, তারা স্বাধীন দেশে মানবিক মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এক চরম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা নেমে আসে। একদলীয় শাসনব্যবস্থা, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ এবং সুশাসনের অভাব তৎকালীন সমাজজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হওয়ায় জনমনে এক গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়।
এই ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি এসে কেবল ভঙ্গুর রাষ্ট্রকাঠামোই পুনর্গঠন করেননি, বরং রাজনীতিকে ড্রয়িংরুম ও রাজধানীকেন্দ্রিক বৃত্ত থেকে বের করে সরাসরি গ্রামবাংলায় নিয়ে যান। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, গ্রাম বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ।
জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছিন্ন করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছুটে বেড়াতেন এবং সরাসরি কৃষকের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর প্রবর্তিত ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল একটি স্বনির্ভর ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের মূল হাতিয়ার। কোদাল হাতে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার করেছিলেন। গ্রাম সরকার ধারণার মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসার যে দূরদর্শী উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন দিশা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
শহীদ জিয়ার শাহাদাতবরণের পর দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যখন আবারও অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে, তখন সেই শূন্যতা পূরণে হাল ধরেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর তাঁর সরকারের গৃহীত বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেশের সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়।
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার প্রসারে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হয়। তাঁর সরকারের অন্যতম যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি চালু করা। এর ফলে দেশের প্রান্তিক পরিবারের কন্যারা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পায়, যা সামগ্রিক নারী শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
এ ছাড়া তাঁর সময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা হয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন বাস্তবায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদারের মাধ্যমে তিনি শহীদ জিয়ার আদর্শকে তৃণমূলের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
পিতা শহীদ জিয়ার আদর্শ ও মাতা বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনীতির সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ধারণ করে সমসাময়িক রাজনীতিকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন।
২০০২ থেকে ২০০৬ সালের তৃণমূল সম্মেলন থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণের মূল স্রোতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যানজটের নগরীতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কমিয়ে আনা হয়েছে এবং চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থানের দীর্ঘদিনের প্রথা বাতিল করা হয়েছে।
বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলাচলের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক কাজ ও সেবাপ্রাপ্তি সহজতর করতে শনিবারেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শহীদ জিয়ার ১৯ দফার আধুনিক রূপ হিসেবে ৩১ দফা রূপরেখা রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়নের একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের দখলদারি, অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত না করার অবস্থান এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নজির একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা বহন করে।
এর পাশাপাশি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো দেশের বিপুল তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোরারোপ সেই লক্ষ্য অর্জনেরই অংশ।
জিয়াউর রহমান যেভাবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বর্তমান সরকারও সেই ধারার অনুসরণ করছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া বিভেদের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সব মতাদর্শের মানুষকে দেশের বৃহত্তর কল্যাণে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা জাতীয় সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করছে।
ইতিহাস বারবার ফিরে আসে, তবে তা আসে নতুন প্রেক্ষাপটে ও নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। ১৯৭৫-পরবর্তী ভঙ্গুর বাংলাদেশকে যেভাবে শহীদ জিয়া একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও জাতীয়তাবাদের আলো দেখিয়েছিলেন, তেমনি বর্তমান সময়ের নানা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সংস্কারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই রাজনৈতিক প্রয়াস দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। তৃণমূলের আস্থা ও সমর্থনের মর্যাদা রক্ষা করে এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে একটি বৈষম্যহীন, স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লেখক : সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
১২৮ বার পড়া হয়েছে