সর্বশেষ

সাহিত্য

মৃত্তিকা-লগ্ন প্রজ্ঞা ও মুক্তমনীষার ধ্রুবতারা: আবুল ফজল এবং একটি জাতির বিবেকী রূপান্তর

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬ ১:৫২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আজ থেকে ঠিক তেতাল্লিশ বছর আগে, ১৯৮৩ সালের এই দিনে বাংলাদেশের তপ্ত মাটিকে আরও খানিকটা নিঃস্ব করে দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন এক আজন্ম জ্ঞানতপস্বী—আবুল ফজল। সময় বয়ে যায়, জনপদ বদলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের অভাব বোধ হয় সময় যত গড়ায় ততই যেন দীর্ঘশ্বাস হয়ে আরও গাঢ় হয়।

যখন চারদিকের কোলাহল আর আদর্শিক বিভ্রান্তির কুয়াশা সমাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন আবুল ফজলের মতো একজন নিরেট সত্যনিষ্ঠ মানুষের উপস্থিতি যে কতটা জরুরি ছিল, তা আজ বড় বেশি মনে পড়ছে। তিনি কেবল একজন প্রাবন্ধিক বা সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি ম্রিয়মাণ জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার এক নৈতিক শক্তি। তাঁর কলম কেবল কালির রেখা টানেনি, বরং তা ছিল অন্ধকার ঘরে জানলা খুলে দেওয়ার মতো এক বৈপ্লবিক প্রয়াস।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়টা ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের জন্য এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল। চারদিকে রক্ষণশীলতার দেয়াল, সংস্কারের শিকল আর এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা। ঠিক এমন এক গুমোট পরিবেশে ১৯২৬ সালে ঢাকার বুকে জন্ম নিল 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'। একদল তরুণ তুর্কি, যাঁদের হাতে ছিল যুক্তির মশাল আর চোখে ছিল আগামীর স্বপ্ন। এই 'শিখা' গোষ্ঠীর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আবুল ফজল। তাঁদের সেই কালজয়ী মন্ত্র—"জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব"—আজও শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। প্রশ্ন জাগে, আজ এই তথ্য-বিস্ফোরণের যুগে আমরা কি আসলেই মুক্ত? নাকি আমরা তথ্যের পিঞ্জরে আরও বেশি বন্দি হয়ে পড়েছি?

আবুল ফজল সেই সময়ে দাঁড়িয়েই বুঝেছিলেন যে, বাইরের শৃঙ্খল ভাঙার আগে ভেতরের শৃঙ্খল ভাঙা বেশি জরুরি। কান্ট যেমন বলেছিলেন 'জানার সাহস করো', আবুল ফজল ঠিক সেই সাহসের বীজ বপন করেছিলেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তিনি জানতেন, সমাজ পরিবর্তন কেবল ওপরের কাঠামোগত পরিবর্তনের নাম নয়, বরং তা হলো মানুষের চিন্তার জগতে এক আমূল রূপান্তর। 'শিখা' ছিল সেই চিন্তার আলোকায়ন, যা বাঙালির মননে আধুনিকতার প্রথম পদধ্বনি শুনিয়েছিল। আবুল ফজল তাঁর লেখনীতে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মুক্তবুদ্ধি কোনো বিলাসী বস্তু নয়, বরং এটি মানুষের টিকে থাকার অক্সিজেন।

সাহিত্যিক হিসেবে আবুল ফজল ছিলেন নিভৃতচারী কিন্তু প্রখরভাবে জীবনমুখী। তাঁর প্রবন্ধগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে কোনো তাত্ত্বিক কচকচানি নেই, আছে মাটির ঘ্রাণ আর মানুষের প্রতি গভীর মমতা। 'শুভুবুদ্ধি' বা 'সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন'—গ্রন্থগুলোর প্রতিটি ছত্রে এক আশ্চর্য স্বচ্ছতা খেলা করে। তাঁর কাছে সংস্কৃতি মানে ছিল 'মনের চাষ'। খুব সহজ কিন্তু গভীর এক উপমা। জমি যেমন কর্ষণ না করলে ফসল দেয় না, মনকেও তেমনি জ্ঞান আর মানবিকতায় সিক্ত না করলে তা কেবল আগাছায় ভরে যায়। মানুষের পশুবৃত্তি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ যে সংস্কৃতির চর্চা, এই বোধ তিনি তাঁর জীবন দিয়ে লালন করেছেন।

উপন্যাস ও ছোটগল্পে তিনি সমাজের ভাঙা-গড়ার খেলাকে দেখেছেন এক নির্মোহ দৃষ্টিতে। 'রাঙা প্রভাত' বা 'চৌচির'-এর মতো রচনায় শ্রেণিদ্বন্দ্বের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানুষের ভেতরের নৈতিক লড়াই। সাহিত্যের কাজ যে কেবল আনন্দ দেওয়া নয়, বরং মানুষকে চাবুক মেরে জাগিয়ে তোলা—এই বিশ্বাস থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। তাঁর আত্মজীবনী 'রেখাচিত্র' কিংবা যুদ্ধের ডায়েরি 'দুর্দিনের দিনলিপি' কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার খতিয়ান নয়, বরং তা যেন এক বিপন্ন জনপদের হৃদস্পন্দন। সেখানে তিনি ইতিহাসের পাতা থেকে রক্ত আর চোখের জল মুছে নিয়ে সত্যকে তুলে ধরেছেন। নিও-হিস্টোরিসিজম বা নতুন ইতিহাসতত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, আবুল ফজল নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত ইতিহাস।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আবুল ফজলের যে সময়কাল, তা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক রূপকথার মতো। ক্ষমতা সেখানে দাপট দেখাতে আসেনি, এসেছিল সেবার ব্রত নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় যে কেবল ডিগ্রি বিতরণের কারখানা নয়, বরং মুক্তচিন্তার এক পবিত্র চত্বর—তা তিনি প্রতিটি কাজে প্রমাণ করেছিলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে ছিল 'মানুষ হওয়া'। বর্তমান যুগে যখন জিপিএ আর ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে আমরা ক্লান্ত, তখন তাঁর সেই দর্শনের গুরুত্ব আরও বেশি অনুভূত হয়।

আবুল ফজলের জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ। তিনি ধর্মের লেবাসে বিভাজনকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। রবীন্দ্রনাথের 'মানুষের ধর্ম' যেমন এক বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়, আবুল ফজলের জীবনও ছিল সেই সর্বজনীন প্রেমের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বুঝতেন, সাম্প্রদায়িকতা কেবল সমাজের ক্ষতি করে না, তা মানুষের আত্মাকে সংকুচিত করে ফেলে। 

বাঙালি সংস্কৃতি ও সমাজের যে অসাম্প্রদায়িক রূপ আমরা স্বপ্ন দেখি, আবুল ফজল ছিলেন তাঁর অগ্রপথিক। তিনি মানুষকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে সহনশীল হতে হয়, কীভাবে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে হয়। তাঁর কাছে সত্য ছিল সুন্দরের প্রতিশব্দ। সত্যের জন্য তিনি যেমন কারো রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি, তেমনি সুন্দরের সাধনায় তিনি ছিলেন এক আজন্ম প্রেমিক।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পৃথিবীটা অনেক বদলে গেছে। আমাদের হাতে এখন স্মার্টফোন। আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে বাস করছি, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের জ্ঞানের গভীরতা যেন ক্রমশ শুকিয়ে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আমরা কেবল নিজেদের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে ভালোবাসি। আমরা ভিন্নমত সইতে পারি না।  

আজ আবুল ফজলের সেই 'মুক্তবুদ্ধি'র ডাক নতুন করে শোনার সময় এসেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন সবকিছুকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে। কোনো কিছু না বুঝে মেনে নেওয়া যে অপরাধ, সেই সত্যটি তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে যদি হৃদয়ের উন্নতি না ঘটে, তবে সেই সভ্যতা যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে—এই অশনিসংকেত তিনি অনেক আগেই দিয়ে গিয়েছিলেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে আবুল ফজলের প্রাসঙ্গিকতা তাই কেবল ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং পথপ্রদর্শক হিসেবে।

আবুল ফজলকে আমরা কতটুকু মনে রেখেছি? তাঁর নামে পদক আছে, রাস্তা আছে, হয়তো পাঠ্যপুস্তকে তাঁর কিছু লেখাও আছে। কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার তো তাঁর চিন্তায়। আমরা কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাঁর সেই 'মুক্তবুদ্ধি'র চর্চাকে ঠাঁই দিতে পেরেছি? নাকি আমরা কেবল মুখস্থ বিদ্যার এক যান্ত্রিক প্রজন্ম তৈরি করছি? তাঁর রচনাবলী কি আজকের পাঠকদের কাছে সহজলভ্য? এই প্রশ্নগুলো আজ আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।

তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কেবল বার্ষিক সেমিনার বা পুষ্পস্তবক যথেষ্ট নয়। বরং তাঁর আদর্শকে যাপিত জীবনে প্রয়োগ করাটাই হবে তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে প্রতিটি মানুষ হবে যুক্তিবাদী এবং মানবিক। সেই সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই কাঁধে। আবুল ফজল কোনো মৃত নক্ষত্র নন, তিনি এক চিরঞ্জীব ধ্রুবতারা। ঘুটঘুটে অন্ধকারেও যে তারাটি সঠিক পথের দিশা দেয়।

সময় যত যাবে, আবুল ফজলের মতো মানুষের প্রয়োজনীয়তা তত বাড়বে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ঘৃণা নয়, বরং শুভবুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীকে জয় করতে হয়। মৃত্তিকা-লগ্ন এই মহাজীবনের অবসান ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রজ্ঞার জ্যোতি কখনো ম্লান হবে না। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাঙালির মুক্তবুদ্ধির প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠে।

নশ্বর দেহ ত্যাগ করে তিনি অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন তেতাল্লিশ বছর আগে, কিন্তু তাঁর সেই গম্ভীর ও শান্ত কণ্ঠস্বর আজও যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়—"সত্যিই কি তোমরা মুক্ত হতে চাও? তবে আগে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাও।" আবুল ফজল সেই অবিনাশী আলোকবর্তিকা, যা আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথ দেখাবে। তাঁর চিন্তা ও দর্শন ছিল এক মহাকাব্যিক রূপরেখা, যা আজও অসমাপ্ত; আর সেই মহাকাব্য পূর্ণ করার ভার আজ আমাদেরই উত্তরসূরিদের ওপর অর্পিত। মে মাসের এই থমথমে রোদে আবুল ফজলের স্মৃতি যেন এক শীতল পরশ হয়ে আমাদের মনে জাগ্রত থাক। শুভুবুদ্ধির জয় হোক, জয় হোক মুক্তপ্রাণের।
 

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন