সর্বশেষ

সাহিত্য

রক্তের অক্ষরে লেখা এক নতুন ইতিকথা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পচৈতন্যে শ্রেণিচেতনার অভিঘাত

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬ ৯:৪৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বিশ শতকের চল্লিশের দশক। বাংলার আকাশ তখন মেঘে ঢাকা নয়, বরং বারুদ আর কান্নার বাষ্পে ভারী। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করাল ছায়া, অন্যদিকে পঞ্চাশের মন্বন্তরের সেই কঙ্কালসার মিছিল, যা আজও হাড়কাঁপানো এক স্মৃতির মতো বাঙালির পিছু ছাড়ে না। তেভাগার আন্দোলন যখন গ্রামবাংলার মেঠো পথকে রক্তে রাঙিয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই ডাস্টবিনের পাশে কুকুরের সঙ্গে মানুষের লড়াই দেখে এক সংবেদনশীল শিল্পীহৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল।

তিনি আর কেউ নন—বাংলা সাহিত্যের সেই অদম্য, ঋজু এবং চিরকাল অবহেলিত রাজপুত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ ২০২৬-এর এই স্নিগ্ধ সকালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয় মানিক কেবল এক নাম নয়, বরং এক অবিনশ্বর দহন। তাঁর কলম যখন কাস্তের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে আর কালিতে মিশে যায় শোষিত মানুষের রক্ত, তখনই জন্ম নেয় এমন এক নন্দনতত্ত্ব যা কেবল দেখার নয়, বরং স্পর্শ করার মতো জীবন্ত।

মানিকের সাহিত্যিক সফরের দিকে তাকালে এক বিস্ময়কর রূপান্তর চোখে পড়ে। শুরুর দিকে তিনি যেন ছিলেন মানুষের মনের গহিন অরণ্যের এক নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী। ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের আলো-আঁধারিতে তিনি খুঁজে ফিরছিলেন অবদমিত কাম আর আদিম প্রবৃত্তির শেকড়। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র শশী কিংবা ‘পদ্মানদীর মাঝি’র কুবের—এরা সবাই এক অলক্ষ্য নিয়তির জালে বন্দী। শশী যে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চেয়েও পারে না, কিংবা কুবেরের যে কপিলা-প্রীতি—এসবের পেছনে ছিল এক প্রবল জৈবিক তাড়না। সেখানে মানুষ ছিল প্রকৃতির হাতের এক অসহায় ক্রীড়নক। কিন্তু সময় তো আর স্থির জল নয়। চল্লিশের দশকের সেই ভয়াবহ দিনগুলো মানিকের দৃষ্টিকে অন্দরমহল থেকে টেনে নিয়ে এল রাজপথে। তিনি দেখলেন, মানুষের ভাগ্য কেবল তার অবচেতন মন দিয়ে নয়, বরং তার পেটের ক্ষুধা আর বাজারের দর দিয়ে নির্ধারিত হয়। এই বোধোদয়ই তাঁকে ফ্রয়েড থেকে মার্ক্সের দিকে চালিত করল। ১৯৪৪ সালে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন, সেটি কেবল কোনো রাজনৈতিক লেবেল লাগানো ছিল না; বরং তা ছিল এক শিল্পীর নিজের শেকড় খুঁজে পাওয়ার এক পরম মুহূর্ত।

আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছিলেন যে, মানুষের জীবনের কান্নাগুলো কেবল ভাগ্যলিপির লিখন নয়, এর পেছনে রয়েছে এক সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামো। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তাঁর কাছে কেবল কোনো শুকনো তত্ত্ব হয়ে থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছিল সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করার এক ধারালো ছুরি। তাঁর উপন্যাসে বা ছোটগল্পে আমরা যখন দেখি জমিদার বা মহাজনের শোষণের শিকার এক সাধারণ মানুষকে, তখন সেটি আর নিছক গল্প থাকে না। তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক অমোঘ দলিল। তাঁর বিখ্যাত সেই কথাটি মনে পড়ে—"জীবনকে আমি নগ্নভাবেই দেখিয়াছি, তাকে পোশাক পরাইবার সময় বা সুযোগ আমার ঘটে নাই।" এই নগ্নতা কোনো কদর্যতা নয়, বরং এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো। যেখানে বুর্জোয়া সমাজের চকচকে মুখোশ খুলে বেরিয়ে আসে এক কঙ্কালসার বাস্তবতা।

সাহিত্যতত্ত্বের ভাষায় যাকে আমরা ‘কালেক্টিভ প্রোট্যাগনিস্ট’ বা সামষ্টিক নায়ক বলি, মানিকের লেখায় তার সার্থক রূপায়ন দেখা যায়। তাঁর ‘চিহ্ন’ উপন্যাসের কথা ধরা যাক। সেখানে কোনো একজন ব্যক্তি নায়ক নয়, বরং গোটা ধর্মঘটী জনতা বা সেই বিক্ষুব্ধ শ্রেণিটিই হয়ে উঠেছে উপন্যাসের প্রাণ। জর্জি লুকাচ বা টেরি ইগলটনরা সাহিত্যের যে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলেছিলেন, মানিক যেন তা নিজের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন। তিনি যখন শ্রমিকের ঘামের গন্ধ আর কৃষকের হাতের কড়া পড়া চামড়ার কথা লেখেন, তখন পাঠক অনুভব করতে পারেন যে, সাহিত্য কেবল ড্রয়িংরুমের শৌখিন বিলাসিতা নয়। তা হলো মাটির কাছাকাছি থাকা এক সংগ্রামের আখ্যান।

মানিকের ছোটগল্পগুলো তো এক একটি বিস্ফোরণ। ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ গল্পের সেই যাত্রাপথ কি কেবল একটা দূরত্ব অতিক্রম করা? মোটেই না। তা হলো শ্রেণিদ্বন্দ্বের এক জীবন্ত ক্যানভাস। পুলিশের লাঠি আর শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যখন সাধারণ মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়, তখন সেই সংঘাতের যে ছবি মানিক এঁকেছেন, তা যে কোনো কবির কবিতার চেয়েও বেশি স্পন্দিত। আবার যদি আমরা ‘ছিনিয়ে খায়নি কেন?’ গল্পটির কথা ভাবি, তবে এক গভীর বিষাদ আর দার্শনিক প্রশ্ন আমাদের গ্রাস করে। পঞ্চাশের মন্বন্তরে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মরল, ডাস্টবিনে খাবারের জন্য কুকুরের সঙ্গে লড়াই করল, কিন্তু তারা কেন গুদাম লুট করল না? কেন তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়ল না? এখানেই মানিক আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সেই অদৃশ্য শেকলকে, যাকে আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ’। যুগ যুগ ধরে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে শোষিত মানুষের মগজে যে দাসত্ব ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, মানিক তাকেই কষাঘাত করেছেন। তিনি চেয়েছেন মানুষ তার নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করুক, নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে শিখুক।

মধ্যবিত্ত জীবনের সেই করুণ হাহাকারও তাঁর কলম এড়ায়নি। ‘পেনশন’ গল্পের সেই রিক্ত বৃদ্ধের হাহাকার আমাদের আজও ভাবিয়ে তোলে। সারাটা জীবন কর্পোরেট বা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চাকায় পিষ্ট হয়ে শেষে যখন একমুঠো পেনশনের জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হয়, তখন বোঝা যায় শ্রমিকের ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ কীভাবে শোষিত হয়। পুঁজিবাদের এই নির্মম চাকা কীভাবে মানুষকে রক্তশূন্য করে ছুড়ে ফেলে দেয়, তার চেয়ে নিখুঁত ছবি আর কে আঁকতে পারত?

তবে এই আদর্শের পথে মানিকের যাত্রা খুব একটা মসৃণ ছিল না। এক সময় তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত লেখক, কিন্তু যখনই তিনি সাম্যবাদের ঝাণ্ডা তুলে ধরলেন, চারপাশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ আর প্রকাশকরা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। নেমে এল চরম দারিদ্র্য। যে মানুষটি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, তাঁকে নিজের জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে হয়েছে অসহ্য অর্থকষ্টে আর রোগে ভুগে। অনেকেই অভিযোগ করেন যে, রাজনীতির চাপে মানিকের শিল্পের গুণাগুণ নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি তাঁর শিল্প আরও বেশি সংহত, মেদহীন আর সরাসরি হয়েছিল? আসলে তথাকথিত ‘আর্ট ফর আর্ট’স সেক’ বা শিল্পের জন্য শিল্প তত্ত্বে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্প হবে মানুষের জীবনের জন্য। তাঁর গদ্য থেকে ঝরে গিয়েছিল সমস্ত অলঙ্কার, পড়ে রইল কেবল হাড়-মাংসের তীক্ষ্ণ সত্য।

 নিজের শ্রেণিকে ত্যাগ করে শোষিত মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, যাকে সমাজতত্ত্বের ভাষায় ‘ডিক্লাসিং’ বলা হয়, মানিক তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। তাঁর জীবনে দারিদ্র্য ছিল এক জ্বলন্ত আগুনের মতো, যাতে পুড়ে তিনি নিজেকে খাঁটি সোনা করে গড়েছিলেন। তাঁর এই লড়াই কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের হয়ে কাজ করা কিংবা গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত থাকা-সবই ছিল তাঁর সেই লড়াইয়ের অঙ্গ। তিনি জানতেন, সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে জয়ী না হতে পারলে রাজনৈতিক লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। প্রযুক্তির চাকচিক্য আমাদের চারপাশটা ভরিয়ে দিলেও, ভেতরের সেই শোষণের রূপটি কিন্তু পাল্টায়নি। বরং তা আরও সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ হয়েছে। নয়া-উদারনীতিবাদের এই যুগে যখন ধনী আরও ধনী হচ্ছে আর সাধারণ মানুষ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, তখন মানিকের সেই শ্রেণিসচেতন গদ্য যেন আমাদের কানে কানে এক সতর্কবাণী শুনিয়ে যায়। আজ যখন দেখি সাহিত্য কেবল সেলিব্রেটি হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়েছে, তখন মানিকের সেই অটল আদর্শবাদী চরিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, লেখকের কাজ কেবল আনন্দ দেওয়া নয়, বরং সমাজের জঞ্জাল পরিষ্কার করাও।

মানিকের জীবন ছিল মাত্র ৪৮ বছরের। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা শতবর্ষের সঞ্চয়ের চেয়েও বেশি। ১৯৫৬ সালের সেই ডিসেম্বর মাসে যখন তিনি চলে গেলেন, তখন তাঁর পকেটে হয়তো কয়েকটা পয়সাও ছিল না, কিন্তু তাঁর মনের সিন্দুকে ছিল কোটি কোটি মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর এক শোষণমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন। তাঁর কলম কেবল একটি লেখার সরঞ্জাম ছিল না, তা ছিল একটি কাস্তে—যা দিয়ে তিনি আগাছা উপড়ে সাম্যের বীজ বপন করতে চেয়েছিলেন।

 মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো মৃত ইতিহাস নন। তিনি আজও বেঁচে আছেন প্রতিটি মিছিলে, আর প্রতিটি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। তাঁর সাহিত্যের সেই লাল সূর্যের আলো আজও ম্লান হয়নি। আমরা হয়তো প্রতিদিন তাঁকে পড়ি না, কিন্তু যখনই আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠি, তখন অবচেতনভাবেই আমরা মানিকের সেই আগ্নেয়গিরিসদৃশ গদ্যের উত্তরাধিকার বহন করি। কাস্তে আর কলমের সেই যে মেলবন্ধন তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমলিন ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। হয়তো কোনো একদিন সেই সাম্যের পৃথিবী আসবে, যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে মানিক নিজের জীবন সঁপে দিয়েছিলেন। 

মানিকের সেই নির্মোহ দৃষ্টি আজ আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন। যেখানে কোনো রঙিন চশমা নেই, নেই কোনো মিথ্যা সান্ত্বনা। আছে কেবল কঠিন বাস্তব আর তার বুক চিরে বেরিয়ে আসা আগামীর স্বপ্ন। তিনি শিখিয়েছেন, অন্ধকারকে ভয় না পেয়ে তার চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে হয়। আর সেই লড়াইয়ের নামই হলো জীবন, আর সেই জীবনের সার্থক রূপকার হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, যতকাল পৃথিবীতে শোষণ থাকবে, ততকাল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাগুলো এক একটি ধারালো হাতিয়ার হয়ে আমাদের পথ দেখাবে। তাঁর সাহিত্যের এই অবিনশ্বর প্রদীপ কোনো ঝোড়ো হাওয়ায় নেভার নয়; কারণ তা জ্বলে এক অনন্ত বিশ্বাসের তলে।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১৫৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন