‘ব্যাডি কালচার’ ও জেন-জি: আধুনিকতার জয়গান নাকি শেকড়হীন আত্মপরিচয়ের সংকট
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৪২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে আমরা এমন এক প্রজন্মের বেড়ে ওঠা দেখছি, যাদের পৃথিবী আবর্তিত হয় স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চি জায়গাকে কেন্দ্র করে। এই প্রজন্মের কাছে ‘সৌন্দর্য’ কিংবা ‘স্মার্টনেস’-এর সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার বৈশ্বিক ট্রেন্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত একটি নাম হলো ‘ব্যাডি কালচার’ (Baddie Culture)। বাহ্যিক চাকচিক্য, সাহসী মেকআপ আর পশ্চিমা স্ট্রিট ফ্যাশনের এই সংমিশ্রণ বাংলাদেশের শহুরে তরুণীদের মাঝে এক নতুন ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
কিন্তু এই জৌলুসের আড়ালে সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক যে সংকট দানা বাঁধছে, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। ‘ব্যাডি’ সংস্কৃতির সমর্থকরা দাবি করেন, এটি নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এটি অনেক তরুণীকে বডি শেমিং বা গায়ের রঙের পুরোনো বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে অনেক তরুণী আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আত্মবিশ্বাস কি কেবল বাহ্যিক আবরণের ওপর দাঁড়িয়ে? যদি তাই হয়, তবে মেকআপের আস্তরণ বা ফিল্টারের আড়ালে ঢাকা পড়া আসল চেহারাটি যখন আয়নায় ধরা দেয়, তখন সেই আত্মবিশ্বাস কি ভেঙে পড়ে না?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা’। পশ্চিমা হিপ-হপ বা পপ কালচার থেকে উঠে আসা এই জীবনধারা আমাদের আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির বিনয় ও সরলতার ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যখন নিজেদের সংস্কৃতিকে ‘ব্যাকডেটেড’ মনে করে অন্যের পোশাক বা চালচলন অন্ধভাবে অনুকরণ করে, তখন তারা আসলে এক ধরনের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয় সংকটে ভোগে। তারা না হতে পারে পুরোপুরি পশ্চিমা, না থাকতে পারে পুরোপুরি দেশীয়।
‘ব্যাডি কালচার’ সরাসরি ভোগবাদকে (Consumerism) উসকে দিচ্ছে। দামী গ্যাজেট, নামী ব্র্যান্ডের প্রসাধনী আর আভিজাত্য প্রদর্শনের এই নেশা তরুণ সমাজকে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোরীদের জন্য এটি এক মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ‘নিখুঁত’ জীবন দেখে নিজের সাধারণ জীবনকে তুচ্ছ মনে করার এই প্রবণতা থেকে বাড়ছে বিষণ্ণতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
আধুনিকতা কোনো পোশাক বা সাজের নাম নয়, বরং তা মননের বিষয়। বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা দরজা-জানালা বন্ধ করে থাকতে পারি না, তবে বাইরের দমকা হাওয়ায় যেন নিজের বাতিটি নিভে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। জেন-জি তরুণদের এই ‘সাহসী’ হওয়ার বাসনা যদি মেধা, দেশপ্রেম এবং সৃজনশীলতার সাথে যুক্ত হয়, তবেই তা সার্থক হবে। কেবল স্ক্রিনের সামনে ‘ব্যাডি’ সেজে থাকার চেয়ে বাস্তব জীবনে একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ হয়ে ওঠাই এই প্রজন্মের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
১৬৩ বার পড়া হয়েছে