সর্বশেষ

মতামত

শিশুরা কী শিখছে—একটি বিকেলের অভিজ্ঞতা ও আমাদের দায়

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:০৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
গড়াই নদীর বালুচরে একদল শিশু ফুটবল খেলছে—দৃশ্যটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় নিখাদ আনন্দের এক মুহুর্ত। খোলা আকাশ, দক্ষিণের হাওয়া, নদীর ধারে বিকেলের আলো—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির এক শান্ত সুর। এমন দৃশ্যের টানেই মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়ানোটা আমার কাছে একধরনের দৈনন্দিন অভ্যাস। কখনো একা, কখনো সঙ্গী হয়ে থাকেন চমন ভাই। আমাদের দু`জনেরই এক ধরনের কৌতূহল—নতুন জায়গা দেখা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের জীবনযাপন ও ভাবনা বোঝার চেষ্টা করা।

১৯ এপ্রিল, সোমবার বিকেলের পর আমরা পৌঁছাই চরআগ্রাকুন্ডা এলাকায়। ব্রিজ পার হওয়ার সময়ই চোখে পড়ে বালির চরে শিশুদের খেলাধুলা। সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ ওদের সঙ্গেই সময় কাটাবো—দেখবো, শুনবো, বুঝবো। কাছে যেতেই ওদের কৌতূহলী দৃষ্টি টের পেলাম। স্কুটি রেখে হাঁটতে শুরু করতেই এক শিশু সতর্ক করল—“ওদিক দিয়ে ওঠা যাবে না। সামনে এগিয়ে গিয়ে ওঠার রাস্তা আছে” বুঝলাম, ওরা আমাদের খেয়াল করছে। আমরা নদীর খাড়া পাড়ির মাঝে বড় একটা গর্তের রহস্য দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে বড় গর্তের মধ্যে ছোট ছোট মাটির গর্তে শালিক পাখির বাড়ি। কথন তারা কেউই বাড়িতে ছিল না। আমরা ফাঁকা বাড়িতে উকি ঝুকি দিয়ে ফিরতেই ------
কিছুটা দূরে বসে থাকা এক নারী জানতে চাইলেন, কাউকে খুঁজছি কি না। আমরা বললাম, না—শুধু এই সুন্দর পরিবেশটা উপভোগ করতে এসেছি। তিনি বসতে বললেন। আমরা একটু উঁচু ভিটায় বসে পড়লাম—সেখান থেকে শিশুদের খেলা দেখা যেন দারুণ এক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির হাওয়ায় মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু ! খেলা শুরু হতেই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এলো।
শিশুরা খেলতে খেলতে একে অপরের সঙ্গে যে ভাষা ব্যবহার করছিল, তা ছিল চরম অশ্লীল ও অশোভন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই একই ভাষার পুনরাবৃত্তি। আমরা বিস্মিত, হতবাক। খেলা শেষে তারা দল বেঁধে নদীতে গোসল করতে গেল। আমরা কথা বলার চেষ্টা করলাম। জানলাম, কেউ মাদরাসায় পড়ে, কেউ স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থী।
ফিরে আসার পরও সেই অশ্লীল শব্দগুলো কানে বাজতে থাকে। সুন্দর পরিবেশ, নিষ্পাপ মুখ—কিন্তু ভাষা ও আচরণে এমন বিচ্যুতি! তখনই প্রশ্ন জাগে—এই শিশুরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ ! তাহলে তাদের এই অবস্থার দায় কার ?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, শিক্ষক আছেন, পরিবার আছে—তারপরও কেন এমন হচ্ছে? শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান কি যথেষ্ট? নাকি আমরা নৈতিক ও মানবিক শিক্ষাকে অবহেলা করছি?
বাস্তবতা হলো, শিশুরা যা দেখে, যা শোনে, তাই শিখে। পরিবার, সমাজ, বন্ধুমহল—সব মিলিয়েই তাদের চরিত্র গড়ে ওঠে। যদি সেই পরিবেশে অশ্লীলতা, অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা থাকে, তবে শিশুরাও তা আত্মস্থ করবে—এটাই স্বাভাবিক।এখানে সবারই দায় আছে।
অভিভাবকদের উচিত সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী শিখছে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা। শিক্ষকরা শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুদের নৈতিকতা, ভদ্রতা ও মূল্যবোধ শেখানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দেবেন। আর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হলো—এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করা, যাতে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়।
শিশুদের এই অবস্থা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি বৃহত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। এখনই যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে এর ফল ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হতে পারে।
একটি বিকেলের এই ছোট অভিজ্ঞতা তাই বড় এক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে আসলে কী শিখাচ্ছি?
 

লেখক : সাংবাদিক
 

১২৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন