সর্বশেষ

মতামত

'মব' সৃষ্টিতে তৌহিদী জনতা : নেপথ্য উদ্দেশ্য কি?

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:১০ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০২৪এর ৫ আগস্ট'র বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে 'তৌহিদী জনতা' বা 'বিক্ষুব্ধ মুসল্লি' ব্যানারে মব (উত্তেজিত জনতা) বা মব জাস্টিসের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এই ব্যানারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাজার, এমনকি গণমাধ্যমের ওপর হামলার দৃশ্যও দেখা গেছে। প্রশ্ন হলো 'তৌহিদী জনতা' আসলে কারা ? প্রকৃত অর্থে 'তৌহিদী জনতা' অর্থ একত্ববাদী জনগোষ্ঠী, যা বাংলাদেশে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়, বরং কোনো বিশেষ ইস্যুতে বা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়া বিক্ষুব্ধ মুসলিম গোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষের একটি ব্যানারের নাম। তারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষাকারী হিসেবে দাবি করে এবং প্রায়শই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মাজার, বা নারী তারকাদের অংশগ্রহণে বাধা প্রদান করে।
তারা বিভিন্ন স্থানে নারীকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান পণ্ড, মাজারে ভাঙচুর, এবং অনেক ক্ষেত্রে থানা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিসের নামে ভাঙচুর বা দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছে।

তৌহিদী জনতার মবের নেপথ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো একক সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের নাম সরাসরি না আসলেও, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে কিছু ধরণ লক্ষ্য করা গেছে। উগ্রবাদী/কট্টরপন্থী গোষ্ঠী: স্থানীয় পর্যায়ে কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী বা স্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা এসব মব সংগঠিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, ধর্ম ব্যবসায়ী একটি শ্রেণি হুজুগ সৃষ্টি করে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটায়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও প্রশাসনের আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে এই গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় স্বার্থ বা আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়িঘর দখলের লক্ষ্যেও এই 'তৌহিদী জনতা'র নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে জনতাকে একত্রিত করে হামলার পরিবেশ তৈরি করা হয়। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, শুধু তৌহিদী জনতা নয়, মব সৃষ্টিকারী সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 'তৌহিদী জনতা' কোনো একক সুসংগঠিত দল নয়, বরং এটি ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কিছু সুযোগসন্ধানী, কট্টরপন্থী এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি মব বা উগ্রবাদী অ্যাকশন টিম, যা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শুন্যতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু সময় মব বন্ধ থাকলেও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ভিন্ন মতের সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে নির্মম আঘাত, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের মূল্যবোধের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ।

সাম্প্রতিকালে বাংলাদেশের সমাজে নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং বিবেকবান মানুষের জন্য চরম লজ্জার কারণ হয়ে গেছে। অবলা পশু-পাখির প্রতি যে প্রকার নৃশংস আচরণ আমাদের সমাজ প্রত্যক্ষ করছে, তাহা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না। মাজারের পুকুরে জীবন্ত কুকুর কিংবা মুরগি ছুড়ে দিয়ে কুমিরের খাবারের দৃশ্য ধারণ করা এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করা বিকৃত চরিত্রের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই সবচাইতে বড় দুর্ভাগ্য। ভিন্ন মতের মানুষের প্রাণহরণ কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তি আছে বলে মনে করতে পারি না। তবুও আমাদের সমাজে এমন ধরনের ঘটনার ঘটলেও কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মবের মাধ্যমে খুনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফলাফল নয়; এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ (ইনগ্রুপ বায়াস) বা ‘শ্রেণী দ্বন্দ্ব’ মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে। অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়শই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে।

আজকের প্রজচন্মের মনে কি প্রশ্ন জাগতে পারে, ম'ব সৃষ্টি করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভা'ঙ'চুর: আল্লাহ কি খুশি হন? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মানুষের আত্মিক আশ্রয়, সম্প্রীতি ও মূল্যবোধের কেন্দ্র। কিন্তু যখন গুজব বা উদ্দেশ্যমূলক উস্কানিতে ম/ব তৈরি করে এসব স্থাপনা (রওজা ও মাজার) হা'ম'লা হয়, তখন শুধু ইট-পাথর ভাঙে না, ভেঙে যায় সমাজের বিশ্বাস আর সহাবস্থানের ভিত্তি। আগে ম'ব হতো মাঠের গু'জবে, এখন হয় স্ক্রিনের গু'জবে। কয়েকটা কমন প্যাটার্ন: মিথ্যা অপবাদ ও বানোয়াট অভিযোগ: কারো নামে ‘ধর্ম অবমাননা করেছে’ বলে পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনো প্রমাণ নেই, যাচাই নেই, কিন্তু শেয়ার লাখে চলে যায়। ফেইসবুক-ইউটিউবে মিথ্যাচার: ফেক আইডি বা পেজ থেকে উদ্দেশ্যমূলক পোস্ট, কমেন্টে ‘ভাইরাল করুন’ লিখে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল। ভিডিও কাটপিস ও এডিট স'ন্ত্রা'স: ১০ মিনিটের বক্তব্য থেকে ১৫ সেকেন্ড কেটে নেওয়া হয়। আগের কথা পরে, পরের কথা আগে বসিয়ে এমনভাবে এডিট করা হয় যেন শ্রোতা বক্তাকে ভুল বোঝে, ঘৃণা করে। কনটেক্সট গায়েব, ক্যাপশন হয় উ'স্কা'নি'মূলক। একই মিথ্যা শত শত আইডি থেকে একসাথে পোস্ট করা হয়। সাধারণ মানুষ ভাবে ‘এতজন বলছে, তাহলে সত্যিই হবে’। লাইভে এসে উ'স্কা'নি: ঘটনার সময় লাইভ করে ‘ভাইসব চলে আসুন, আমাদের ধর্ম গেল’ বলে মব ডেকে আনা হয়। পুলিশ আসার আগেই আ'গু'ন লাগিয়ে দেওয়া হয়, লুটপার করা হয়।

ইসলাম অন্য ধর্মের উপাসনালয় রক্ষার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত আশ্রম, গির্জা, উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ।” (সূরা হজ্জ ২২:৪০) মহা নবী রাসূল (সাঃ) নাজরানের খ্রিস্টানদের মসজিদে নববীতে উপাসনার সুযোগ দিয়েছিলেন। বিদায় হজ্জে বলেছেন: “তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য হারাম।” আর গুজব ছড়ানো প্রসঙ্গে কোরআন বলছে: "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে না হয়।" (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)

আর এই বিষয়ে তাসাউফের শিক্ষা হলো : তাসাউফ বলে, ‘খালকের সাথে সদাচরণ খালেকের ইবাদত’। গাউসল আজম হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলতেন, “যার অন্তরে হিংসা আছে, তার অন্তরে আল্লাহ নেই।” মব মানে নফসের গোলামি, আধ্যাত্মিকতার মৃত্যু।" করণীয় হলো :

কুষ্টিয়া অঞ্চলের সুফি দরবেশ শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আসলে কি শিক্ষা দেয় আমাদের। ভিন্ন মতের একজন মানুষকে পিটিয়ে, পুড়িয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই মতপার্থক্য, বিশ্বাস বা বিরোধের গ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। সভ্য সমাজে মতবিরোধ থাকবে, চিন্তার ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু তার সমাধান হতে হবে সংলাপ, যুক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে, আলোচনার মাধ্যমে। যেখানে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, সেখানে শুধু মাত্র একটি প্রাণই নিভে যায় না, নিভে যায় সমাজের বিবেক ও মানবতার আলো। কুষ্টিয়ার এই ঘটনা আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাও তুলে ধরে। আমরা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি, যেখানে গুজব, উসকানি ও অজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অর্ধসত্য কিংবা মিথ্যা তথ্য অনেক সময় মানুষের যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, পরিণত হয় ক্ষুব্ধ জনতায়,যারা মুহূর্তের আবেগে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেয়।

কথিত ‘তৌহিদী জনতা! আপনাদের মনে রাখতে হবে, দেড় দশক পর শান্তিতে ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনের সুযোগ পেয়েছেন। আপনাদের আহাম্মকি কিংবা উগ্রতা সে শান্তি বিনষ্টের কারণ হতে যাচ্ছে। জুলুম করা থেকে বিরত থাকেন, নইলে আপনাদের ওপর জুলুম অবধারিত হবে। ...........জুলুম করবেন না, জুলুমের শিকারও হবেন না। এটাই আপনাদের কাছে অনুরোধ!’ বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক কাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়ে কেউ কখনও মাজার ভাঙেনি। ভিন্ন মতের কোন সূফীকে হত্যা করা হয় নাই। এবার ঘোষণা দিয়ে আক্রমণ হয়েছে। অনেক জায়গায় একাধিকবার আক্রমণ হয়েছে এবং শাহপরাণে হামলায় একজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। এসব ঘটনার দায়ভার ক্ষমতাসীন সরকার এড়াতে পারে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব হামলার পেছনে যেমন ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক দ্বন্দ্ব-বিতর্ক রয়েছে; তেমনি বিভিন্ন শক্তি নিজেদের স্বার্থে এতে যুক্ত থাকতে পারে। বিগত সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্বলতা, সব সিদ্ধান্ত ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার ফলেও এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকারও কি অতিতের সরকারের মত নিরব ভূমিকা পালন করবে কুষ্টিয়ার ঘটনায় ? হামলাকারীরা বুঝতে পারছে না, নাকি বুঝে শুনে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য করছে তাও ভাবনাতে আনতে হবে। তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও অস্থিতিশীল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফকির লালন, খালেক দেওয়ান, আব্দুল হালিম, রাধারমণ, আরকুম শাহসহ বিভিন্ন ফকির, দরবেশ, পীর, মুরশিদের গান শুনলে দেখা যাবে যে, সেখানে ধর্মতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক জিজ্ঞাসাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। যে কারণে স্বভাবতই মানুষ এতে আকৃষ্ট হয়। এই তত্ত্বগুলো দাঁড় করানোর মধ্য দিয়ে যে নতুন চিন্তা হাজির হয়, তার সঙ্গে কথিত পরকালবাদীদের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, বিশেষত যারা ধর্ম বলতে পরকালকেই বোঝে। তারা আক্রমণের শুরুতে গাঁজার কথা বলে, অথবা জমি নিয়ে বা আধিপত্য নিয়ে মারধর কিংবা দানের বাক্স কার কাছে আছে, এসব দ্বন্দ্ব এসে হাজির হয়। এটা বড় কোনো বিষয় ছিল না। তবে এখন এটিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। কারণ, রাষ্ট্র এখন খুবই দুর্বল। সেই সঙ্গে মাজার প্রশ্নে রাষ্ট্রের কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই, রাষ্ট্র কীভাবে মাজার রক্ষা করবে, তা নিয়ে ফৌজদারি ব্যবস্থা ছাড়া পরিষ্কার কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না।

ধর্ম মানুষকে শান্তির পথ দেখায়, ধ্বংসের নয়। কাটপিস ভিডিও আর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মব বানানো ইসলাম, মানবতা ও রাষ্ট্রীয় আইন—তিন জায়গাতেই হারাম ও শাস্তিযোগ্য। যারা ধর্মের লেবাসকে পুঁজি করে তৌহিদ জনতার আড়ালে লুটপাট করছে তাদের রুখে দিতে হবে এবং আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে। আপনার একটা শেয়ার একটা আগুন লাগাতে পারে, আবার আপনার একটা যাচাই একটা আগুন নেভাতে পারে। সিদ্ধান্ত আপনার। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সবাই আইনের অধীন। অন্যকথায় আইনের চোখে সবাই সমান। আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমান অধিকারপ্রাপ্তির সুযোগকে আইনের শাসন বলে। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান- এর অর্থ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-পেশা নির্বিশেষে আইনের সমান আশ্রয় লাভ করা। এর ফলে ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল সবাই সমান অধিকার লাভ করে। আইনের শাসনের প্রাধান্য থাকলে সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকবে এবং জনগণ আইনের বিধান মেনে চলবে। আইনের শাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। আইন না থাকলে সমাজে অনাচার অরাজকতা সৃষ্টি হয়। আইনের শাসন অনুপস্থিত থাকলে নাগরিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সামাজিক মূল্যবোধ, সাম্য কিছুই থাকে না। সাম্য, স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের শাসন অত্যাবশ্যক।

বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু, কুষ্টিয়ার সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার পর আশ্বস্থ হবার পরিবর্তে হতাশ হচ্ছি। শামীম আল জাহাঙ্গীরের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার থেকেই মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে,মানুষকে সম্মান করা, ভিন্ন মতকে সহ্য করা এবং সহানুভূতিশীল হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ‘মব-জাস্টিস’ গ্রহণযোগ্য নয় এবং কোনো সমাধানও আনবে না। আইনের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আইনের মাধ্যমেই সব হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। এ অবস্থা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে বহুদলীয়, বহুমতের গণতান্ত্রিক চেতনা ও ‘জুলাই-আগস্ট’ বিপ্লবের অপমৃত্যু ঘটতে বাধ্য। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং জনমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মব কালচার বা অনুরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হলে, সমাজ হতে এই অপসংস্কৃতির অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে না।


লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক।

১৩২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন