চার মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১.৫১ শতাংশ
সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ ৯:৩৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আয় বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) দেশটিতে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়েছে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভোক্তাদের চাহিদার পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার প্রতিফলন।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ প্রবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পণ্যের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার প্রমাণ।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য। এত বড় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন দেশের রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।’
হাসান আরিফের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা সময়মতো পণ্য সরবরাহ, গুণগত মান উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
বিকল্প বাজারেও বাড়ছে রপ্তানি
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নতুন ও বিকল্প বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও তুলনামূলক কম প্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি সম্প্রসারণ দেশের বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বড় বাজারগুলোর মধ্যে তুরস্কে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশটিতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এ সময়ে তুরস্কে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৯ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১৫ কোটি ৯৯ লাখ ২০ হাজার ডলার।
এ ছাড়া সৌদি আরবে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ইউরোপের দেশ স্পেনেও দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
হাসান আরিফ বলেন, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি উদীয়মান বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। এতে বাজারের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি বড় বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, রপ্তানি বাজারের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন কিংবা পণ্যের চাহিদা কমে গেলে বিকল্প বাজার থাকায় সেই প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।
যুক্তরাজ্য ও জার্মানি শীর্ষ বাজারের তালিকায়
যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় গন্তব্য যুক্তরাজ্য ও জার্মানি। জুলাই-অক্টোবর সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ডলার। দেশটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
একই সময়ে জার্মানিতে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ডলার। দেশটি রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। এরপর রয়েছে স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো বড় বাজার থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে। ফলে এসব বাজারে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজার অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অক্টোবরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪.৩৯ শতাংশ
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরুতেও রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রয়েছে। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই মাসে এ আয় ছিল ৬৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।
অক্টোবরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯৯ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় তুলনামূলক সুবিধাজনক। এ কারণে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে এবং রপ্তানি আয়ও বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘শুল্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।’
মাহমুদ হাসান খান আরও জানান, বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার বা তা এড়ানোর সুযোগ খুঁজতে বিজিএমইএ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক এড়ানোর বিষয়ে আমরা ইউএসটিআরের সঙ্গে আলোচনা ও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। ধারাবাহিক সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যাবে বলে আমরা আশাবাদী।’
রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ, গুণগত মান উন্নয়ন, সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকেরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বড় বাজারে অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা ও ভোক্তাদের পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
ইপিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান আরিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রচলিত বড় বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়ার কারণে আগামী মাসগুলোতেও ইতিবাচক ধারা বজায় থাকবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বড় বাজারে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি তুরস্ক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিকল্প বাজারেও প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
১০৯ বার পড়া হয়েছে