সর্বশেষ

সারাদেশ

কুষ্টিয়ায় ৭ হাজার প্লান্টে জৈব সার উৎপাদন, বাড়ছে নারীদের আয়

নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া
নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া

সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ ১০:০৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
রাসায়নিক সারের সংকট ও বাড়তি খরচের মধ্যে বিকল্প সম্ভাবনা তৈরি করেছে কুষ্টিয়ার জৈব সার উৎপাদন উদ্যোগ। জেলার কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় কৃষকদের বাড়িতে গড়ে উঠেছে ৭ হাজার ৫১টি জৈব সার উৎপাদন প্লান্ট। এসব প্লান্টে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি সার। কৃষিজমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ায় বাড়ছে কৃষকদের আগ্রহ। একই সঙ্গে গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি হয়ে উঠছে বাড়তি আয়ের উৎস।

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলা কুষ্টিয়ায় দিন দিন বাড়ছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার। জেলার অধিকাংশ জমিতে বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল উৎপাদন হয়। ফলে সারের চাহিদাও বেশি। অন্যদিকে, রাসায়নিক সারের বাড়তি দাম ও সংকটে বিপাকে পড়ছেন কৃষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে গোবর, কেঁচো ও বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করে নিজ বাড়িতেই সার উৎপাদনে উদ্যোগী হয়েছেন তাঁরা।

কৃষকদের বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট প্লান্টে তৈরি হচ্ছে কেঁচো কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্ট সার। জমিতে এ সার ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ায় ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারের উদ্যোগ।

সদর উপজেলার বিত্তিপাড়া গ্রামের জৈব সার উৎপাদনকারী মনিরা জানান, জৈব সার ব্যবহারে ফসলের ভালো ফলন হচ্ছে। এতে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কমানো সম্ভব হচ্ছে। তাঁদের গ্রামের কৃষকেরা আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি চাষের পাশাপাশি ধান, ভুট্টা, শসা ও অন্যান্য ফসলের জমিতেও উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহার করছেন তাঁরা।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বর্তমানে ৭ হাজার ৫১টি প্লান্টে জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে ৪৬২টি প্লান্ট। বাকি ৬ হাজার ৫৮৯টি প্লান্ট গড়ে তুলেছেন কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগে।

এসব প্লান্ট থেকে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈব সার। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই উৎপাদন উপজেলার মোট সারের চাহিদার প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পূরণ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, গোবর, কেঁচো, ফসলের অবশিষ্টাংশ, খড়কুটো ও পচনশীল উদ্ভিদজাত বর্জ্য ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। কৃষকেরা বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট কারখানার মতো প্লান্ট গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি বাড়িতে প্রায় ১০টি চাকের মাধ্যমে উৎপাদন করা হচ্ছে সার। এসব চাক থেকে মাসে ১০ থেকে ১২ মণ সার পাওয়া যায় বলে জানান উদ্যোক্তারা।

কিছু বাড়িতে সরকারি উদ্যোগে ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনের প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লান্ট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক কৃষক নিজেদের উদ্যোগে সার উৎপাদন শুরু করেছেন।

উজানগ্রাম, আব্দালপুর ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নে জৈব সার উৎপাদনে যুক্ত উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ নারী। বাড়ির দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি তাঁরা কেঁচো ও গোবর দিয়ে সার তৈরি করছেন। নিজেদের জমিতে এই সার ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি সার বিক্রি করে আয় করছেন তাঁরা।

উদ্যোক্তারা জানান, প্রতি কেজি জৈব সার প্রায় ১৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন। আশপাশের গ্রামের মানুষ তাঁদের কাছ থেকে সার ও কেঁচো কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার বিক্রি করে অনেক পরিবার মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছে। এই অর্থ তাঁরা নিজেদের প্রয়োজন, সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলের পোশাক কেনা এবং পরিবারের বিভিন্ন কাজে ব্যয় করছেন। কেউ কেউ নিজের পছন্দের জিনিসও কিনছেন। সার উৎপাদনে তুলনামূলক কম শ্রম ও খরচ হওয়ায় এ কাজে নারীদের আগ্রহ বাড়ছে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ কৃষকদের বাড়িতে বাড়িতে জৈব সার উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করছে। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, কৃষকের বাড়িতে জৈব সার উৎপাদন সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে তিনি ও তাঁর দলের সদস্যরা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, একজন কৃষকের হাত ধরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি কৃষি বিভাগের জন্য বড় সাফল্য।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় বছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন। এ ছাড়া নন-ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেট্রিক টন। বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সারের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে বছরে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে।

উদ্যোগটির প্রাথমিক পর্যায়েই এলাকার মোট সারের চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।

জৈব সার উৎপাদনের পদ্ধতি উন্নত করা, মান নিয়ন্ত্রণ, উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

কুষ্টিয়ার এই উদ্যোগকে দেশের অন্যান্য কৃষিপ্রধান অঞ্চলের জন্যও সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জৈব সার মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, সার উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ এবং মানসম্মত জৈব সার বাজারজাত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকিতে উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং সারের পুষ্টিমান পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষক, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, কৃষকদের মধ্যে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারের আগ্রহ বাড়া ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এ কার্যক্রমকে টেকসই করতে প্রশিক্ষণ, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও রাসায়নিক সারের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে কুষ্টিয়ার জৈব সার উৎপাদন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দিন দিন কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জৈব সার উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করছেন কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত সরকারি সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে কুষ্টিয়ার কৃষকদের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের জৈব সার উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব কৃষির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

১১৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০