বাইন্যান্সে ২০ মিনিটের সাইবার হামলায় ৬৩০ কোটি ডলার লুট
রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ ৯:১৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময়মাধ্যম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। মাত্র ২০ মিনিটের অভিযানে ব্যবহারকারীদের লেনদেনে ব্যবহৃত ওয়ালেট থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। ঘটনাটিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ চুরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হামলাকারীরা শুধু ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়নি, বাইন্যান্সের লেনদেন অনুমোদনের কাজে ব্যবহৃত ডিজিটাল স্বাক্ষর অবকাঠামোতেও প্রবেশ করেছিল। চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক জব্দ করা সম্ভব হলেও বাকি অর্থের বড় অংশের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
ব্লকচেইনের লেনদেন বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের নিয়মিত লেনদেন পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ওয়ালেট থেকেই বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুরুতে একটি হ্যাক হওয়া ল্যাপটপের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করেছিল বাইন্যান্স। তবে পরবর্তী তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থার আরও কিছু দুর্বলতা সামনে আসে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
গ্রাহকদের সম্পদের সুরক্ষায় বাইন্যান্সের নিজস্ব একটি নিরাপত্তা তহবিল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণের জন্য ওই তহবিলে ১০০ কোটি ডলারের বিটকয়েন রাখা আছে। বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (কো-সিইও) রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, সাইবার হামলায় সৃষ্ট ক্ষতি ওই তহবিল ও কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ থেকে পূরণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, হ্যাকাররা বাইন্যান্সের ডিজিটাল লেনদেন অনুমোদনের অবকাঠামো বা ‘সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এর ফলে আক্রান্ত ওয়ালেট থেকে সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় তারা। ব্লকচেইনের তথ্য বলছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ৮টার কিছু পর হামলা শুরু হয়। পরবর্তী ২০ মিনিটেই তহবিলের বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হয়।
বেশ কয়েকটি মার্কিন ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এই হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের আগের সাইবার হামলার কৌশলগত মিল খুঁজে পেয়েছে। টিআরএম ল্যাবসের দাবি, গত বছর ক্রিপ্টো বিনিময়মাধ্যম বাইবিটে সংঘটিত হামলার সঙ্গে বাইন্যান্সের ঘটনার মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দায়ী করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
তবে বাইন্যান্সের কো-সিইও রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, তদন্তে এখনো হামলাকারীদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উত্তর কোরিয়া বরাবরই সাইবার হামলা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক ছিল স্টেবলকয়েন। টিথার, সার্কল, রিপল এবং ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সম্পদের একটি বড় অংশ জব্দ করেছে।
স্টেবলকয়েনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এর ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে নির্দিষ্ট ওয়ালেটে থাকা সম্পদ দূর থেকেই স্থগিত বা লেনদেনের অযোগ্য করে দিতে পারে। তবে সম্পদ জব্দ করা হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাইন্যান্সের কাছে ফেরত যায় না।
টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, চুরি হওয়া সম্পদের কিছু অংশ ইথার ধার নেওয়ার জামানত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখনো প্রায় ২৪০ কোটি ডলারের বিটকয়েন ও ইথার উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্লকচেইন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান চেইনআর্গোসের জেনারেল কাউন্সেল প্যাট্রিক তান বলেন, বিটকয়েন ও ইথার কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি ইস্যু করে না। ফলে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব সম্পদ স্থগিত করা সম্ভব নয়। হ্যাকাররা এসব সম্পদ নিয়ন্ত্রিত বিনিময়মাধ্যম বা ব্রোকার প্রতিষ্ঠানে পাঠালে কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সংশ্লিষ্ট ওয়ালেটের গোপন চাবি উদ্ধার করতে পারলে সেগুলো জব্দ করা সম্ভব।
ডিজিটাল সম্পদ চুরির ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে বাইন্যান্সে এই হামলা ক্রিপ্টো বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
সর্বশেষ এ ঘটনা ক্রিপ্টো বাজারের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শুক্রবার প্রধান প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম কমার পাশাপাশি স্টেবলকয়েনের সামগ্রিক বাজারমূল্যও হ্রাস পেয়েছে।
১২৮ বার পড়া হয়েছে