বিদ্রোহের অগ্নিবাঁশি: ‘বিষের বাঁশি’ ও নজরুলের কালজয়ী দ্রোহ
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশি’ শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও মানসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক কালজয়ী সাহিত্যিক দলিল। ১৯২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত এ গ্রন্থে বিদ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শক্তিশালী কাব্যভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। শতবর্ষ পেরিয়েও নজরুলের এই সৃষ্টি শোষিত মানুষের অধিকার, সত্যের পক্ষে অবস্থান এবং মানবমুক্তির সংগ্রামে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের নিরিখে শিল্পের যে শাশ্বত ও স্নিগ্ধ সংজ্ঞায়ন দীর্ঘকাল ধরে লালন করা হয়েছে, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশি’ সেই প্রথাগত ধারণায় এক আমূল ও বৈপ্লবিক চ্যুতি ঘটিয়েছে। ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে যখন এই কাব্যগ্রন্থটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে, তখন তা কেবল শব্দমালার আকর ছিল না; বরং তা ছিল পরাধীন ভারতবর্ষের ললাটে এক দীপ্ত অগ্নিচন্দনের তিলক। আজ ২০২৬ সালের এই ঊষালগ্নে দাঁড়িয়ে, যখন এই কালজয়ী সৃষ্টির শতবর্ষোত্তর কাল অতিক্রম করা হচ্ছে, তখন ‘বিষের বাঁশি’-র প্রাসঙ্গিকতা কেবল জাতীয়তাবাদের ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নেই; তা বিশ্বজনীন শোষণের বিরুদ্ধে এক সার্বভৌম আখ্যান হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। নজরুলের এই কাব্যসত্তার কেন্দ্রে যে বাঁশিটি বিদ্যমান, তা যমুনাতীরের সেই চিরায়ত বিরহী বংশীধ্বনি নয়, বরং তা এক মহাপ্রলয়ের সংকেতবাহী রণতূর্য। এই বাঁশি সুর নয়, বরং হলাহল উগরে দেয় যে বিষের দহনে ভস্মীভূত হয় দাসত্বের জীর্ণতা। পরাধীনতার যে কৃষ্ণগহ্বরে তৎকালীন বাঙালি জাতি নিমজ্জিত ছিল, সেখানে নজরুল আবির্ভূত হয়ে শব্দের তলোয়ারে ছিন্নভিন্ন করেছেন ঔপনিবেশিক মায়ার জাল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ধূসর ক্যানভাসের দিকে তাকালে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের উত্তরকালে এক স্থবির রাজনৈতিক পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়। গান্ধীজীর আন্দোলনের স্তিমিত হয়ে আসা এবং বিপ্লবীদের মধ্যে এক ধরনের দিশাহীনতা যখন সমাজমানসকে আচ্ছন্ন করেছিল, ঠিক সেই সময়ে হুগলি জেলে বন্দি নজরুল নিজের হৃদয়ের তপ্ত রক্ত দিয়ে রচনা করছিলেন এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ‘বিষের বাঁশি’ কাব্যের জন্মলগ্নটি তাই নিছক সাহিত্যচর্চার ফসল নয়, তা ছিল এক কারারুদ্ধ আত্মার আর্তনাদ ও বীরোচিত আস্ফালন। ফরাসি দার্শনিক ফ্রাঞ্জ ফ্যানন তাঁর উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্লেষণে যে মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির কথা বলেছিলেন, নজরুল যেন সেই তত্ত্বের জন্মের বহু আগেই ভারতবর্ষের মাটিতে ‘বিষের বাঁশি’-র মাধ্যমে তার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কেবল শারীরিক সংগ্রাম নয়, বরং মানসিক দাসত্ব মোচনের যে কঠিন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন ছিল, নজরুলের কাব্যে তা এক নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক রূপ ধারণ করেছে।
গ্রন্থটির নামকরণের দিকে একটু নিবিড়ভাবে তাকালেই এর ভেতরের গভীর দার্শনিক দ্বন্দ্বটি চোখে পড়ে। বাঁশি চিরকালই ভারতীয় ঐতিহ্যে প্রেম, মিলন আর সৃজনের প্রতীক। কিন্তু নজরুল সেই চিরচেনা বাঁশিতে ভরে দিলেন ‘বিষ’। এ কোন বিষ? এ বিষ কেবল মৃত্যু বা হলাহল নয়। এ হলো শোষকের বিরুদ্ধে প্রজ্বলিত ক্ষোভের নীল শিখা। যে বাঁশি একদা মিলনের গীত গাইত, পরাধীনতার গ্লানিতে তা আজ প্রলয়ের রাগিণী বাজাচ্ছে। ফরাসি দার্শনিকদের অস্তিত্ববাদী চিন্তায় যেমন মানুষ তার চরম সংকটের মুখে নিজের সত্তাকে পুনরাবিষ্কার করে এক বিদ্রোহী রূপে, নজরুলও যেন ঠিক সেই কাজটিই করলেন বাংলার মাটিতে। তিনি সুন্দরের ধ্বংস কামনা করেননি কখনো। তিনি চেয়েছেন অসুন্দরের বিনাশ, যাতে নতুনের আবাহন ঘটতে পারে। রুদ্রের তাণ্ডব যেমন সৃষ্টির পূর্বশর্ত, তেমনি ‘বিষের বাঁশি’র সুরও স্বাধীনতার এক অপরিহার্য গর্জন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯২৩ থেকে ১৯২৪ সালের সময়টা নজরুলের জীবনের এক চরম অস্থির আর সৃষ্টিশীল অধ্যায়। হুগলি জেলে অনশনরত অবস্থায় তিনি যে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছেন, তারই শৈল্পিক প্রতিফলন ঘটেছে এই কাব্যের পাতায় পাতায়। এই কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধ বা ‘কৈফিয়ত’-এ নজরুল নিজেই এক অদ্ভুত কৌতুক আর অভিমানের সুরে লিখেছেন
"আইন-রূপ ‘আয়ান ঘোষ’ যতক্ষণ তার বাঁশ উঁচিয়ে আছে, ততক্ষণ বাঁশিতে তথাকথিত ‘বিদ্রোহ’-রাধার নাম না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ওই ঘোষের পোর বাঁশ বাঁশির চেয়ে অনেক শক্ত। বাঁশে ও বাঁশিতে বাঁশাবাঁশি লাগলে বাঁশিরই ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা, বাঁশি হচ্ছে সুরের, আর বাঁশ হচ্ছে অসুরের।"
কী অদ্ভুত এক পরিহাস! নিজের নিদারুণ যন্ত্রণাকে, ব্রিটিশের পাশবিক অত্যাচারকে তিনি লোকজ এক রূপকের মোড়কে এমনভাবে মুড়ে দিলেন, যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক জমাট রক্তবিন্দু। এখানেই তিনি কেবল একজন ভাববাদী কবি থাকেন না, হয়ে ওঠেন এক তীব্র শ্রেণিসচেতন শিল্পী। তিনি মর্মে মর্মে বুঝেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ মানে কেবল মাটির দখলদারি নয়। এটি মানুষের মনের ওপর এক অমোঘ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। প্রাচ্যের তথাকথিত ‘শান্ত’, ‘নিরীহ’ ও ‘আধ্যাত্মিক’ প্রতিচ্ছবিকে চুরমার করে দিয়ে তিনি এক উগ্র, তেজোদীপ্ত নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন।
‘শিকল-পরার গান’ কবিতাটিতে একবার চোখ রাখা যাক।
"এই শিকল-পরা ছল আমাদের এই শিকল-পরা ছল।
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥"
এখানে শিকল তো কেবল হাতের বা পায়ের লোহার বেড়ি নয়। এ হলো এক মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব। নজরুল এই কবিতায় দাসত্বকে রীতিমতো উপহাস করেছেন। ঔপনিবেশিক শক্তির দণ্ডকে তিনি পেশি দিয়ে নয়, পর্যবসিত করেছেন নৈতিক পরাজয়ে। অত্যাচারীর চোখে চোখ রেখে হেসে ওঠার চেয়ে বড় মানসিক আঘাত আর কী হতে পারে?
‘বিষের বাঁশি’র শব্দচয়ন আর অলংকার প্রয়োগের দিকে তাকালে এক অসামান্য সমন্বয়বাদী বা সিনক্রেটিক রূপ চোখে পড়ে। তিনি একাধারে পুরাণের রুদ্র, চণ্ডী, শিবকে আবাহন করেছেন, আবার অন্যদিকে ইসলামের বীরত্বব্যঞ্জক ইতিহাস ও অনুষঙ্গ ইসরাফিলের শিঙা, জিলফিকার কিংবা ফাতেহা-ই-দোয়াজদহমের বীরত্বকে এক মোহনায় মিলিয়ে দিয়েছেন। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক সম্প্রীতির স্লোগান ছিল না। এটি ছিল তাঁর অন্তরের এক স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাস। ব্রিটিশরা যখন বিভাজন আর শাসনের নীতি প্রয়োগ করে হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যে ফাটল ধরাতে ব্যস্ত, নজরুল তখন দুই সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক বীরত্বকে এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করালেন। ‘উদ্বোধন’ কবিতায় তিনি ডাক দিচ্ছেন
"বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও ভীম বজ্র-বিষাণে
দুর্জয় মহা-আহ্বান তব, বাজাও!"
আবার ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’ কবিতায় তিনি গাইছেন
"ওরে মুসলিম, খর্জুর-শিষে তোরা সাজ!
করে তসলিম হর কুর্নিশে শোর আওয়াজ..."
এই যে বৈচিত্র্যের মাঝে এক অদ্ভুত ঐক্যের সুর, এটিই নজরুলকে সমকালীন আর সকল কবি থেকে একেবারে আলাদা করে চেনা যায়। তিনি হিন্দু তরুণের চিত্তে যেমন শিহরণ জাগান, মুসলিম তরুণের রক্তেও তেমনি বিপ্লবের নেশা ধরিয়ে দেন। তৎসম শব্দের গাম্ভীর্যের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের যে বীরত্বব্যঞ্জক প্রয়োগ তাঁর কবিতায় দেখা যায়, তা বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে এক নতুন মাত্রা তো দিয়েইছে, পাশাপাশি ছন্দের ঝংকারে পাঠকের রক্তে এক অবর্ণনীয় উত্তাপ তৈরি করে। এ যেন নিছক পাঠ্য নয়; রাজপথের মিছিলে, অন্ধকার কারাকক্ষে গাওয়া এক যৌথ রণসংগীত।
ব্রিটিশ সরকার কেন ‘বিষের বাঁশি’কে নিষিদ্ধ করেছিল? এর উত্তর খুব সহজ। এই কাব্যগ্রন্থ কেবল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের শোভা বাড়ায়নি। এটি পৌঁছে গিয়েছিল জেলের ভেতরে, সৈনিকদের ব্যারাকে, আর ধুলোমাখা রাজপথের মিছিলে। ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে কাব্যটি প্রকাশিত হওয়ার অল্পকাল পরেই ব্রিটিশ সরকার এটি বাজেয়াপ্ত করে। কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। নিষিদ্ধ সাহিত্যের একটি নিজস্ব মনস্তত্ত্ব রয়েছে। যা দমিত হয়, তা যেন আরও অধিক শক্তিতে বিকশিত হতে চায়। ‘বিষের বাঁশি’র হাতে লেখা পাতাগুলো তখন গোপনে বিপ্লবীদের হাতে হাতে ঘুরত। অত্যাচারী শাসক সবসময়ই জ্ঞানের সেই উৎসকে রোধ করতে চায়, যা তাদের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেয়। কিন্তু নজরুলের বাণী ততদিনে বাংলার মাটি আর মানুষের মজ্জায় মিশে গেছে।
কাব্যগ্রন্থটির ভেতরে ‘চরকার গান’ নামের একটি কবিতা আছে। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের মূল দর্শনকে তিনি কী আশ্চর্য দক্ষতায় কবিতার ছন্দে মুড়িয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সঞ্চারিত করেছিলেন!
"ঘোর রে ঘোর ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর
ওই স্বরাজ-রথের আগমনী শুনি চাকার শব্দে তোর॥"
নজরুলের কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল একটা মানচিত্র বা ভূখণ্ডের মুক্তি ছিল না। চরকার সুতোয় তিনি মানুষের আত্মার মুক্তি, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি আর শত বছরের জড়তা থেকে মুক্তির স্বপ্ন বুনছিলেন। রাজনৈতিক একটি হাতিয়ার তাঁর হাতে পড়ে হয়ে উঠল এক আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যম।
এই কাব্যের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দিকটি হলো তারুণ্যের জয়গান। জরাগ্রস্ত, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজকে কেবল তারুণ্যের প্রলয়ংকরী শক্তিই যে নতুন জীবন দিতে পারে, এ কথা নজরুল গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। পুরনো প্রথা আর পচে যাওয়া নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি এক নতুন, শক্তিশালী সামষ্টিক তারুণ্যের কল্পনা করেছিলেন। ‘অগ্নি-বীণা’র পর ‘বিষের বাঁশি’তে তাঁর এই সুর যেন আরও তীক্ষ্ণ, আরও পরিণত। এখানে নিছক ধ্বংসের নেশা নেই, আছে সৃষ্টির এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ‘ঝড়’ কবিতায় তিনি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন এভাবে
"ঝড় – ঝড় – ঝড় আমি – আমি ঝড় –
শন – শন – শনশন শন –ক্কড়ক্কড় ক্কড় –
কাঁদে মোর আগমনী আকাশ বাতাস বনানীতে।"
এই নন্দনতত্ত্বকে বলা যায় রোষের নন্দনতত্ত্ব। আমরা সাধারণত কবিতায় খুঁজি পেলবতা, স্নিগ্ধতা, নরম ফুলের গন্ধ। কিন্তু নজরুল আমাদের দেখালেন, রোষ আর রূঢ়তার মধ্যেও এক গভীর নান্দনিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে, যদি তা সত্য আর ন্যায়ের পক্ষে উচ্চারিত হয়। আগুনের শিখাও যে কত সুন্দর হতে পারে, তা ‘বিষের বাঁশি’ না পড়লে হয়তো অজানাই থেকে যেত।
এই কাব্যের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সামাজিক সাম্য ও লিঙ্গীয় চেতনার সূক্ষ্ম বীজ। যদিও গ্রন্থটি প্রধানত রাজদ্রোহের কথায় মুখর, তবু তাঁর অবচেতন মন থেকে সাম্যের ডাক ঠিকই বেরিয়ে এসেছে। ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতায় তিনি বলেন
"জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াতি খেলছে জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া॥"
কী সাংঘাতিক সরাসরি এক আঘাত! তিনি শোষকের কোনো জাত দেখেননি, তিনি দেখেছেন শৃঙ্খল। সমাজ যতক্ষণ অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকবে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে, ততক্ষণ কোনো রাজনৈতিক স্বাধীনতাই যে পূর্ণতা পাবে না, এ কথা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন।
শিল্পতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে ‘বিষের বাঁশি’-র ভাষা ও শৈলী এক অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছে। নজরুল এখানে তৎসম শব্দের গাম্ভীর্যের সাথে আরবি-ফারসি শব্দের যে সাবলীল ও নান্দনিক মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সমন্বয়ী ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছে। এই ভাষাশৈলী কেবল একটি ব্যাকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, এটি ছিল কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভাষাগত প্রতিফলন। ছন্দপ্রয়োগের ক্ষেত্রে নজরুলের মুন্সিয়ানা এখানে বিস্ময়কর। তাঁর ছন্দ যেন টগবগিয়ে চলা তেজী ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দের মতো দ্রুতগামী, যা পাঠককে এক ধরনের মানসিক আচ্ছন্নতায় নিয়ে যায়। এই আচ্ছন্নতা তাকে শান্ত করে না, বরং তাকে কর্মতৎপরতার দিকে ধাবিত করে। শিল্পের যে মহিমা সাধারণত দূরত্ব তৈরি করে, নজরুলের কাব্য সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে পাঠককে সরাসরি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
‘বিষের বাঁশি’র সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে এর তীব্রতা বা উগ্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু স্মরণ রাখা প্রয়োজন, শান্তিকামীতা যখন কাপুরুষতার নামান্তর হয়, তখন দ্রোহই একমাত্র ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। নজরুল শান্তির বিরুদ্ধে ছিলেন না, তিনি ছিলেন সেই মিথ্যে শান্তির বিরুদ্ধে যা শোষণের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর বাঁশির বিষ আসলে একটি মহৌষধ, যা পরাধীনতার পচনকে রোধ করতে ব্যবহৃত হয়। ট্র্যাজেডি যেমন মানুষের মনের ভয় ও করুণাকে মোচন করে শুদ্ধ করে, নজরুলের এই কাব্যগ্রন্থটি তেমনি জাতির মনের দাসত্ব ও ভীরুতাকে মোচন করে এক বীরত্বগাথায় রূপান্তরিত করে।
আজ ২০২৬ সাল। বিশ্বায়নের এই চূড়ান্ত আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পাতা উল্টে ‘বিষের বাঁশি’ পাঠ করি, তখন এর প্রাসঙ্গিকতা যেন আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। আজ হয়তো ভৌগোলিক উপনিবেশবাদ আগের মতো দৃশ্যমান নেই। লাল কোট পরা কোনো ব্রিটিশ পুলিশ হয়তো আমাদের রাজপথে টহল দিচ্ছে না। কিন্তু তার জায়গা দখল করেছে আরও সূক্ষ্ম, আরও ভয়ংকর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ। বৃহৎ কর্পোরেট শক্তি, অ্যালগরিদমের অদৃশ্য জাল, আর প্রযুক্তিগত একাধিপত্য আজ সাধারণ মানুষের স্বাধীনতাকে অন্যভাবে খর্ব করছে। এই যুগে নজরুলের সেই ‘শিকল-পরার গান’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের মনকে, তার চিন্তাকে কোনো খাঁচায় বন্দি করা যায় না।
ফিলিস্তিনের ধূসর রাজপথ থেকে শুরু করে আফ্রিকার খনি শ্রমিক, কিংবা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের শোষিত, কোণঠাসা মানুষের জন্য ‘বিষের বাঁশি’ আজও এক অপরাজেয় ইশতেহার হতে পারে। তাঁর সেই সমন্বয়বাদী দর্শন আজ এই উগ্র বিশ্বে এক পরম কাঙ্ক্ষিত মহৌষধ। তিনি যে মানুষের গান গেয়েছেন, যে ঐক্যের কথা বলেছেন, তা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা শতাব্দীতে আটকে থাকার নয়। ‘বিদ্রোহীর বাণী’ অংশে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন
"দোহাই তোদের! এবার তোরা সত্যি করে সত্য বল্!
ঢের দেখালি ঢাক ঢাক আর গুড় গুড়, ঢের মিথ্যা ছল।"
আজকের এই মিথ্যা তথ্যের যুগে (era of misinformation), যেখানে সত্যকে প্রতিদিন নানান মোড়কে ঢেকে ফেলার চেষ্টা চলে, নজরুলের এই ডাক কি আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে না? তিনি কোনো তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় পাঠককে বন্দি করতে চাননি। তিনি চেয়েছেন সরাসরি মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিতে। তাঁর কবিতার এই ঋজুতা, এই সোজাসাপটা আঘাতই তাঁকে সত্যিকারের ‘গণমানুষের কবি’ করে তুলেছে।
বিদ্রোহ মানে তো কেবল রাস্তায় নেমে স্লোগান দেওয়া নয়। বিদ্রোহ হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্যের প্রতি অবিচল থাকা। আপস না করা। ‘বিষের বাঁশি’র প্রতিটি কবিতা যেন সেই আত্মিক বিদ্রোহের এক একটি স্ফুলিঙ্গ। ‘মুক্ত-পিঞ্জর’ কবিতায় তিনি বলছেন
"উদিলাম পুন আমি কারা-ত্রাস চির-মুক্ত বাধাবন্ধ-হারা
উদ্দ্দামের জ্যোতি-মুখরিত মহা-গগন-অঙ্গনে –"
এই যে মুক্তির অনন্ত আকাঙ্ক্ষা, এটি মানুষের আদিমতম প্রেরণা। নজরুল তাঁর বাঁশিতে বিষ ভরেছিলেন ঠিকই, তবে সে বিষ শোষকের হৃৎপিণ্ডে হুল ফোটানোর জন্য। আর শোষিতের রক্তে সেই একই সুর কাজ করেছিল সঞ্জীবনী সুধার মতো। তাঁর এই কাব্যিক দ্বান্দ্বিকতা তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিপ্লববাদী কবিদের সারিতে বসিয়েছে। পাবলো নেরুদা কিংবা মাহমুদ দারউইশ যেমন তাঁদের মাটির মানুষের কথা, শেকড়ের কথা বলেছেন, নজরুলও তেমনি বাংলার ধুলোবালি, রোদ-বৃষ্টি আর সাধারণ মানুষের হৃৎস্পন্দনকে তাঁর কবিতায় চিরকালের জন্য জীবন্ত করে গেছেন।
কাব্যগ্রন্থটির একেবারে শুরুর দিকে ‘উৎসর্গ’ পত্রে নজরুল এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন ‘বাংলার অগ্নি-নাগিনি মেয়ে মুসলিম-মহিলা-কুল-গৌরব আমার জগজ্জননী-স্বরূপা মা মিসেস এম. রহমান সাহেবার পবিত্র চরণারবিন্দে’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন
"এমনই প্লাবন-দুন্দুভি-বাজা ব্যাকুল শ্রাবণ মাস –
সর্বনাশের ঝান্ডা দুলায়ে বিদ্রোহ-রাঙা-বাস
ছুটিতে আছিনু মাভৈঃ-মন্ত্র ঘোষি অভয়কর,
রণ-বিপ্লব-রক্ত-অশ্ব কশাঘাত-জর্জর!"
এই উৎসর্গপত্রটি পড়লেই বোঝা যায়, নজরুলের মনোজগতে নারীদের স্থান কত উঁচুতে ছিল। সমাজ যখন নারীদের অন্দরমহলে বন্দি রাখতে ব্যস্ত, নজরুল তখন একজন নারীকে ‘অগ্নি-নাগিনি’ আখ্যা দিয়ে তাঁর পায়ে নিজের শ্রেষ্ঠ বিদ্রোহের দলিলটি সঁপে দিচ্ছেন। এই যে প্রচলিত ছক ভেঙে ফেলার অদম্য সাহস, এটাই নজরুল।
আজকের দিনে যখন আমরা আকাশপানে তাকাই, দেখি মেঘের আনাগোনা। কখনো বা বৃষ্টি নামে। প্রকৃতি যেমন তার নিজের নিয়মে ভাঙে আর গড়ে, সমাজও তেমনি। ‘বিষের বাঁশি’ তাই কেবল অতীতের একটি ধুলোমাখা দলিল নয়। এটি আগামীর এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা। পরাধীনতার অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক না কেন, যান্ত্রিক সভ্যতার জাঁতাকলে মানুষ যতই পিষ্ট হোক না কেন, নজরুলের বাঁশির সুর চিরদিন সেই অন্ধকার ভেদ করে স্বাধীনতার ভোরের বার্তা নিয়ে আসবে।
নজরুল তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য যে অগ্নিবীণা আর বিষের বাঁশি রেখে গেছেন, তা ধারণ করার মতো মানসিক জোর কি আমরা আজও অর্জন করতে পেরেছি? হয়তো পুরোপুরি পারিনি। কিন্তু একটা হালকা আশার ছায়া ঠিকই রয়ে যায়। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে, যতদিন এক মানুষ আরেক মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবে, ঠিক ততদিন নজরুলের ‘বিষের বাঁশি’ আমাদের বুকের ভেতরে কোথাও না কোথাও বেজে উঠবে। এর প্রয়োজন কখনো ফুরাবে না। যে মানুষটি আজ থেকে একশো বছরেরও বেশি সময় আগে জাতপাতের অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ‘মানুষের’ গান গেয়েছিলেন, তাঁর সেই মূর্ত হাহাকার প্রকৃতপক্ষে এক অবিনাশী জয়ের গান। কালের প্রবাহে তা যেন আরও উজ্জ্বল, আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
কবির সুর তো বাতাসের মতো। তাকে কি আর কোনো কাঁচের বয়ামে বা লোহার খাঁচায় বন্দি করে রাখা যায়? যায় না। আর যায় না বলেই, এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দাঁড়িয়েও যখন ‘বিষের বাঁশি’র পাতা উল্টাই, মনে হয় যেন একটু আগেই কেউ একজন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল
"বল, নাহি ভয়, নাহি ভয়!
বল, মাভৈঃ মাভৈঃ, জয় সত্যের জয়!"
সত্যের জয় কি সত্যিই হয়? হয়তো হয়, হয়তো বা এক অনন্ত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই জয়ের দিকেই হেঁটে চলতে হয় আজীবন। আর সেই দীর্ঘ, ক্লান্তিকর হাঁটার পথে ‘বিষের বাঁশি’র মতো দু-একটি গানই হয়ে থাকে আমাদের একমাত্র পাথেয়। চিরকাল। মানবাত্মার মুক্তির গান হয়েই এই মহাবিশ্বের চরাচরে তা প্রতিধ্বনিত হতে থাকুক।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৫৫ বার পড়া হয়েছে