সর্বশেষ

মতামত

মুম্বাইয়ে মেলেনি অনুমতি, ঢাকায় খুলল দরজা: দুই জরুরি অবতরণে মানবিকতার দুই চিত্র

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:১৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ভারতীয় নাগরিক অঞ্জনা ভৌমিককে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বিপদে পড়ার পর ঢাকায় জরুরি অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয় এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজনীয় ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র না থাকলেও মানবিক বিবেচনায় চিকিৎসার পথ খুলে দেয় বাংলাদেশ। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে অসুস্থ এক বাংলাদেশি যাত্রীকে নিয়ে মুম্বাইয়ে জরুরি অবতরণের অনুমতি পাননি একটি উড়োজাহাজের পাইলট। দুটি ঘটনা জরুরি পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও মানবিকতার ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে।

ভারতীয় নাগরিক অঞ্জনা ভৌমিককে বাঁচানো যায়নি। তবে তাঁকে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বিপদে পড়ার পর জরুরি অবতরণের অনুমতি দেওয়া থেকে হাসপাতালে নেওয়া—প্রতিটি ধাপে বাংলাদেশ যে তৎপরতা দেখিয়েছে, তার কেন্দ্রে ছিল মানবিকতা। প্রয়োজনীয় ভ্রমণসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না থাকলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তা।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬। গুরুতর অসুস্থ অঞ্জনা ভৌমিককে নিয়ে ভারতের আগরতলা থেকে কলকাতা যাচ্ছিল একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার সময় কেবিনের চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়। প্রধান দরজা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খুলে গেলে পাইলট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ঢাকায় অবতরণের অনুমতি চান। উড়োজাহাজটিতে দুই পাইলটসহ সাতজন ছিলেন।

সাহায্যের আহ্বান পেয়ে দ্রুত প্রস্তুতি নেয় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক দল, অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী যান এবং নিরাপত্তাকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়। দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণের পর রোগীকে দ্রুত কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি; চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এটি ছিল ভারতের একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। উড়োজাহাজে থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন ছিল না এমনকি পাসপোর্ট ছিল না। তবু মানবিক বিবেচনায় ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোগী ও তাঁর দুই সঙ্গীকে ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেছেন, “যখন ইমারজেন্সি ঘোষণা করা হয় তখন কোন দেশ, কোন ফ্লাইট অনুমতি আছে কি না কিছুই বিবেচনা করা হয়না।”

ঢাকার এই তৎপরতার পাশে ফিরে আসে ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির আরেকটি ঘটনা। সেদিন ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের এসভি-৮০৫ ফ্লাইটে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৪৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি যাত্রী আবু তাহির। উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি তিনি বমি করছিলেন। তাঁকে চিকিৎসা দিতে পাইলট প্রথমে ভারতের মুম্বাইয়ে জরুরি অবতরণের অনুমতি চান।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাত্রীর জাতীয়তা ও অন্যান্য তথ্য জানার পর উড়োজাহাজটিকে মুম্বাইয়ে তাৎক্ষণিক অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরপর পাইলট গতিপথ পরিবর্তন করে পাকিস্তানের করাচিতে অবতরণের অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে সকাল ৭টা ২৮ মিনিটে জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে ফ্লাইটটি। সেখানে মেডিকেল টিম আবু তাহিরকে চিকিৎসা দেয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে নিয়েই উড়োজাহাজটি রিয়াদের উদ্দেশে রওনা হয়।

দুটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য স্পষ্ট। একটিতে অসুস্থ বাংলাদেশি যাত্রীকে নিয়ে মুম্বাইয়ে অবতরণের তাৎক্ষণিক অনুমতি মেলেনি; অন্যটিতে ভারতীয় রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার সমাধান করে জরুরি চিকিৎসার পথ খুলে দিয়েছে ঢাকা। তবে মুম্বাইয়ে অনুমতি না দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটিকে গোটা ভারতীয় জনগণের মানসিকতার পরিচয় না বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা সংগত।

অঞ্জনার মৃত্যু এই উদ্ধারচেষ্টার বেদনাদায়ক পরিণতি। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে বাংলাদেশ যে সাড়া দিয়েছে, তার মূল্য তাতে মুছে যায় না। জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় জাতীয়তা বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রকে বাধা না করার যে অবস্থান ঢাকা নিয়েছে—এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বার্তা সেখানেই। 
 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

১৭২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০