সর্বশেষ

মতামত

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে অপপ্রচার: ইতিহাসের আড়ালে সংস্কৃতি বর্জনের রাজনীতি

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:৩১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা, মুসলমানদের অবজ্ঞা, পতিতালয়ের ব্যবসা ও জাতীয় সংগীতের সুর চুরির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঐতিহাসিক তথ্য, সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা ও প্রমাণহীন প্রচার পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করে সাংবাদিক ও কলামিস্ট মনজুর এহসান চৌধুরী দেখিয়েছেন, এসব বিতর্ক কীভাবে সাহিত্য থেকে সরে সাংস্কৃতিক পরিচয় ও বর্জনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জনপরিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগ আবার সামনে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা, মুসলমানদের অবজ্ঞা, পতিতালয়ের ব্যবসা এবং জাতীয় সংগীতের সুর ‘চুরি’—এমন নানা বক্তব্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়ার মতো প্রকাশ্য অবমাননা। তবে ঐতিহাসিক তথ্য, সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা এবং মনগড়া অভিযোগ পৃথক করে দেখলে প্রচারের অনেক অসংগতি স্পষ্ট হয়। কোনো অভিযোগের আংশিক সত্যকে সম্প্রসারিত করা হয়েছে, কোনোটি প্রমাণহীন, আবার কোনোটি তাঁর জীবনকালের বিবেচনায় সম্পূর্ণ অসম্ভব। এসবের মধ্য দিয়ে বিতর্ক সাহিত্য থেকে সরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে পৌঁছেছে।

সাম্প্রতিক ঘটনার মধ্যে ১০ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র বিকৃত করার চেষ্টা উল্লেখযোগ্য। এ ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াশসহ চারজনকে আটক করা হয়; পরে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ঘটনাস্থলের বক্তব্যে ‘ভারতীয় আগ্রাসন’ এবং রবীন্দ্রনাথের কথিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধিতার অভিযোগ উঠে আসে। পুলিশি অভিযোগ অবশ্য আদালতে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু ঘটনাটি দেখায়, ঔপনিবেশিক যুগের একজন লেখককে বর্তমান ভারতবিরোধী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিকৃতি বিকৃত করার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক কর্মীরাও রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে প্রতিবাদ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ৭ মে ১৮৬১ কলকাতায়; মৃত্যু ৭ আগস্ট ১৯৪১। এই দুটি তারিখই তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি অভিযোগ খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন—এমন বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ত্রিশ বছর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর রচনার পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সেটিকে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলা যায় না। একইভাবে ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষদের কর্মকাণ্ড রবীন্দ্রনাথের নিজের কাজ হিসেবে উপস্থাপন করলেও প্রজন্ম ও সময়ের পার্থক্য মুছে যায়।

ঠাকুর পরিবারের অর্থনৈতিক ইতিহাসও পৃথকভাবে বিবেচ্য। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ জমিদার ও উদ্যোক্তা ছিলেন। কলকাতায় ব্যাংক, বিমা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রানিগঞ্জে কয়লা এবং আসামের চা-উদ্যোগে তাঁর সম্পর্ক ছিল। বর্তমান বাংলাদেশের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের পাশাপাশি ওডিশার পান্ডুয়া এস্টেটেও পরিবারের সম্পত্তি ছিল। তবে এসব থেকে ‘সারা ভারতবর্ষে জমিদারি’ বলা যায় না। আলোচিত ঐতিহাসিক উৎসে লাহোর, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, দক্ষিণ ভারত কিংবা বর্তমান পাকিস্তানে নিজস্ব জমিদারি বা স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁদের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল পূর্বভারত; আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যোগাযোগ জমিদারির অবস্থানের সমার্থক নয়।

রবীন্দ্রনাথ নিজেও পারিবারিক জমিদারি পরিচালনা করেছেন। ফলে তাঁর শ্রেণিগত অবস্থান, প্রজাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জমিদারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন বৈধ। কিন্তু শ্রেণি-সমালোচনা আর সাহিত্যিককে ধর্মীয় পরিচয়ে অপমান করা এক নয়। একটি ঐতিহাসিক আলোচনায় কলকাতার পারিবারিক বাড়িতে কেন্দ্রীয় দপ্তর এবং পূর্ববঙ্গের তিন কেন্দ্রে আঞ্চলিক দপ্তরের উল্লেখ রয়েছে। তবে দূরবর্তী কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বিপুলসংখ্যায় কলকাতায় আবাসিকভাবে থাকতেন, যৌনপল্লিতে যেতেন অথবা তাঁদের জন্য পরিবারটি এমন প্রতিষ্ঠান রাখত—এই যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার দলিল পাওয়া যায়নি। দাপ্তরিক কাঠামো থেকে ব্যক্তিগত যৌন আচরণ অনুমান করা যায় না।

যৌনপল্লি সম্পর্কে বহুল প্রচারিত ‘৪৩টি পতিতালয়’ দাবিতেও গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি আছে। নগর-ইতিহাসের গবেষণা থেকে একটি পরবর্তী সূত্রে উদ্ধৃত তথ্যে বৌবাজারের একটি যৌনপল্লি ঠাকুর পরিবারের কোনো সদস্যের মালিকানাধীন সম্পত্তিতে থাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ৪৩টি ঘর ছিল—৪৩টি পৃথক পতিতালয় নয়। উদ্ধৃতিতে নির্দিষ্ট মালিকের নাম কিংবা ব্যক্তিগত পরিচালনার তথ্যও নেই। মূল নথি সরাসরি যাচাইয়ের সীমা রয়েছে। ফলে সম্পত্তির মালিকানা, যৌনব্যবসা পরিচালনা, সোনাগাছির নিয়ন্ত্রণ এবং রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব সংশ্লিষ্টতাকে এক করে অভিযোগ তোলা যথার্থ নয়। প্রমাণ যতটুকু বলে, দাবি ততটুকুতেই সীমিত রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার অভিযোগও নির্ভরযোগ্য দলিলের পরীক্ষায় টেকে না। প্রচলিত বক্তব্য অনুযায়ী, ২৮ মার্চ ১৯১২ কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন। Fact-Watch-এর পর্যালোচনায় তাঁর জীবনী ও চিঠিপত্র দেখায়, তিনি তখন শিলাইদহে ছিলেন এবং ওই দিন সেখান থেকে চিঠি লিখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাস্তবে হয়েছিল; রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল স্মারকলিপিও দেয়। কিন্তু অন্যদের নথিভুক্ত বিরোধিতা রবীন্দ্রনাথের নামে আরোপ করা যায় না। পরবর্তী বইয়ে অভিযোগ লেখা থাকলেও তা সমসাময়িক সংবাদ, বক্তব্য কিংবা স্বাক্ষরযুক্ত দলিলের বিকল্প নয়।

মুসলমানদের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য মূল্যায়নে অবশ্য একমুখী সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই। ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘মুসলমানীর গল্প’, ‘সমস্যাপূরণ’ ও ‘দুরাশা’য় মুসলমান চরিত্র রয়েছে। রহমতের পিতৃত্ব এবং হবির খাঁর মানবিকতায় সহমর্মী চিত্রণ পাওয়া যায়। তাই ‘তিনি মুসলমানদের নিয়ে কিছুই লেখেননি’ অভিযোগ ভুল। অন্যদিকে তাঁর বিপুল কথাসাহিত্যে মুসলমান, বিশেষত বাঙালি মুসলমান সমাজের উপস্থিতি তুলনামূলক কম—গবেষণায় এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা হয়েছে। কিছু চিঠি ও প্রবন্ধে ইসলাম সম্পর্কে কঠোর সাধারণীকরণও আছে। সেগুলো সমালোচনাযোগ্য। কিন্তু সীমাবদ্ধতা আড়াল করা এবং তাঁকে কেবল মুসলমানবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন—দুটিই অসম্পূর্ণ পাঠ।

জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্কে সত্য তথ্যের সঙ্গে নেতিবাচক ব্যাখ্যা মিশছে। ‘আমার সোনার বাংলা’র কথা রবীন্দ্রনাথের; সুর গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ থেকে অভিযোজিত। গগনের অবদান স্বীকার করাই সঠিক ইতিহাস। কিন্তু স্বীকৃত সুরগ্রহণকে শুধু ‘চুরি’ বললে নতুন গানের কথা ও অভিযোজনের সম্পর্ক উপেক্ষিত হয়। গানটি স্বাধীনতার আন্দোলনে জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষিত ও ব্যবহৃত হয়; ১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিক গ্রহণ এবং সংবিধানে প্রথম দশ চরণের স্বীকৃতি আসে। এই প্রকাশ্য ধারাবাহিকতাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলতে পৃথক দলিল প্রয়োজন। রচয়িতার ধর্ম কিংবা সুরের পূর্ববর্তী উৎস সেই প্রমাণ নয়।

বর্তমান বিতর্কে তাই মূল পার্থক্যটি সমালোচনা ও বর্জনের মধ্যে। ভারতের রাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করেও বাঙালি সাহিত্য গ্রহণ করা সম্ভব; জমিদারির সমালোচনা করেও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক অবদান বিচার করা যায়। ‘আগে মুসলমান’ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অগ্রাধিকার হতে পারে, কিন্তু হিন্দু লেখকের সৃষ্টি প্রত্যাখ্যানের বাধ্যবাধকতা তৈরি করলে তা সাংস্কৃতিক বর্জন হয়ে ওঠে। অবমাননার যাচাইকৃত পোস্ট সংশ্লিষ্ট আচরণের প্রমাণ হতে পারে; কেন্দ্রীয় নির্দেশ আবশ্যক নয়। তবে সব ঘটনার একক পরিচালনা কিংবা গোটা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর দায় অনুমান করা যাবে না। জনস্বার্থের কাজ হলো মূল সূত্র প্রকাশ, ভুল সংশোধন এবং সাহিত্যিক সমালোচনাকে মনগড়া ইতিহাস থেকে পৃথক রাখা।


লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

১৩৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০