অগ্নিবীণা: রুদ্রসুন্দরের আবাহন ও মানবমুক্তির মহাকাব্য
বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৫৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক দুর্দমনীয় চেতনার নাম। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় পৌরাণিক অনুষঙ্গ, ইসলামী ঐতিহ্য, বিদ্রোহ, মানবমুক্তি, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার যে সমন্বয় ঘটেছে, তা নজরুলের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও রুদ্র-নান্দনিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। ‘বিদ্রোহী’, ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘কামাল পাশা’, ‘মোহররম’সহ কবিতাগুলো আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের সাহস ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে।
বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন। বাংলা সাহিত্যের আকাশ তখন রবীন্দ্র-প্রতিভার মধ্যাহ্নভাস্বর দীপ্তিতে উদ্ভাসিত। চারদিকে আধ্যাত্মিক গীতিময়তা আর রোমান্টিক সংবেদনশীলতার এক মায়াবী কুহক। ঠিক তখনই, ১৯২২ সালের তপ্ত এক দ্বিপ্রহরে, বাঙালির মনন-দ্বারে এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটল কাজী নজরুল ইসলামের। তাঁর হাতে ছিল এক অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র যার নাম ‘অগ্নিবীণা’। এই গ্রন্থ কেবল বারোটি কবিতার সংকলন ছিল না; বরং তা ছিল পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খলিত আত্মার এক আর্তনাদ এবং একই সঙ্গে এক বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা। ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশের সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণটি ছিল অভাবনীয়। ১৯২২ সালের অক্টোবর মাস; অসহযোগ আন্দোলনের স্তব্ধতা আর চোরিচোরার পরবর্তী বিষণ্নতায় যখন সারা দেশ আচ্ছন্ন, তখনই নজরুল তাঁর বীণায় যে আগুনের সুর তুললেন, তা সমকালীন যুবমানসকে এক প্রচণ্ড শক্তিতে উদ্বেলিত করেছিল। একশ বছর পেরিয়ে এসেও যখন সেই বীণার তারে আঙুল ছোঁয়ানো হয়, আজও যেন স্নায়ুর গভীরে স্ফুলিঙ্গ জেগে ওঠে। প্রশ্ন জাগে, কী ছিল সেই জাদুকরী অক্ষরের বিন্যাসে, যা এক জাতিকে এক রাতেই মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছিল?
অগ্নিবীণার জন্মের ইতিহাসটা যদি একটু পেছন ফিরে দেখা যায়, তবে চোখে পড়বে সৈনিকের পোশাকে এক যুবককে। করাচি সেনানিবাসের নিভৃত প্রহরে বসে তিনি দেখছিলেন সাম্রাজ্যবাদের আস্ফালন, আবার তাঁর রক্তে ধিকিধিকি জ্বলছিল গ্রাম বাংলার লোকজ সুর আর সুফি দর্শনের উদারতা। রবীন্দ্রনাথ তখন বাঙালির চেতনার বটবৃক্ষ, তাঁর ছায়ার বাইরে কোনো শিল্প-ভুবন কল্পনা করা ছিল এক প্রকার দুঃসাহস। কিন্তু নজরুল এলেন একেবারে ভিন্ন ধাতে। তিনি উপনিষদের ‘শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্’ থেকে বেরিয়ে এসে কালভৈরবের অট্টহাসি হাসলেন।
কাব্যগ্রন্থের নামটির দিকে তাকালেই কবির সৃজনশীলতার এক সূক্ষ্ম রহস্য উন্মোচিত হয়। ‘অগ্নি’ আর ‘বীণা’ এই দুইয়ের সহাবস্থান কি আদৌ সম্ভব? অগ্নি যা দহন করে, ছাই করে দেয়; আর বীণা যা কোমল মূর্ছনায় মনকে ভিজিয়ে দেয়। এই দুই আপাত-বিপরীতধর্মী সত্তাকে নজরুল মেলালেন এক বিন্দুতে। তিনি বোঝাতে চাইলেন, মুক্তির গান সবসময় কেবল বাঁশিতে বাজে না, মাঝে মাঝে তা কামানের গোলার মতো গর্জনেও বেজে উঠতে হয়। এটিই হলো নজরুলের ‘রুদ্র-নন্দনতত্ত্ব’। সৌন্দর্য কেবল ফুলের পাপড়িতে নেই, সৌন্দর্য আছে ঝড়ের তাণ্ডবেও; সৌন্দর্য কেবল পূর্ণিমার চাঁদে নেই, সৌন্দর্য আছে কালবৈশাখীর কালো মেঘের ঘনঘটায়।
এই কাব্যের উৎসর্গপত্রটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি এটি উৎসর্গ করেছিলেন বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। আলিপুর বোমা মামলার সেই কিংবদন্তি নায়ক ছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতীক। নজরুল এই উৎসর্গের মাধ্যমেই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। শিল্প কেবল ‘শিল্পের জন্য’ নয়, শিল্প জীবনের জন্য, শিল্প শৃঙ্খল ভাঙার জন্য। ‘অগ্নিবীণা’র প্রতিটি কবিতা যেন একেকটি রণভেরী, যা ঘুমন্ত জাতিকে ঝাকুনি দিয়ে জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল।
এখন ‘অগ্নিবীণা’র নন্দনতত্ত্ব বুঝতে হলে প্রথমেই কবির ‘পৌরাণিক বিনির্মাণ’ বা ‘Mythopoeic Construction’-এর গহীনে প্রবেশ করা প্রয়োজন। জোসেফ ক্যাম্পবেল বা নর্থরপ ফ্রাই-এর পুরাণতাত্ত্বিক ধারণার আলোকে যদি নজরুলকে বিচার করা হয়, তবে দেখা যাবে তিনি কেবল পুরাণকে ব্যবহার করেননি, বরং তাকে এক বৈপ্লবিক আধেয় দান করেছেন। বাংলা কাব্যের প্রথাগত ধারায় দেব-দেবীরা ছিলেন ভক্তির আধার, দূরবর্তী এক স্বর্গীয় সত্তা। কিন্তু নজরুলের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় শিব বা নটরাজ হয়ে উঠলেন ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির এক উন্মাদনা। কবি লিখছেন “তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়।” এখানে শিবের তাণ্ডব কোনো প্রাচীন পৌরাণিক ধ্বংসলীলা নয়, বরং তা জরাজীর্ণ সমাজ ও ঔপনিবেশিক শাসন-কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক শক্তিশালী রূপক। নজরুল যে কৌশলে হিন্দু ও ইসলামি সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন, তা সমকালীন বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। তিনি ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় যখন রণরঙ্গিণী দশমহাবিদ্যার আবাহন করেন, তখন তা কেবল ধর্মীয় অনুষঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে শোষিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধের প্রতীক। আবার ‘কামাল পাশা’ কবিতায় তিনি যখন মধ্যপ্রাচ্যের বিপ্লবী চেতনাকে বাংলার পলিতে সঞ্চারিত করেন, তখন তা এক আন্তর্জাতিক সংহতির রূপ পরিগ্রহ করে। এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে নজরুলকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া ‘নমনীয় প্রাচ্য’ বা ‘অলস প্রাচ্য’ এর চিরাচরিত ধারণাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছেন। তাঁর কবিতার প্রতিটি ছত্রে ফুটে উঠেছে এক সক্রিয়, বিদ্রোহী এবং প্রগতিশীল প্রাচ্যের ছবি, যা নিজের ভাগ্য নিজে নির্মাণ করতে সক্ষম।
নজরুলের কাব্যভাষার আলোচনা ব্যতিরেকে ‘অগ্নিবীণা’র মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ভাষা সম্পর্কে মিখাইল বাখতিনের ‘ডায়ালজিক’ (Dialogic) তত্ত্বটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নজরুলের শব্দভাণ্ডার ছিল তৎসম শব্দের আভিজাত্য এবং আরবি-ফারসি শব্দের প্রাণস্পন্দনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তিনি যখন লেখেন “গাহিছে আজিকে সিন্ধু-তীরে রণ-তুর্য্যরে জয়-গান / আসিয়াছে ফিরে ‘কামাল’ আজিকে জেগেছে মুসলমান!” তখন শব্দের এই ঘাত-প্রতিঘাত এক নতুন কাব্যভাষা বা ‘লিঙ্গুইস্টিক হাইব্রিডিটি’র জন্ম দেয়। এই সংকরত্ব হোমি কে. ভাবার ভাষায় বলতে গেলে, এক প্রকার ‘সাবভারসিভ’ বা আধিপত্য-বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করে যা ঔপনিবেশিক একরৈখিক আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। নজরুলের আগে বাংলা কাব্যে শব্দের এমন গণতান্ত্রিক প্রয়োগ সম্ভবত আর দেখা যায়নি। তিনি রাজপথের ভাষাকে কাব্যের সিংহাসনে আরোহণ করিয়েছিলেন, যা রোমান্টিক নন্দনতত্ত্বের পরিধিকে প্রসারিত করে এক নবতর ‘বিদ্রোহী নন্দনতত্ত্ব’ বা ‘Aesthetics of Rebellion’ তৈরি করেছিল। তাঁর শব্দের ঝংকার যেন কোনো সুমধুর সংগীত নয়, বরং শাণিত অস্ত্রের ঝনঝনানি। তিনি বীণায় সুর তুলছেন ঠিকই, কিন্তু সেই বীণা থেকে নিঃসৃত হচ্ছে আগুনের ফুলকি। এই নামকরণের সার্থকতা এখানেই যে, নজরুল শিল্পকে কেবল আনন্দের উপকরণ হিসেবে দেখেননি, বরং একে সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেছেন।
‘অগ্নিবীণা’র মুকুটে যদি কোনো শ্রেষ্ঠ মণি থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন প্রচণ্ড আত্মঘোষণা আর দ্বিতীয়টি আছে কি না সন্দেহ। এখানে ‘আমি’ সত্তা কোনো ক্ষুদ্র ব্যক্তি-অহং নয়। নজরুলের এই ‘আমি’ ধারণ করেছে সমগ্র মানবতাকে, সমগ্র ইতিহাসকে এবং সমগ্র পুরাণকে। তিনি একই সাথে শিবের ডমরু আর কৃষ্ণের বাঁশি। তিনি চেঙ্গিস, তিনি বেদুঈন, আবার তিনিই ‘আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’।
এই কবিতার প্রতিটি শব্দে যে সমন্বয় দেখা যায়, তা নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার শ্রেষ্ঠ দলিল। নজরুল জানতেন, ভারতবর্ষের মুক্তি কেবল একপক্ষীয় বিদ্রোহে সম্ভব নয়; হিন্দু-মুসলমান উভয়কেই নিজের ঐতিহ্যের সেরা অংশ নিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। অস্তিত্ববাদের যে দর্শন পরবর্তীতে সার্ত্র বা কামু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, নজরুল যেন তার আগেই সেই আগুনের পরশ দিয়ে গিয়েছিলেন বাংলার মাটিতে।
এখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার দার্শনিক গভীরতা বিশ্লেষণ করলে সেখানে ফ্রেডরিখ নীৎসের ‘উবারমেনশ’ (Übermensch) বা অতিমানবের ছায়া পরিলক্ষিত হয়। নীৎসে যে বীরত্বের জয়গান গেয়েছিলেন, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ সত্তা যেন তারই এক সার্থক বঙ্গীয় সংস্করণ। “আমি চির উন্নত শির, / শির নেহারি’ আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!” এই পংক্তিমালায় যে আমিত্বের প্রকাশ ঘটেছে, তা কোনো ব্যক্তিগত অহংকার নয়; বরং তা হলো সমষ্টির প্রতিনিধি হিসেবে এক সার্বভৌম মানুষের অকুতোভয় ঘোষণা। তাঁর বিদ্রোহ কেবল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের কুসংস্কার এবং সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক চিরস্থায়ী অবস্থান।
নজরুলের দৃষ্টি কেবল বাংলার সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটি একটি বিশ্বব্যাপী সংগ্রাম। ‘কামাল পাশা’ কবিতায় তুর্কি বিপ্লবের যে উন্মাদনা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বাংলা কবিতার প্রথাগত ছন্দকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। ‘কুইক মার্চ’ ছন্দের সেই রণধ্বনি পাঠককে স্থির থাকতে দেয় না।
অন্যদিকে ‘আনোয়ার’ কবিতাটি এক ট্র্যাজিক মহিমা নিয়ে হাজির হয়। করাচি সেনানিবাসের অন্ধকারে বন্দী সৈনিকের যে হাহাকার, তা যেন নজরুলের নিজের আত্মারই প্রতিধ্বনি। সেখানে দেশপ্রেমের সাথে মিলেমিশে আছে ত্যাগের এক বিশাল দর্শন। নজরুল দেখিয়েছেন, মুক্তি কেবল ভূখণ্ডের নয়, মুক্তি আত্মারও। আর সেই মুক্তির জন্য রক্ত দেওয়াটাই জীবনের পরম সার্থকতা।
আন্তনিও গ্রামশির ‘হেজেমনি’ (Hegemony) বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্বটি নজরুলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। ব্রিটিশ শাসনামলে যে সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আধিপত্য বজায় রাখা হয়েছিল, নজরুল তাঁর ‘অগ্নিবীণা’র মাধ্যমে সেই কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। তিনি সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বরকে কাব্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার’ কবিতায় তিনি যে প্যান-ইসলামিক বা বিশ্ব-মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা বলেছেন, তা মূলত ছিল একটি অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট বা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বৈশ্বিক অবস্থান। তিনি যখন তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের বিজয়গান গাইলেন, তখন তিনি আসলে পরাধীন বাঙালির মনে এই বিশ্বাস বপন করতে চাইলেন যে, বিশ্বের যেকোনো পরাক্রমশালী শক্তিকে সমবেত শক্তিতে পরাজিত করা সম্ভব। তাঁর এই আন্তর্জাতিকতাবাদ সরাসরি মার্কসীয় দর্শনের শ্রেণীসংগ্রামের চেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত না হলেও, তা নিপীড়িত মানবতার মুক্তির প্রশ্নে ছিল আপসহীন। তিনি ‘শাত-ইল-আরব’ কবিতায় যখন মরুর তপ্ত বালুর সাথে বাংলার শ্যামলিমার এক অদৃশ্য যোগসূত্র স্থাপন করেন, তখন তা দেশজ গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন এক হাহাকার ও বীরত্বের সেতুবন্ধনে পরিণত হয়।
‘অগ্নিবীণা’র একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুমাত্রিক প্রতীকায়ন। নজরুলের প্রতীকী জগত বিশ্লেষণ করলে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বা কার্ল ইয়ুং-এর মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে নজরুলের কবিতার ‘আর্কিটাইপ’ (Archetype) বা আদিম প্রতীকের ব্যবহার অত্যন্ত জোরালো। ‘আগমনী’ বা ‘ধূমকেতু’র মতো প্রতীকগুলো মানব অবচেতনের সেই আদিম শক্তিকে জাগিয়ে তোলে যা প্রলয়ের পর সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল একাধারে প্রাণশক্তির বহিঃপ্রকাশ এবং একই সঙ্গে এক গভীর আধ্যাত্মিক আর্তি। তিনি ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় যে দেবীরূপ কল্পনা করেছেন, তিনি কেবল একটি ধর্মীয় বিগ্রহ নন; বরং তিনি শৃঙ্খল ভাঙার জন্য আজ রক্তপানে উদ্যত। ধর্মের এই যে রাজনৈতিক ব্যবহার বা ‘পলিটিক্যাল ইউজ অব রিলিজিয়ন’, নজরুল তা করেছিলেন অত্যন্ত সুকৌশলে যাতে করে সাধারণ মানুষ তাদের চিরাচরিত বিশ্বাস থেকেই সংগ্রামের নতুন প্রেরণা খুঁজে পায়। নজরুলের এই ধর্ম-সমন্বয়বাদী দর্শন বা ‘সিনক্রেটিজম’ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে ‘অগ্নিবীণা’র একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ইসলামী ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ। ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’ বা ‘মোহররম’ এই কবিতাগুলোতে নজরুল ইসলাম ধর্মকে দেখেছেন এক গতিশীল, বিপ্লবী এবং সাম্যের দর্শন হিসেবে। কারবালার সেই ত্যাগের ইতিহাসকে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতায় যখন তিনি বলেন "পাপী অধম তরাইতে নদী পারের কান্ডারী / এসেছে আহমদ তরী নিয়ে ভব-পারে তরণী", সেখানে কেবল পরলৌকিক মুক্তির কথা নেই, আছে এক শোষিত জাতির ইহজাগতিক কান্ডারী খুঁজে পাওয়ার আর্তনাদ। এই যে ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে রাজনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার করে তোলা, এটি ছিল নজরুলের এক অপূর্ব কৌশল। তিনি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত না করে বরং সেই বিশ্বাসের তেজকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রোহের আগুনে।
নজরুলের কাব্যশৈলীর আলোচনায় তাঁর ছন্দের জাদুকরী প্রভাব উপেক্ষা করা অসম্ভব। তিনি বাংলা কাব্যে বীররস বা ‘রুদ্র রস’ এর যে সঞ্চার করেছিলেন, তা আগেকার কোনো কবি এত প্রবলভাবে করতে পারেননি। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এর ছন্দের দোলা যেন এক রণক্লান্ত সৈনিকের দৃপ্ত পদধ্বনি। “ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়” এখানে যে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের চলন, তা যেন পাঠকের হৃদপিণ্ডে সরাসরি আঘাত করে। তাঁর ছন্দের এই গতিশীলতাকে ফরাসি দার্শনিক অঁরি বার্গসঁ-র ‘এলান ভাইটাল’ (Élan Vital) বা ‘প্রাণপ্রবাহ’ তত্ত্বের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। নজরুলের কবিতা স্থবির নয়, তা সদা-চঞ্চল, সদা-উন্মত্ত। এই গতিশীলতাই ‘অগ্নিবীণা’কে এক চিরযৌবনা কাব্যে পরিণত করেছে। আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের যে ধূসর পাণ্ডুলিপি বা বিষণ্নতা, নজরুল তার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক উদ্দীপ্ত মধ্যাহ্ন। নজরুলের এই অতিরিক্ত বহির্মুখিতা বা ‘এক্সট্রাভার্ট’ চরিত্র অনেক সময় সমালোচকদের কাছে স্থূল মনে হয়েছে, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটি জাতির জাগরণের মুহূর্তে সূক্ষ্ম রোমান্টিকতার চেয়ে বজ্রনির্ঘোষের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি। মোহিতলাল মজুমদার বা যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মতো সমসাময়িক কবিরাও যখন এক ধরনের নিরাশা বা সংশয়বাদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, নজরুল তখন আশাবাদের এক প্রদীপ্ত মশাল জ্বেলেছিলেন।
‘অগ্নিবীণা’র সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আলোচনা করতে গেলে তৎকালীন ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের রিপোর্টগুলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। ১৯২২ সালের পর থেকে নজরুলের প্রতিটি লেখা ব্রিটিশ সরকারের কাছে ছিল এক আতঙ্কের নাম। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় তাঁর রাজদ্রোহী লেখা এবং ‘অগ্নিবীণা’র কবিতাগুলো সাধারণ মানুষের মনে যে সাহসের সঞ্চার করেছিল, তা প্রত্যক্ষ করে ব্রিটিশরা তাঁর একের পর এক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করে। ‘অগ্নিবীণা’র এই বৈপ্লবিক সত্তাকে মিশেল ফুকোর ‘ডিসকোর্স এন্ড পাওয়ার’ (Discourse and Power) তত্ত্বের আলোকে বিচার করা যায়। নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এক বিকল্প ডিসকোর্স বা বয়ান তৈরি করেছিলেন যা তৎকালীন ঔপনিবেশিক ক্ষমতা কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। তিনি কবিতার মাধ্যমে কেবল আবেগ সঞ্চার করেননি, বরং তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের নৈতিক ভিত্তিকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি যখন বলেন, “রাজার প্রাসাদ হইবে চূর্ণ, মানুষের অধিকার হইবে পূর্ণ,” তখন তা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, বরং এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে ধ্বনিত হয়। নজরুলের কবিতা পাঠ করা মানেই ছিল তৎকালীন সময়ে এক নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ এবং এক পবিত্র যুদ্ধের আহ্বান।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ‘অগ্নিবীণা’র প্রাসঙ্গিকতা তলিয়ে দেখা জরুরি। আজ যখন পৃথিবী জুড়ে নব্য-ঔপনিবেশিকতা, ধর্মীয় ও জাতিগত অসহিষ্ণুতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন নজরুলের সেই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী কণ্ঠস্বর বড় বেশি প্রয়োজন। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল সর্বজনীন। তিনি কোনো বিশেষ দেশ বা ধর্মের জন্য বিদ্রোহ করেননি; তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন মানুষের অপমান আর লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে। “আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের, / আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষজ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!” এই পংক্তিগুলোতে যে দরদ ও সহমর্মিতা ফুটে উঠেছে, তা নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার অপর পিঠ। তিনি কঠোর ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কিন্তু কোমল ছিলেন আর্তের প্রতি। এটিই হলো নজরুলের কবিতার নন্দনতত্ত্বের দ্বান্দ্বিকতা যেখানে রুদ্র ও মধু সমান তালে বহমান। আধুনিক উত্তর-উপনিবেশবাদী বা ‘পোস্ট-কলোনিয়াল’ সাহিত্যে নজরুলের এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান এক আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফ্রান্তজ ফ্যানন তাঁর ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ গ্রন্থে শোষিত মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির কথা বলেছিলেন, নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ যেন তার বহু দশক আগের এক সার্থক কাব্যিক রূপায়ণ।
‘অগ্নিবীণা’র কাব্যিক উৎকর্ষের আলোচনায় এর শৈল্পিক কাঠামোর দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। বারোটি কবিতার এই সংকলনটি এক অদ্ভুত সংহতিতে গ্রথিত। ‘প্রলয়োল্লাস’ দিয়ে শুরু এবং ‘মোহররম’ বা ‘কোরবানী’র মতো কবিতার মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি এই পুরো বিন্যাসটিই যেন ধ্বংস থেকে পুনর্জন্মের এক মহৎ যাত্রা। কবি এখানে হাহাকারকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি কারবালা প্রান্তরের শোককে এক সংগ্রামী চেতনায় রূপান্তরিত করেছেন। নজরুলের কাছে শোক মানে ভেঙে পড়া নয়, বরং শোক মানে ত্যাগের মহিমায় দীপ্ত হওয়া। এই যে ‘স্যাক্রিফাইস’ বা ত্যাগের দর্শন, তা নজরুলের রাজনৈতিক দর্শনের মূল স্তম্ভ। তিনি বুঝেছিলেন যে রক্তদান ছাড়া স্বাধীনতা অসম্ভব। তাঁর কবিতায় তাই বারবার রক্তের ছবি ফিরে আসে। এই রক্তপাত কোনো হিংসাত্মক লালসা নয়, বরং তা হলো বন্ধনমুক্তির আবশ্যিক মূল্য। রোমান্টিক কবিদের মতো নজরুল কেবল প্রকৃতির শোভা দেখে মুগ্ধ হননি, বরং তিনি প্রকৃতির রুদ্র রূপের মধ্যে মানুষের মুক্তির পদধ্বনি শুনেছেন। তাঁর কাছে আকাশ মানে কেবল বিশালতা নয়, আকাশ মানে হলো অসীম স্বাধীনতা; সমুদ্র মানে কেবল তরঙ্গ নয়, সমুদ্র মানে হলো উত্তাল বিদ্রোহ।
সাহিত্যের সমালোচকরা অনেক সময় অভিযোগ করেন যে নজরুলের কবিতা শিল্পগুণের চেয়ে প্রচারধর্মিতা বা ‘প্রোপাগান্ডা’র দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু এই অভিযোগটি নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। থিওডোর অ্যাডর্নো বা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতো ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের তাত্ত্বিকরা মনে করেন যে, শিল্প সবসময়ই একটি রাজনৈতিক অবস্থান ধারণ করে। শিল্প যখন জীবনের গভীরতম সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা কেবল ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে ‘জীবনের জন্য শিল্প’। নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ এই অর্থে একটি সফল শৈল্পিক সৃষ্টি যে, এটি তার সময়ের মানুষের চাহিদাকে ধারণ করতে পেরেছিল এবং একই সঙ্গে এক কালজয়ী নান্দনিকতা দান করেছিল। নজরুলের শব্দের ঝঙ্কার, তাঁর উপমা-উৎপ্রেক্ষার অভিনবত্ব এবং তাঁর ছন্দের বলিষ্ঠতা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ব্যাকরণ তৈরি করেছে। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, কবিতা কেবল ড্রয়িংরুমের শৌখিন বস্তু নয়; তা হতে পারে রাজপথের মিছিলের স্লোগান এবং একই সঙ্গে তা হতে পারে নির্জন আত্মার আকুল প্রার্থনা।
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রভাবের বিষয়টিও ‘অগ্নিবীণা’র প্রেক্ষিতে আলোচিত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নজরুলের পরম শ্রদ্ধেয় ‘গুরুদেব’, কিন্তু কাব্যিক দিক থেকে নজরুল রবীন্দ্রনাথের বলয় থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের যে সুষমা ও স্থিতপ্রজ্ঞ দর্শন, নজরুল তাকে ভেঙে চুরমার করে এক অস্থির ও গতিশীল জগৎ তৈরি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যেখানে উপনিষদিক শান্তিতে আসীন, নজরুল সেখানে পুরাণের প্রলয়-বিষাণে মগ্ন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই নজরুলের এই সামর্থ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে। তিনি বুঝেছিলেন যে নজরুল হলেন সেই ‘বসন্ত’ যা জরাজীর্ণতাকে বিদায় দেয়। ‘অগ্নিবীণা’র কবিতাগুলো পাঠ করলে বোঝা যায় যে, নজরুল রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত এক স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি তৈরি করেছিলেন যা পরবর্তীকালে আধুনিক বাংলা কবিতার পথ প্রশস্ত করেছিল। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বা বুদ্ধদেব বসুর মতো আধুনিক কবিরা নজরুলের এই ভাষাভঙ্গি থেকে সরাসরি রসদ না নিলেও, নজরুলের তৈরি করে দেওয়া সেই স্বকীয়তার পথ ধরেই তাঁরা এগিয়েছিলেন। কবি যদি প্রথাগত রবীন্দ্র-বলয়কে প্রথম সজোরে ধাক্কা না দিতেন, তবে বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন হয়তো আরও বিলম্বিত হতো।
‘অগ্নিবীণা’র একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দিক হলো এর ‘নারীবাদী’ পাঠের অবকাশ। যদিও নজরুলের পূর্ণাঙ্গ নারীবাদী চেতনা তাঁর ‘নারী’ কবিতায় সম্যক প্রকাশিত, তবে ‘অগ্নিবীণা’র ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় তিনি নারীর যে রণরঙ্গিণী রূপ দেখিয়েছেন, তা তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। তিনি নারীকে কেবল কোমলতা বা করুণার আধার হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে অসীম শক্তির আকর হিসেবে কল্পনা করেছেন। নজরুলের এই শক্তি-সাধনা মূলত বাংলার তান্ত্রিক ও লোকজ ঐতিহ্যের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তিনি বীরত্বের সাধনায় লিঙ্গবৈষম্যকে স্বীকার করেননি। তাঁর চোখে মুক্তিপাগল মানুষ লিঙ্গ-পরিচয় ছাপিয়ে এক বৃহত্তর সংগ্রামী সত্তা। এই যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবনা, তা নজরুলের মানবিক দর্শনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি মানুষের মর্যাদাকে সকল পরিচয়ের উর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। এই কারণেই তাঁর কবিতায় চোর, ডাকাত, বারবণিতা থেকে শুরু করে সাধারণ মজুর সবাই সমান গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। নজরুলের এই সমাজতান্ত্রিক সংবেদনশীলতা ‘অগ্নিবীণা’র পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে।
‘অগ্নিবীণা’র ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কেবল একটি কবিতার বই হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দলিল। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি বাঙালি মুসলমানের মনে এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটিয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে মুসলমান সম্প্রদায় এক প্রকার হীনম্মন্যতায় ভুগছিল, নজরুল তাদের সোনালী অতীত আর বীরত্বগাথা শুনিয়ে তাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন। আবার একই সাথে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেও হয়ে উঠেছিলেন সমভাবে আদরণীয়। এই যে একটি অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি নির্মাণ, নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ সেখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভাষা যখন অকৃত্রিম হয়, তখন তা সমস্ত কৃত্রিম বিভেদ ঘুচিয়ে দিতে পারে। নজরুলকে তাই কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করা তাঁর প্রতি কিছুটা অবিচারই; তিনি ছিলেন মূলত এক ‘সমন্বয়বাদী কবি’। তাঁর বিদ্রোহ ছিল বিভেদের বিরুদ্ধে, তাঁর সংগ্রাম ছিল ঐক্যের জন্য। ‘অগ্নিবীণা’র বারোটি কবিতা যেন বারোটি প্রদীপ্ত মশাল, যা অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথ দেখায়।
কাজী নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কেবল ছাপানো কিছু অক্ষরের সমাহার নয়, এটি একটি জীবন্ত চেতনা। এটি আমাদের ইতিহাসের অংশ, আমাদের সংগ্রামের সারথি। রবীন্দ্রনাথের বাঁশিতে যদি পাওয়া যায় আত্মার শান্তি, তবে নজরুলের বীণায় পাওয়া যায় অস্তিত্বের লড়াই। এই কাব্যের প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন একেকটি অগ্নিবিন্দু, যা আমাদের চেতনার অন্ধকার দূর করে।
হয়তো নজরুল নিজেই পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না তাঁর এই সৃষ্টি মহাকালের ধুলোয় কতটুকু টিকে থাকবে। কিন্তু আজ একশ বছর পরে এসে আমরা দেখছি, ধুলো জমার বদলে এর উজ্জ্বলতা আরও বেড়েছে। এটি কেবল বাঙালির নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শোষিত মানুষের এক অবিনাশী ইশতেহার। এই রুদ্র-নান্দনিকতার ভেতর দিয়ে আমরা যে সত্যের সন্ধান পাই, তা হলো মানুষের মুক্তির চেয়ে বড় কিছু নেই।
‘অগ্নিবীণা’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি হলো প্রতিটি শৃঙ্খলিত মানুষের বুকের ধুকপুকুনি; এটি হলো অনন্তকালের সেই তর্জনী যা অবিরাম অন্যায়ের দিকে নির্দেশ করে। নজরুলের অগ্নিবীণা তাই কোনোদিন স্তব্ধ হবে না; যতক্ষণ পৃথিবীতে অবিচার থাকবে, ততক্ষণ এই বীণার ঝংকার বাজবে মানুষের মিছিলে, প্রান্তরে এবং বিপ্লবী চেতনার অতল গহীনে। মহাকালের ললাটে ‘অগ্নিবীণা’ এক অবিনাশী জ্যোতিষ্ক হয়ে জ্বলবে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত করবে মুক্তির অমোঘ মন্ত্র। নজরুল কেবল তাঁর নির্দিষ্ট সময়ের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন আগত সকল সময়ের সারথি। ‘অগ্নিবীণা’র সেই প্রলয়-নেশা বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত থাকে নূতনের আবাহন। তাই নজরুলের এই কাব্য আজ কেবল গবেষণার বিষয় নয়, বরং তা হলো জীবন সংগ্রামের অপরিহার্য পাথেয়। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে ‘অগ্নিবীণা’ এক চিরস্থায়ী অগ্নিনিঝর হিসেবে প্রবহমান থাকবে, যা মানুষের মেরুদণ্ডকে সতেজ রাখবে এবং কণ্ঠকে করবে নির্ভীক। কবি নজরুলের ভাষায় সেই চিরন্তন প্রত্যয় নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে মানুষ হবে সকল ক্ষমতার উৎস এবং সাম্যই হবে শেষ সত্য।
“গাহি সাম্যের গান / যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, / যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রীষ্টান।” এই উদারতা ও বীরত্বের যে অঙ্কুর ‘অগ্নিবীণা’য় রোপিত হয়েছিল, তা-ই আজ মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় চেতনার মূলে। এই কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা মানেই হলো সেই মহান কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা, যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন মানবতার বেদীতে।
কবির সেই অজেয় স্বপ্ন যেখানে ‘অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না’ তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি সত্য, কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু তিনি আমাদের ডিএনএ-তে মিশিয়ে দিয়ে গেছেন। তাই অগ্নিবীণা অমর, অবিনাশী এবং চিরযৌবনা। যতদিন মানুষের হৃদয়ে মুক্তির লালসা থাকবে, ততদিন অগ্নিবীণা আমাদের রক্তে স্ফুলিঙ্গ ছড়াবে। জয় হোক মানুষের, জয় হোক সেই চিরবিদ্রোহী প্রাণের, যিনি শিখিয়েছিলেন আগুনের বীণায় কীভাবে স্বাধীনতার সুর বাঁধতে হয়।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২২ বার পড়া হয়েছে