আকাশপ্রদীপ ও অগ্নিবীণা
নজরুলের মহাজাগতিক পরিব্রাজন ও উত্তর-আধুনিক আর্তমানবতা
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও জীবনদর্শন কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ধর্ম কিংবা জাতির সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল না। সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা, নারী-পুরুষের সমতা এবং শোষণবিরোধী চেতনার মধ্য দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক বিশ্বজনীন মানবতার দর্শন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা ভাবধারা, পুরাণ, সুফি-মরমীবাদ ও লোকজ ঐতিহ্যের সৃজনশীল সংশ্লেষে নজরুলের সাহিত্য আজও বৈশ্বিক মানবিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক সত্তা কোনো খণ্ডিত ভূখণ্ডের ফসল নয়। নজরুল ছিলেন সেই পথিক, যিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এক নিগূঢ় সংশ্লেষ ঘটিয়েছিলেন তাঁর কলমে। তাঁর দর্শন কোনো একদেশদর্শী সংকীর্ণতা নয়, বরং তা ছিল একটি ‘ইউনিভার্সাল কসমোপলিটানিজম’ বা বিশ্বজনীন নাগরিকতার এক বলিষ্ঠ ইশতেহার। তাঁর চিন্তা যেন সেই গহীন অরণ্যের মতো, যেখানে হাজারো বৈচিত্র্যের মাঝেও এক অদ্ভুত ঐক্য লুকিয়ে থাকে।
নজরুলের এই বৈশ্বিক মানস গঠনের মূলে ছিল তাঁর বিচিত্র ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবন। বিশ শতকের শুরুর সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন থামল, এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন যখন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে, ঠিক তখনই যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে এলেন এক সৈনিক। এই সামরিক জীবন নজরুলের মধ্যে কেবল শৃঙ্খলাই আনেনি, বরং সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন রূপটি দেখার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন, মানুষের রক্ত দিয়ে কীভাবে রাজশক্তি নিজেদের সিংহাসন শক্ত করে। এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যতত্ত্বের অনেক আগেই নজরুল বুঝেছিলেন যে, পশ্চিমের সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে মনের ভেতরে আগে স্বাধীনতার বীজ বুনতে হবে। নজরুল জানতেন, পরাধীনতা কেবল ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষত নয়, এটি সারা বিশ্বের শৃঙ্খলিত জাতিগুলোর এক সাধারণ আর্তি। তাই তাঁর লেখনীতে তুরস্কের কামাল পাশা, মিশরের আনোয়ার পাশা কিংবা আয়ারল্যান্ডের মুক্তি সংগ্রামের বীর সেনানীরা অনায়াসেই প্রাণের সখা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি যখন লিখছেন, “ঐ খ্যাপাটা পাগল করে দিচ্ছে আমার কামাল ভাই,” তখন সেটি কেবল একজন বিদেশি নেতার স্তুতি ছিল না; সেটি ছিল বিশ্বজুড়ে চলা মুক্তিপাগল মানুষের এক গোপন সংহতি। নজরুলের এই আন্তর্জাতিকতাবোধ তাঁকে তাঁর সমসাময়িক অন্যদের থেকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় যেখানে আকাশ আর মাটি মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এক অদ্ভুত মায়ার আবরণে ঢাকা সাম্যবাদ। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের ঢেউ যখন বাংলার মাটিতে পৌঁছাল, নজরুল তখন অন্য এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। তাঁর ‘কুলি-মজুর’ বা ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের পঙক্তিগুলো পড়লে মনে হয়, তিনি যেন কার্ল মার্ক্স বা এঙ্গেলসের সেই তাত্ত্বিক কচকচানিকে এক নিমিষে সাধারণ মানুষের প্রাণের ভাষায় রূপান্তর করেছেন। তবে নজরুলের এই সাম্যবাদ কেবল যান্ত্রিক বস্তুবাদ ছিল না। এতে মিশে ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক মরমীবাদ। তিনি ইউরোপীয় সমাজতন্ত্রের সাথে ভারতীয় ঋষি-দর্শন এবং সুফি মরমীবাদের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না। ধর্মের বিভেদ, জাতির অহংকার সবকিছুই তাঁর কাছে তুচ্ছ মনে হতো যখন তিনি দেখতেন একজন মানুষ অন্য মানুষের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছে। “নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম-জাতি” এই পঙক্তিটি যখন উচ্চারিত হয়, তখন যেন পৃথিবীর সমস্ত সীমান্তগুলো ধুলোয় মিশে যায়। নজরুল এখানে কেবল এক কবির ভূমিকা পালন করেননি, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন সেই ‘সাবল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বর, যাঁদের কথা বলার অধিকার সমাজ কেড়ে নিয়েছিল। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তোলেন ‘Can the Subaltern Speak?’, নজরুল যেন তার উত্তর দিয়ে গেছেন বহুকাল আগে, শোষিত মানুষের বুকের ভেতরে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে।
নজরুলের বিশ্ববীক্ষার আরেকটি দিক হলো তাঁর সাংস্কৃতিক সংশ্লেষণ ও পুরাণের সার্থক ব্যবহার। তিনি জানতেন, শিল্পীর কোনো জাত নেই, শিল্পের কোনো সীমান্ত নেই। তাই তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আমরা দেখি এক মহাজাগতিক কোলাজ। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতীকগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলা, এটিই ছিল নজরুলের ‘কসমোপলিটান’ বা বিশ্বনাগরিক চেতনার শ্রেষ্ঠ ফসল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সৃজনশীলতার উৎস এক এবং অভিন্ন। ফ্রাঞ্চ ফ্যানোন যেমন তাঁর লেখায় ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন, নজরুল তাঁর কাব্যে সেই লড়াইকে এক অনন্য নন্দনতাত্ত্বিক রূপ দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, মুক্তি কেবল বন্দুকের গুলিতে আসে না, মুক্তি আসে মনের শিকল ছিঁড়লে। গ্রিক ট্র্যাজেডি আর পারস্যের মরমী সুফিবাদ তাঁর কলমে এসে একাকার হয়ে গিয়েছিল, যেন এক বিশাল নদীর মোহনায় এসে সব স্রোত শান্ত হয়েছে।
নারীর অধিকার বা লিঙ্গ সাম্যের প্রশ্নে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আজকের যুগের যে কোনো প্রগতিশীল আন্দোলনের চেয়ে অনেক বেশি ঋদ্ধ ও গভীর। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বড় বড় সেমিনার করি, তখন ১৯২৬ সালে নজরুলের সেই অমোঘ উচ্চারণ আমাদের লজ্জিত করে: “বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” সিমন দ্য বোভোয়ারের ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ প্রকাশিত হওয়ার কত আগে নজরুল নারীর এই ঐতিহাসিক মর্যাদাকে কাব্যের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন! তাঁর কাছে নারী কোনো পণ্য ছিল না, ছিল না কোনো অবলা মূর্তিও। তিনি নারীকে দেখেছেন ‘বিজয়িনী’ হিসেবে, শক্তির আধার হিসেবে। আজকের এই যুগেও নজরুলের সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পথ দেখায়, যখন আমরা এখনো লিঙ্গবৈষম্যের অন্ধকার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি।
নজরুলের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে যদি অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোয় মাপা হয়, তবে দেখা যায় জঁ-পল সার্ত্র বা আলবেয়ার কামুর ‘অ্যাবসার্ডিটি’ এবং ‘ফ্রিডম’-এর ধারণার সাথে এর এক নিবিড় আত্মীয়তা রয়েছে। নজরুলের কবিতায় বারবার ফিরে আসা সেই ‘আমি’ শব্দটি আসলে কোনো কবির ব্যক্তিগত দম্ভ নয়। এটি হলো নিটশের ‘ওভারম্যান’ বা ‘উবারমেনশ’-এর এক কাব্যিক রূপান্তর। তিনি যখন বলেন, “আমি চির উন্নত শির,” তখন তিনি আসলে পৃথিবীর সমস্ত শৃঙ্খলিত আত্মার হয়ে কথা বলেন। এই ‘আমি’র ভেতরে মিশে আছে ফিলিস্তিনের সেই শিশুটির আর্তি, যার শৈশব কেড়ে নিয়েছে যুদ্ধ; মিশে আছে আফ্রিকার সেই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের লড়াই, যারা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আজও লড়ছে। নজরুলের এই বিদ্রোহী সত্তা কোনো দেশ বা কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি মহাজাগতিক শক্তি, যা অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি মূলত এক ‘গ্লোবাল প্রোটেস্ট এনথেম’, যা ভাষার দেয়াল ভেঙে মানুষের হৃদয়ে বিপ্লবের স্পন্দন জাগিয়ে তোলে। কবি যেন বলতে চান, যতক্ষণ একজনের চোখে জল থাকবে, ততক্ষণ কবির লড়াই থামবে না।
বর্তমান ২০২৬ সালের বিশ্ব বাস্তবতায় নজরুলের এই বৈশ্বিক চেতনার প্রয়োজনীয়তা কেন এতো বেশি অনুভূত হচ্ছে? পৃথিবী আজ উগ্র জাতীয়তাবাদ আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার এক নতুন সংকটে আক্রান্ত। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমরা মানুষের হৃদয়কেও আজ খণ্ড খণ্ড করে ফেলছি। এই সময়ে নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতাটি হতে পারে আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র জাদুমন্ত্র। কৃত্রিম বিভেদ তৈরি করে মানুষকে শাসন করার রাজনীতি, তার বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন এক একক পাহাড়ের মতো অটল। এমনকি আধুনিক পরিবেশবাদী বা ‘ইকো-ক্রিটিসিজম’-এর দৃষ্টিতেও নজরুলের কাব্যে প্রকৃতির যে রূপ পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। তিনি প্রকৃতিকে কেবল প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন। এই যে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবা আজ পৃথিবীকে গ্রাস করছে, নজরুলের সেই প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ আমাদের নতুন করে শিখিয়ে দেয় যে, মাটি আর মানুষের সম্পর্কটি কতটা গভীর।
পারস্যের আধ্যাত্মিকতা এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের মধ্যে নজরুল যে সেতু নির্মাণ করেছিলেন, তা তাঁর ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রাম ধারণারই এক প্রাথমিক ও সফল প্রয়োগ। হাফিজ, রুমি কিংবা ওমরের রুবাইয়াতের যে সুধা তিনি পান করেছিলেন, তা তিনি অবলীলায় পৌঁছে দিয়েছিলেন বাংলার গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে। তাঁর গজলগুলোতে যে বিচ্ছেদ আর আধ্যাত্মিকতার সুর বাজে, তা আসলে এক বৈশ্বিক প্রেমের ভাষা।
নজরুলের সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোতে যে দূরদৃষ্টি ছিল, তা আজকেও অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষককে বিস্মিত করে। ‘ধূমকেতু’ কিংবা ‘লাঙ্গল’ পত্রিকায় তিনি যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতন নিয়ে আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর দৃষ্টি ছিল সারা বিশ্বের শোষিত মানুষের মুক্তির দিকে। তিনি জানতেন, সাম্রাজ্যবাদ কেবল একটি দেশ দখল করে না, বরং সেটি একটি জাতির মনস্তত্ত্বকে পঙ্গু করে দেয়। তাই তিনি বারবার শিক্ষার প্রসার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। নজরুলের বৈশ্বিক চেতনা ছিল মূলত এক অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি বা ‘ইনক্লুসিভ কালচার’-এর বহিঃপ্রকাশ। তিনি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে কোনো মানুষ তার জাতি বা ধর্মের পরিচয় দিয়ে ছোট হবে না, বরং তার মনুষ্যত্বই হবে তার একমাত্র পরিচয়।
হেমন্তের এই বিকেলে যখন জানলার বাইরে গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে, তখন নজরুলের সেই ‘মহা-বিদ্রোহী’ রূপটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তিনি কি কেবল একজন কবি ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন এক মহাজাগতিক পরিব্রাজনকারী, যিনি এসেছিলেন আমাদের ঘুমন্ত আত্মাকে জাগিয়ে তুলতে? তাঁর সাহিত্যিক পরিক্রমা শুরু হয়েছিল এক অখণ্ড মানবতার জয়গান দিয়ে এবং আমৃত্যু তিনি সেই পথেই অবিচল ছিলেন। নজরুলের আন্তর্জাতিকতাবাদ কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি তাত্ত্বিক বিষয় ছিল না, এটি ছিল তাঁর রক্ত-মাংসের অভিজ্ঞতা থেকে নিংড়ানো এক ধ্রুব সত্য।
নজরুল আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যে, মানুষের মুক্তি কেবল সাম্যের পথে, কেবল ভালোবাসার পথে। ভৌগোলিক সীমানা কেবল মানচিত্রের কিছু রেখা হতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের কোনো কাটাতারের বেড়া হয় না। তিনি ছিলেন সেই অগ্রপথিক, যিনি বিশ্বনাগরিকতার স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পৃথিবী যুদ্ধের বারুদ গন্ধে ছিল বিষাক্ত। নজরুলের কবিতা ও জীবনদর্শন আজও সেই চিরন্তন সত্যের কথা বলে মানুষের জয়গানই শেষ কথা। যতক্ষণ পৃথিবীতে বৈষম্য থাকবে, যতক্ষণ একজন মানুষ অন্যের হাতে নিগৃহীত হবে, ততক্ষণ নজরুলের সেই রণ-সংগীত বেজে উঠবে প্রতিবাদী কণ্ঠে।
নজরুলকে নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ হয়তো কোনোদিন শেষ হবে না। কারণ তিনি নিজেই এক অসীম সমুদ্র। তাঁর বৈশ্বিক উত্তরাধিকার বহন করা আজকের প্রজন্মের জন্য এক পবিত্র দায়িত্ব। নজরুল আছেন এবং থাকবেন শৃঙ্খলমুক্তির প্রতিটি মিছিলে, সাম্যের প্রতিটি গানে এবং মানুষের হৃদয়ের সেই নিভৃত কোণে, যেখানে আজও মানবতার প্রদীপ টিমটিম করে হলেও জ্বলছে। তিনি এক কালজয়ী আলোকবর্তিকা, যা আমাদের অন্ধকারের পথ পেরিয়ে এক নতুন ভোরের দিকে নিয়ে যায়। নজরুলের সেই অবিনশ্বর কথাগুলোই যেন কান পাতলে শোনা যায় বাতাসে অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ যেদিন রণভূমে রণিবে না, সেদিনই হবে তাঁর বিদ্রোহের সার্থকতা। সেই শান্তির জন্য, সেই সাম্যের জন্য আমাদের পথচলা চলুক নজরুলেরই দেখানো আলোয়। এই মহানাগরিকের চেতনা চিরকাল মহাকাশের নীলিমায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকুক মানুষের জয় হোক, মানবতার জয় হোক। নজরুল ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন আমাদের প্রতিদিনের লড়াই আর ভালোবাসায় এক শাশ্বত ধ্রুবতারার মতো। হয়তো কোনো একদিন সেই স্বপ্ন সত্যি হবে, যেখানে পৃথিবী হবে একটিই অঙ্গন, আর মানুষ হবে সেই বিশাল আঙিনার এক একজন মহানাগরিক। কবি যেন সেই দিনের অপেক্ষায় এখনো পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর অগ্নিবীণা হাতে নিয়ে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২১ বার পড়া হয়েছে