মৃত্তিকার ধূলিকণা থেকে নক্ষত্রলোকের সংকেত
নজরুলের কবিতায় মহাজাগতিক মানবতাবাদ ও এক অবিনশ্বর আর্তি
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার যে সম্মিলিত রূপ ফুটে উঠেছে, তা কেবল একটি সময় বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কবিতার মানুষ কখনো শোষিত শ্রমজীবী, কখনো ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো মানবসত্তা, আবার কখনো নারী-পুরুষের সমতার প্রতীক। নজরুলের এই মানবতাবাদ ব্যক্তিমানুষের মর্যাদা থেকে শুরু করে বিশ্বমানবতার এক বৃহত্তর স্বপ্নে পৌঁছে যায়।
নজরুল কি কেবল এক বিদ্রোহী কবি ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন এক অখণ্ড মহাজাগতিক চেতনার কারিগর? তাঁর কবিতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, সেখানে মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের এক সীমাবদ্ধ জীব নয়; বরং সে এক অনন্ত নক্ষত্রবীথি, যা অন্ধকার কালরাত্রির বুক চিরে আলোর জয়গান গেয়ে চলে। তাঁর মানবতাবাদ কোনো কাগুজে ইশতেহার ছিল না, ছিল না কোনো রাজনৈতিক স্লোগান। তা ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক আর মর্মভেদী অনুভবের নির্যাস। তিনি মানুষকে ‘ক্ষুদ্র আমি’র অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে টেনে বের করে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন ‘বিরাট আমি’-র সেই অসীম আঙিনায়, যেখানে আকাশ আর মাটি মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
নজরুলের সাম্যবাদকে বুঝতে গেলে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক তত্ত্বের চশমা পরলে চলে না। তিনি যখন গেয়ে ওঠেন, “গাহি সাম্যের গান / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,” তখন সেখানে কেবল অধিকার আদায়ের লড়াই থাকে না, থাকে মানুষের প্রতি এক সুগভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আচ্ছা, একটু ভেবে দেখা যাক তো, এই যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কুলি কিংবা ঘাম ঝরানো মজুর—এরা কি কেবলই শ্রমের একক? নজরুলের কাছে তারা ছিল সৃষ্টির আদি কারিগর। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে আমরা যাকে আধিপত্যবাদ বা ‘হেজেমনি’ বলি, নজরুল তার অনেক আগেই বুঝেছিলেন যে, বঞ্চনার অবসান কেবল মিছিলে হয় না, তা হয় হৃদয়ের সিংহাসনে অবহেলিত মানুষকে বসাতে পারলে।
তাঁর কবিতায় শ্রমজীবীদের ঘাম আর চোখের জলের মধ্যে এক অপার্থিব পবিত্রতা ফুটে ওঠে। তিনি যেন মাটির নিচের অন্ধকার খনি থেকে হীরে খুঁজে এনেছিলেন। এই যে ব্রাত্য মানুষকে দেবতার আসনে বসানো, এটা কি সাধারণ কোনো কথা? এটিই তো নজরুলের মানবতাবাদের প্রথম সোপান। তাঁর কাছে মানুষ কোনো অর্থনৈতিক যন্ত্র নয়, বরং এক অবিনশ্বর আত্মার স্ফুলিঙ্গ। কেউ যখন কোনো মানুষকে অপমান করে, নজরুল যেন অনুভব করতেন, সেই অপমান আসলে সমগ্র মহাবিশ্বের সৃজনশীলতাকেই অস্বীকার করা। নদী যেমন কাউকে তপ্ত রোদে জল দিতে কার্পণ্য করে না, নজরুলও তেমনি মানুষের মর্যাদাকে কোনো ভৌগোলিক বা ধর্মীয় সীমারেখায় আটকে রাখেননি।
একটু দার্শনিক দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যায়, নজরুলের চেতনায় সুফিবাদ আর অদ্বৈতবাদের এক অদ্ভুত মিলন ঘটেছিল। সুফি দর্শনে ‘ইনসান-ই-কামিল’ বা পূর্ণ মানবের যে ধারণা, তাঁর কবিতায় তার প্রতিধ্বনি বারবার পাওয়া যায়। নিজের ভেতরের বিশালতাকে আবিষ্কার করা—এটাই তো ছিল তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি। ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র্ যখন বলেন যে মানুষের অস্তিত্বই সবকিছুর আগে, নজরুলও যেন তার বহু আগে সেই কথাই বলে গিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন, দাসত্ব কেবল শিকলে হয় না, দাসত্ব হয় মনে। আর সেই মনের শিকল ভাঙার জন্যই তিনি শোনাতেন অভয়ের বাণী।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু এই ‘আমি’ কি কেবল নজরুল? না, এই ‘আমি’ হলো পৃথিবীর প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের সমষ্টিগত কণ্ঠস্বর। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যে ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষের কথা বলেছেন, নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা যেন সেই প্রান্তিকতার অন্ধকার থেকে উঠে আসা এক অগ্নিগিরি। তিনি যখন বলেন, “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ,” তখন তিনি আসলে মানুষের সেই অন্তর্নিহিত রাজকীয় শক্তির জয়গান করেন যা তাকে যেকোনো বাহ্যিক শোষণের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে।
নজরুলের বিদ্রোহ আলব্যের কামুর সেই ‘রেবেল’-এর মতো—যে বিদ্রোহ করে ধ্বংসের নেশায় নয়, বরং এক শান্তিময় এবং মানবিক বিশ্ব গড়ার আকুলতায়। তাঁর কাছে বিদ্রোহ মানেই হলো স্থবিরতা আর জরাজীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রাণের চঞ্চল বহিঃপ্রকাশ। এই প্রাণশক্তিই তো মানুষকে মহাকাশের নক্ষত্রমণ্ডল ছাড়িয়ে এক অনন্ত যাত্রার পথিক করে তোলে। তিনি যখন ‘বল উন্নত মম শির’ বলেন, তখন তিনি প্রতিটি মানুষকে তার নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখান। আজকের এই কর্পোরেট দুনিয়ায় যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত মাথানত করে বাঁচতে অভ্যস্ত হচ্ছে, সেখানে নজরুলের এই আহ্বান যেন এক শীতল জলের ঝাপটা।
সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যখন এই উপমহাদেশকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে, নজরুল তখন এক অখণ্ড মানবিক ঐতিহ্যের সেতু নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর লেখনীতে শ্যামাসঙ্গীত আর ইসলামি গজল কীভাবে যেন হাত ধরাধরি করে চলত।
একবার ভাবুন তো সেই দৃশ্য—একদিকে উত্তাল সমুদ্র, অন্যদিকে ডুবন্ত এক নৌকা। সেখানে কি কেউ জানতে চায় কে হিন্দু আর কে মুসলিম? নজরুল সেই অমোঘ প্রশ্নটিই করেছিলেন, “হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন? / কাণ্ডারী! বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।” এই যে মানুষকে স্রেফ ‘মায়ের সন্তান’ হিসেবে দেখা, এর চেয়ে বড় মানবতাবাদ আর কী হতে পারে? তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় স্বরকে একীভূত করতে চাননি, বরং তাদের মধ্যে এক অপূর্ব সংলাপ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। মিখাইল বাখতিনের সেই ‘ডায়ালজিক’ থিওরির মতো নজরুলও চেয়েছিলেন প্রতিটি সত্তা তার নিজস্বতা নিয়েই এক বৃহত্তর মানবিক ঐকতানে মিশে যাক।
নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে নজরুল যা বলে গেছেন, তা আজও কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। তাঁর ‘নারী’ কবিতাটি কেবল কয়েকটা পঙ্ক্তি নয়, তা ছিল লিঙ্গীয় সমতার এক কালজয়ী ইশতেহার। সিমোন দ্য বোভোয়ার তাঁর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে নারীর যে অধস্তন অবস্থানের বর্ণনা দিয়েছেন, নজরুল তার অনেক আগেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, সভ্যতা কোনো একপক্ষীয় দান নয়।
তিনি সজোরে ঘোষণা করেছিলেন, “বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” নজরুলের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে একজন আধুনিক অগ্রপথিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি নারীকে কেবল ভোগের বস্তু বা সেবিকা হিসেবে দেখেননি, বরং এক তেজস্বিনী মানবী হিসেবে সম্মান করেছেন। তাঁর কবিতায় নারী ও পুরুষ যেন প্রকৃতির দুই অবিচ্ছেদ্য সত্তা—যাদের একজনের অভাবে অন্যজন অসম্পূর্ণ। এই সমতা যখন সমাজে ফিরে আসবে, তখনই হয়তো নজরুলের স্বপ্ন সফল হবে।
নজরুলের মানবাত্মা ছিল গতিশীল। তিনি স্থবিরতাকে মৃত্যু মনে করতেন। পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকা তাঁর স্বভাব ছিল না। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় তিনি এক প্রলয়ঙ্করী সুন্দরের আবাহন করেছেন। তিনি জানতেন, জঞ্জাল পরিষ্কার না করলে নতুনের চারা রোপণ করা সম্ভব নয়। ফ্রেডরিখ নিৎশে-র ‘অতিমানব’ বা ‘উবারমেনশ’-এর কথা আমরা জানি, কিন্তু নজরুলের এই অতিমানব অনেক বেশি সংবেদনশীল। সে কেবল শক্তিশালী নয়, সে দয়ালুও বটে।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেখি ইউক্রেন থেকে গাজা—পৃথিবীর প্রতিটি কোণ ক্ষমতার দম্ভে আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে আছে, তখন নজরুলের সেই ঘোষণাটি কত বেশি জরুরি মনে হয়: “মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত / আমি সেই দিন হব শান্ত / যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না।” এই শান্ত হওয়ার শর্তটিই বলে দেয় তাঁর হৃদয়ে মানুষের জন্য কতটা হাহাকার ছিল। তিনি নিজে শান্তিতে থাকতে পারতেন, কিন্তু অন্যের চোখের জল তাঁকে ঘুমাতে দিত না। আজ বিশ্বশান্তির যত বড় বড় আলোচনা হোক না কেন, নজরুলের এই ‘বিদ্রোহী এবং প্রেমিক’ সত্তার সমন্বয় ছাড়া কি তা আদেও সম্ভব?
মানুষের লোভ যখন প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তখন নজরুলের ‘মৃত্তিকা-লগ্নতা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এই পৃথিবীর মালিক নই, বরং অংশীদার। তিনি আকাশকে ভালোবাসতেন, কিন্তু মাটির ধূলিকণাকে কখনো ছোট করে দেখেননি। আজকের কৃত্রিম এই পৃথিবীতে নজরুলের কবিতা যেন এক চিলতে সবুজ ঘাসের মতো, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যন্ত্র নই, আমরা মানুষ।
নজরুলের আন্তর্জাতিকতা ছিল এক বিশাল আকাশ। তিনি কেবল বাংলার কবি ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বের লাঞ্ছিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তুরস্কের কামাল পাশা থেকে শুরু করে মিশরের জাগলুল পাশা পর্যন্ত—বিশ্বের যেখানেই স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছে, নজরুল সেখানেই তাঁর কলমকে তলোয়ারের মতো ব্যবহার করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, এক দেশের মানুষের মুক্তি অন্য দেশের মানুষের মুক্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ফ্রান্তজ ফানোর ‘দ্য রেচেড অফ দ্য আর্থ’ গ্রন্থে শোষিতের যে মনস্তত্ত্ব আর তাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বর্ণিত হয়েছে, নজরুলের কবিতায় তার সার্থক কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানায় নিজেকে আটকে রাখেননি। তাঁর কাছে মানবতা ছিল এক অখণ্ড মহাদেশ। এই গ্লোবাল হিউম্যানিজম নজরুলকে একজন বিশ্বনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তা সে যে দেশেই হোক না কেন।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মানবাত্মা আর মানবতাবাদের যে রূপায়ণ ঘটেছে, তা স্রেফ কোনো তত্ত্বকথা নয়। তা ছিল তাঁর যাপিত জীবনের দীর্ঘশ্বাস আর সাহসের সম্মিলিত রূপ। তিনি মানুষকে সংকীর্ণ পরিচয়ের খাঁচা থেকে মুক্ত করে এক মহাজাগতিক অখণ্ডতায় প্রোথিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিদ্রোহী সত্তা যেমন অন্যায়ের সামনে অটল, তাঁর প্রেমিক সত্তা তেমনি মানবতার জন্য চির আতুঁড়।
নজরুলের এই দর্শন কোনো নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে রাখা অসম্ভব। তিনি ছিলেন এক বাঁধভাঙা জলচ্ছ্বাসের মতো, যা সব জঞ্জাল ধুয়ে মুছে এক নির্মল পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখাত। আজ ২০২৬ সালের এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর আদর্শ আর বাণীর প্রয়োজনীয়তা যেন আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। যতক্ষণ পৃথিবীতে বৈষম্য থাকবে, ততক্ষণ নজরুল থাকবেন আমাদের চেতনার ধ্রুবতারা হয়ে।
নজরুলের সেই অজেয় মানবাত্মা আমাদের প্রতিদিনের লড়াইয়ে শক্তি জোগাক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, মানুষের জয়গানই হলো মহাকালের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত। হয়তো কোনো একদিন সত্যিই এমন একটা ভোর আসবে, যেদিন মানুষের পরিচয় কেবল মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে। সেদিন হয়তো কবির সেই বিদেহী আত্মা দূর নক্ষত্রলোক থেকে মুচকি হাসবেন। নজরুলের এই শাশ্বত মানবতাবাদই হোক আগামীর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাথেয় এবং সভ্যতার আলোকবর্তিকা।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৯ বার পড়া হয়েছে