ডিজেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া বাড়ার আশঙ্কা, কত বাড়তে পারে
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে দেশের চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় দূরপাল্লার বাসে প্রতি ১০০ কিলোমিটারে জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৭১ টাকা। এতে বাসভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলেছেন পরিবহন মালিকেরা। তবে নতুন ভাড়ার চার্ট না হওয়ায় রাজধানীর অধিকাংশ বাসে সোমবারও আগের ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে।
দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। নতুন দামগুলো দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম।
ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাতে। পরিবহন মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ আসনের একটি দূরপাল্লার বাস গড়ে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার চলে। আগে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি বাবদ খরচ হতো ৩২ টাকা ৮৬ পয়সা। এখন সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ টাকা ৫৭ পয়সায়। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের খরচই বেড়েছে প্রায় ৫ টাকা ৭১ পয়সা।
সে হিসাবে ১০০ কিলোমিটার পথ চলতে আগে যেখানে ডিজেলে খরচ হতো ৩ হাজার ২৮৬ টাকা, এখন সেখানে খরচ হচ্ছে ৩ হাজার ৮৫৭ টাকা। অর্থাৎ একই দূরত্বে বাড়তি খরচ প্রায় ৫৭১ টাকা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলী থেকে ঘোড়াঘাট হয়ে পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৪৩৮ কিলোমিটার। এই রুটে একটি বাসের যাতায়াতে বা আপ-ডাউনে ২৫০ লিটারের বেশি ডিজেল লাগে। ২৫০ লিটার ধরে হিসাব করলে আগে জ্বালানি বাবদ খরচ হতো ২৮ হাজার ৭৫০ টাকা। এখন সেই খরচ বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ এক ট্রিপেই বাড়তি খরচ হচ্ছে ৫ হাজার টাকা।
বাসে গড়ে ৫০ জন যাত্রী থাকলে শুধু জ্বালানির বাড়তি খরচ যাত্রীপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা। কোনো বাস মাসে ২৫ দিন চলাচল করলে শুধু ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে মাসে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, ডলারের দাম ৮৬ টাকা ৩১ পয়সা থাকার সময়ের হিসাব ধরে বাসভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে ডলারের দাম ১২৬ টাকা পর্যন্ত উঠলেও ভাড়ার অন্যান্য উপাদানের খরচ সমন্বয় করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবহন মালিকেরা লোকসানে গাড়ি চালাচ্ছেন।
তিনি বলেন, নতুন করে তেলের দাম বাড়ায় ছোট বাস মালিকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়মিত ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। এ বিষয়ে সরকারের কাছে আজকের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আশা করছেন বলেও জানান তিনি।
মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাস মালিক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল বলেন, জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় বাসভাড়া নতুন করে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। ১০০ কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের জন্য অতিরিক্ত ৫৭১ টাকা খরচ পরিবহন মালিকদের সংকটে ফেলেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আলোচনা করছে এবং সোমবারই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
লোকাল বাসের ভাড়া নিয়েও সংকটের কথা জানান তিনি। তার ভাষ্য, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় লোকাল বাসে অনেক সময় কম ভাড়া নেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে নির্ধারিত ভাড়া ৩৩০ টাকা হলেও লোকাল বাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। অথচ ময়মনসিংহ পর্যন্ত যেতে দূরপাল্লার বাসের মতোই জ্বালানি খরচ হয়। ফলে ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হলেও বাড়তি তেলের খরচে লোকাল বাসগুলো বড় ধরনের লোকসানে পড়বে।
পরিবহন মালিকেরা বলছেন, ডলারের উচ্চমূল্য ও পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় বাসভাড়া দীর্ঘদিন সমন্বয় করা হয়নি। তাই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাড়া সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, যাত্রীদের অভিযোগ, তেলের দাম বাড়লেই বাসভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু তেলের দাম কমলে সেই অনুযায়ী ভাড়া কমানো হয় না। তাদের মতে, মানুষের আয় রাতারাতি বাড়েনি। তাই জ্বালানির বাড়তি খরচের পুরো চাপ যাত্রীদের ওপর দেওয়া হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
তবে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হলেও সোমবার রাজধানীর গণপরিবহনে এর পুরো প্রভাব দেখা যায়নি। অধিকাংশ বাসে আগের নির্ধারিত ভাড়াতেই যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে। অবশ্য দু-একটি বাসে প্রতি স্টপেজে ৫ টাকা করে বাড়তি ভাড়া চাইতে দেখা গেছে।
সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চালক, কন্ডাক্টর, সুপারভাইজার ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়।
দুপুরে পল্টন মোড়ে ঘাটারচর-মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তানগামী মালঞ্চ পরিবহনের এক কন্ডাক্টর বলেন, তারা প্রতি স্টপেজে ৫ টাকা বাড়তি ভাড়া চাইছেন। কেউ দিচ্ছেন, কেউ দিচ্ছেন না। শাহবাগ থেকে পল্টনের ভাড়া ১০ টাকা হলেও ১৫ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বনশ্রী পরিবহনের চালক আব্বাস উদ্দিন বলেন, নতুন ভাড়ার চার্ট না পাওয়ায় তারা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন না। আগের ভাড়াতেই বাস চলছে। ভিক্টর ক্লাসিকের এক চালকও জানান, ভাড়া বাড়ানোর কোনো ঘোষণা তারা পাননি।
মিরপুর থেকে গুলিস্তানগামী শিকড় ও বিহঙ্গ পরিবহনের চালক-কন্ডাক্টররাও বলেন, নতুন ভাড়ার চার্ট না পাওয়ায় আগের নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। মিডলাইন বাসের এক সুপারভাইজার জানান, চার্ট ছাড়া বাড়তি ভাড়া চাইলে যাত্রীরা আপত্তি করেন। নতুন ভাড়া নির্ধারণ হলে মালিকপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হবে।
মোহাম্মদপুর থেকে সাইনবোর্ড রুটের রজনীগন্ধা বাসের যাত্রী সিরাজুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি ভাড়া চাওয়া হতে পারে বলে তিনি ধারণা করেছিলেন। তবে কন্ডাক্টর আগের ভাড়াই নিয়েছেন। নতুন ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে চললে যাত্রীদের জন্য সুবিধা হবে বলে মনে করেন তিনি।
মিরপুর থেকে মতিঝিল রুটের বিকল্প বাসের যাত্রী ও শিক্ষার্থী মাসুম বলেন, যাতায়াতের খরচ বাড়লে তাদের ওপর চাপ পড়ে। সোমবার আগের ভাড়াই নেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বাসভাড়া বাড়লে যাতায়াত ব্যয়ও বাড়বে।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়িয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১২৭ বার পড়া হয়েছে