৭ নভেম্বরের চেতনায় বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ৬:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যতবার ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং দেশের গণতন্ত্র যতবার বিপন্ন হয়েছে, ততবারই ৭ নভেম্বরের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের চেতনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কেউ যেন দেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে কিংবা বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই হোক এবারের ৭ নভেম্বরের অঙ্গীকার।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তরুণ প্রজন্মের উপস্থাপিত প্রদর্শনীর প্রশংসা করেন তিনি। এ সময় সবাইকে নজরুলবর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের দিন।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল। ওই বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চরম আকার ধারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২ নভেম্বর মধ্যরাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দী করা হয়। স্বাধীনতার ঘোষককে বন্দী রেখে দেশের স্বার্থবিরোধী যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে তা রুখে দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল এবং সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।
তবে পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র পরবর্তী সময়েও থেমে থাকেনি বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য, ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় মহাজোটের নামে একজোট হয়ে দেশকে আবারও তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়। পাশাপাশি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই অপশক্তির আবারও পরাজয় ঘটে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশ এখন ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
১৯৭১ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের তাৎপর্য তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই, আর ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও একইভাবে সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ৭ নভেম্বরের পথরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আর তখনই দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। তাই ঐতিহাসিক এই দিনের তাৎপর্য বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও দলমতনির্বিশেষে এ দেশের সব নাগরিকের পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ—সবার পরিচয় বাংলাদেশি নাগরিক। এই অভিন্ন পরিচয়ই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের গুরুত্ব ও তাৎপর্যও প্রাসঙ্গিক থাকবে।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের নায়ক হিসেবে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জিয়াউর রহমান যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নিয়েছিলেন, ৭ নভেম্বরও একইভাবে দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ সময় তিনি স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান।
তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; বরং শুদ্ধ ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। আর্মি স্টেডিয়ামে হাজারো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী যেভাবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন, তা আশাব্যঞ্জক। ইতিহাসসচেতন এই প্রজন্ম ৭ নভেম্বরের প্রেরণায় উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ আর পথ হারাবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, যে দেশের তরুণেরা জাতীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত নয়, সে দেশের জনগণের ঐক্য সুদৃঢ় হতে পারে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনায় বাংলাদেশের তরুণেরা দেশের স্বার্থে আপসহীন ভূমিকা রেখেছে। দেশের স্বার্থই সবার আগে হওয়া উচিত।
ভবিষ্যতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জন যেমন গৌরবের, তেমনি সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলাও প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ধারণ করে নিরাপদ, সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা অভিভাবক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বর্তমান সরকার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার প্রতিটি মুহূর্তে দেশবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ দিনের অঙ্গীকার হোক—‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’।
১১১ বার পড়া হয়েছে