দয়াল কী সুখ তুমি পাও
বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ৭:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কিছু কিছু বেদনা মানুষের জীবনে এমনভাবে নেমে আসে যার কোনো ভাষা নেই। সেই দুঃখকে ব্যাখ্যা করা যায় না। যুক্তির কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। কোনো সান্ত্বনার বাক্য দিয়েও তার গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। তখন নিরবে মানুষের চোখের জলই হয়ে ওঠে তার একমাত্র ভাষা। দীর্ঘশ্বাস হয়ে ওঠে তার প্রার্থনা। নীরবতা হয়ে ওঠে হৃদয়ের দীর্ঘতম আর্তনাদ বা ফরিয়াদ। মানুষের অন্তর্গত যে কষ্ট মুখে উচ্চারণ করা সম্ভব না, সেই কষ্টই কখনো কখনো আত্মার সবচেয়ে সত্য পরিচয় হয়ে ওঠে।
জীবনের নির্মম বাস্তবতা হলো মানুষ যতই স্বপ্ন দেখুক সব স্বপ্নের পরিণতি তার হাতে থাকে না। কিছু স্বপ্ন পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে এসে ভেঙে যায়। কিছু সম্পর্ক সময়ের নিষ্ঠুরতায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। কিছু প্রিয় মানুষ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই দূর অচেনা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আর কিছু শূন্যতা এমন যা পূরণ করার মতো কোনো দ্বিতীয় অস্তিত্ব পৃথিবীতে আর থাকে না। সেই শূন্যতার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ তখন নিজের শক্তি, সামর্থ্য ও অহংকারের সমস্ত সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে।
বিশেষত একজন মায়ের বুকের শোক পৃথিবীর অন্যতম গভীর মানবিক বেদনা। সন্তান তার কাছে কেবল রক্তের সম্পর্ক না। সন্তান তার অস্তিত্বের সম্প্রসারণ, তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন, তার অগণিত প্রার্থনার দৃশ্যমান প্রতিফলন। সন্তানের বিচ্ছেদ মায়ের জীবনে কেবল একজন প্রিয় মানুষকে হারানো না। নিজের হৃদয়ের একটি বিরাট অংশকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা। সময় চলে যায়, ঋতু পরিবর্তিত হয়, চারপাশের মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় কিন্তু মায়ের অন্তরের সেই নির্দিষ্ট শূন্যতা অনেক সময় আর কোনো ঋতুতেই পূর্ণ হয় না।
একজন শোকাহত মা কখনো কখনো অশ্রুসিক্ত চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে যেন হারিয়ে যাওয়া তার সন্তানটি আবার ফিরে আসবে। পরিচিত কোনো শব্দে হৃদয় কেঁপে ওঠে, কোনো পদধ্বনিতে মনে হয় সে বুঝি এসেছে। স্মৃতি তখন বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চোখের সামনে মানুষটি নেই, অথচ হৃদয়ের ভেতর তার উপস্থিতি আরও তীব্র আরো গভীর। এই দ্বৈত বাস্তবতা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
বিরহের বেদনাও তেমনি এক অদৃশ্য আগুন। সেখানে বাহ্যিক কোনো ক্ষত দেখা যায় না। অন্তরে প্রতিনিয়ত একটি দহন চলতে থাকে। যে মানুষটি ছিল জীবনের স্বপ্ন। যার সঙ্গে ভবিষ্যতের অসংখ্য ছবি আঁকা হয়েছিল। তার অনুপস্থিতি হঠাৎ করে সমস্ত পরিকল্পনাকে অর্থহীন করে দিতে পারে। জীবনের পরিচিত পথগুলো তখন অপরিচিত মনে হয়। আনন্দের মুহূর্তেও বিষণ্ণতা এসে বসে। মানুষের ভিড়েও একাকিত্ব ঘিরে ধরে।চারপাশের আলোও কখনো কখনো অন্তরের অন্ধকারকে স্পর্শ করতে পারে না।
মানুষ অনেক সময় নিজের দুঃখ বা বেদনার কোনো ন্যায়সংগত ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না। সে প্রশ্ন করে, কেন এমন হলো? কেন এত বড় ক্ষতি তার জীবনে এলো? কেন যে হৃদয় এত ভালোবাসতে জানত তাকেই এত বেশি বিচ্ছেদের ভার বহন করতে হলো? কেন যার কাছে এত মানুষ আশ্রয় চেয়েছিল, তাকেই আজ এত গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক সময় মানুষের কাছে অজানা।
মানবআত্মা আশ্চর্যভাবে আশাকে আঁকড়ে থাকে প্রতিনিয়ত। সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তরের কোনো এক ক্ষুদ্র আলো নিভে যেতে চায় না। মানুষ তখন এক অজানা পরম করুণার দিকে ফিরে তাকায়। কখনো অভিমানে, কখনো অশ্রুতে, কখনো নীরব প্রার্থনায়। তার প্রার্থনা সবসময় কোনো নির্দিষ্ট শব্দে প্রকাশিত হয় না। কখনো শুধু দুই হাত ওঠে, কখনো দুচোঁখ বেয়ে অশ্রু নামে আবার কখনো গভীর রাতে বুকের ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সেই দীর্ঘশ্বাস যেন আকাশের দিকে পাঠানো এক অদৃশ্য গভীর আবেদন।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে মানুষের এই অসহায়ত্বের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সুখ মানুষকে অনেক সময় নিজের শক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। কিন্তু দুঃখ মানুষকে তার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তখন সে উপলব্ধি করে মানুষ পরিকল্পনা করতে পারে, চেষ্টা করতে পারে, ভালোবাসতে পারে কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নাই। এই উপলব্ধি কখনো ভেঙে দেয় আবার কখনো আত্মাকে বিনম্র করে। কখনো মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয় আবার কখনো তাকে গভীরতর বিশ্বাসের দিকে ফিরিয়ে আনে।
বিরহ-বেদনা কেবল অন্ধকার নয়। কখনো কখনো বেদনার মধ্যেই মানুষের অন্তর সবচেয়ে নির্মল হয়ে ওঠে। অশ্রুর মধ্য দিয়ে অহংকার ধুয়ে যায়। বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়। অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে করুণার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি হয়। যে হৃদয় একদিন সুখে নিজের শক্তিকে ভীষণ দাম্ভিকতার সাথে চিনেছিল। সে একদিন দুঃখে এসে নিজের ভেতরের সত্যকে আবিষ্কার করে।
প্রিয়জন হারানোর ব্যথা কোনো দর্শন দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। মানুষের কর্তব্য হলো সেই ব্যথাকে অস্বীকার না করা। কান্নাকে দুর্বলতা না ভাবা এবং শোকাহত হৃদয়কে সময় দেওয়া। কারণ কিছু ক্ষত সারতে সময় লাগে, আর কিছু ক্ষত সারেও না। শুধু মানুষ সেই ক্ষত নিয়ে বাঁচতে শিখে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে থাকে করুণার প্রত্যাশা। যে মা তার হারানো সন্তানকে স্মরণ করে কাঁদেন, যে হৃদয় প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে প্রতিদিন শূন্যতার সঙ্গে বসবাস করে। যে মানুষ তার পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের ছাই হাতে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের প্রত্যেকের অন্তরে একটি অভিন্ন আকুতি থাকে। অন্ধকারের পরে যেন কোনো আলো আসে, কান্নার পরে যেন কোনো প্রশান্তি আসে, বিচ্ছেদের পরে যেন কোনো পুনর্মিলনের সম্ভাবনা থাকে।
মানুষের জীবন শেষ পর্যন্ত সুখ ও দুঃখের সরল সমীকরণ নয়। এটি অপেক্ষা, হারানো, ভালোবাসা, স্মৃতি, অশ্রু ও আশার এক দীর্ঘ যাত্রা। আর এই যাত্রার সবচেয়ে গভীর মুহূর্তে মানুষ যখন সমস্ত পার্থিব অবলম্বন হারিয়ে ফেলে তখন তার অন্তর থেকে যে নিঃশব্দ আর্তি উঠে আসে সেটিই হয়তো তার সবচেয়ে নির্মল প্রার্থনা। সেই প্রার্থনায় কোনো দাবি থাকে না। থাকে শুধু করুণার প্রত্যাশা। কোনো অভিযোগ থাকে না। থাকে শুধু ফিরে পাওয়ার ব্যাকুলতা। কোনো অহংকার থাকে না। থাকে কেবল এক অসহায় আত্মার নত হয়ে যাওয়া। মানুষ ভেঙে যায় কিন্তু তার আশার শেষ প্রদীপটি যেন কোনোভাবেই নিভে না যায়।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক,গবেষক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।
১৩৯ বার পড়া হয়েছে